কান্দি রুদ্রদেবের হোমের মেলা জমজমাট উৎসব

কান্দির রুদ্রদেবের হোম উৎসব  :-
শ্রী সঞ্জয় কুমার মিশ্র, কান্দি মুর্শিদাবাদ 
     কাঁধে বাঁক নিয়ে ভক্তদের চীৎকার "বাবা মহাদেবের চরণে সেবা লাগে ..…..." চৈত্র মাসের শেষ দিকে কান্দি শহরের রাস্তায় এই আওয়াজ আমরা জন্ম থেকে শুনে আসছি । প্রতিবছর ১৯ চৈত্র থেকে শুরু হয় গাজন উৎসব। চলে বাংলা বছরের শেষদিন পর্যন্ত। টানা ১১দিন ধরে চলে এই উৎসব। কয়েক হাজার ভক্ত হাজির হন। রুদ্রদেব মন্দিরের গাজন শহরের সবচেয়ে বড় উৎসব।
     মুর্শিদাবাদের প্রসিদ্ধ মন্দির গুলির মধ্যে কান্দি রূপপুরের বাবা রুদ্রদেবের মন্দির বিশেষ ঐতিহ্য বহন করে চলেছে বহু বছর ধরে । ষোড়শ শতকের শুরুতে তিব্বত থেকে আসা বৌদ্ধ তান্ত্রিক কামদেব দুটি মূর্তি এনেছিলেন - একটি ‘বাবা ভোলা’ ও একটি ‘কালা ভোলা’ । কামদেবের আনা দুটি অক্ষোভ্য মূর্তিই তাঁর শিষ্য রুদ্র সিংহ কান্দি গ্রামের পূর্বে একটি গভীর জঙ্গলে স্থাপন করেন । জানা যায়, স্বাধীনতার আগে ওই অঞ্চল স্থানীয় জেমো ও বাগডাঙা জমিদারদের অধীনে চলে যাওয়ার পর পরবর্তীতে তৈরি হয় মন্দির ও প্রতিষ্ঠিত হয় দুটি মূর্তিই । এরপর থেকেই দুটি বাবার মূর্তিকে কেন্দ্র করে এই হোম উৎসব শুরু হয় । জানা যায়, পরবর্তীতে কোনো একবছর ‘দাদুরঘাটা’ অর্থাৎ নদীতে স্নান করতে নিয়ে যাওয়ার সময় ‘কালা ভোলা’ মূর্তিটি সাটুইয়ের গঙ্গায় তলিয়ে যায় এবং ৫ বছর পর কাটোয়ার উদ্ধারণপুরে সেই মূর্তি পাওয়া যায় । তখন থেকে ‘কালা ভোলা’ মূর্তি ওখানেই রয়েছে । এরপর থেকে ‘বাবা ভোলা’ মূর্তিই রয়েছে কান্দির রূপপুরের মন্দিরে ‘রুদ্রদেব’ রূপে । যাকে কেন্দ্র করে এখনও চৈত্র মাসে হয় হোমের মহাসমারোহ ।
     এই সময় কালে প্রতিদিন রাত ১২টায় বাবা মহেশ্বরকে মন্দির থেকে বারান্দায় ভক্তদের সামনে আনা হয়। এরপর মহেশ্বরকে সামনে রেখে অসংখ্য ভক্ত বিশেষ শিবনৃত্য প্রদর্শন করেন। ভোরের দিকে বাবাকে আবারও মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবেই চলতে থাকে ১১দিন। প্রতি রাতে ঢাক-ঢোল ও সানাইয়ের সুরে এলাকা গমগম করে।
  উৎসবের প্রথমদিনে একশ্রেণির ভক্ত কাঁটা নৃত্য প্রদর্শন করেন। অর্থাৎ কুলের বা বাবলার কাঁটা নিয়ে নৃত্য প্রশর্দন করে থাকে। এর পরদিন জিরেন অর্থাৎ জিরিয়ে নেওয়া বা বিরতি। জিরেনের দিন কোনওরকম নৃত্য প্রদর্শন হয় না। এইভাবে মধুভাঙা নৃত্য অর্থাৎ বিভিন্ন ফুল নিয়ে নৃত্য করা হয় বাবার সামনে। সিদ্বিভাঙা নৃত্যে সিদ্ধিগাছের ডাল নিয়ে নৃত্য করা হয়। গোয়ালনামা নৃত্যে বোলান গান করা হয়।  গাজনের দিনগুলিতে প্রতিরাতে হাজারের বেশি দর্শনার্থী হাজির হন। ভোর পর্যন্ত মন্দির চত্বর দর্শনার্থীদের আনাগোনা লেগেই থাকে।
      চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন সকাল বেলায় বাবা রুদ্র দেব কান্দি শহর পরিক্রমা করার জন্য বাজনা সহকারে পালকি করে ভক্তদের কাঁধে চেপে বের হন । ঢাকের বোলে আওয়াজ ওঠে " হোমতলা তে চলো বাবা ,দাদর ঘাটায় চলো " পথিমধ্যে কান্দি শহরের এক জায়গায় একটু বিশ্রাম নেন । সেজন্য জায়গা টার নামই হয়ে গিয়েছে বিশ্রাম তলা ।  বিশ্রাম তলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর পুরাতন হাট সংলগ্ন হোম তলায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সারারাত্রি সেখানেই অবস্থান করেন । এখানেই কান্দির সর্ববৃহৎ মেলা হোমের মেলা অনুষ্ঠিত হয় বাবা রুদ্র দেব কে কেন্দ্র করে । মেলায় ভীড় চোখে পড়ার মতো । সংক্রান্তির দিন সকাল বেলায় আগের দিন যে পথে এসেছেন সেই পথে না গিয়ে সম্পুর্ন বিপরীত পথে নিজ বাসস্থানে চলে যান । হোমের মেলার দিন কান্দিতে লোকাল হলিডে থাকলেও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ঐদিন কান্দি মহকুমা কোর্ট সকাল বেলায় অর্থাৎ সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত খোলা থাকে । পয়লা বৈশাখের পরদিন থেকে গ্রীষ্মবকাশ না পড়া পর্যন্ত কান্দির সমস্ত স্কুলের পঠনপাঠন  গরমের জন্য সকাল বেলায় হয় ।

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর