ইতিহাসের অভিশপ্ত অধ্যায় খোলা হোক


মানস বন্দ্যোপাধ্যায়  : দিল্লী 
১৯৭১  সাল। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাদের পৈশাচিক ও হিংস্র গণ হত্যার ফলে যখন কোটি কোটি বাঙালি প্রাণভয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল তখন পাকিস্তান ভারতের বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল ৩ মার্চ। 
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের ঔদ্ধত্যের জবাব দিতে পাকিস্তানের বিরূদ্ধে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা মুক্তি যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ৯ মাসের সেই রোমহর্ষক যুদ্ধে আমেরিকা ও চিনের মদত সত্বেও পাকিস্তানের পরাজয় হয়েছিল। সেই সময় পাকিস্তানকে সাহায্য করতে আমেরিকা সপ্তম নৌবহর ।পাঠিয়েছিল। আমেরিকাকে রুখে দিয়ে সেদিন রাশিয়া ভারতের সমর্থনে ডেস্ট্রয়ার নিয়ে সমুদ্র তোলপাড় করে এগিয়ে গেলে বিশ্ব যুদ্ধের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এটা প্রায় সকলেই জানেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সেনা প্রধান জেনারেল নিয়াজী পরাজয় স্বীকার করে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সেনা প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে। সৃষ্টি হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। 
ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ব নেত্রীর মর্যাদা পেয়ে যান। পাকিস্তানকে টুকরো করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি।
একথা প্রতিটি ভারতবাসীই গর্বের সঙ্গে স্বীকার করেন। 
বিশ্বের অসংখ্য দেশের রাষ্ট্র নেতা- নেত্রীরা তাকে "ধন্য ধন্য "করতে থাকেন। এই যুদ্ধে ভারতের হাতে বন্দী হয় ৯৭ হাজার কুখ্যাত পাক সেনা। ভারতীয় সেনার দখলে তখন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিমের উল্লেখযোগ্য শহর লাহোর।
ইন্দিরা গান্ধী সারা বিশ্বের নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে পাকিস্তানের জেল থেকে বের করে আনেন শেখ মুজিবুর রহমানকে। ইন্দিরার নির্দেশে ভারতীয় সেনা ৯৭ হাজার পাক সেনাদের বন্দী করে ভারতে নিয়ে আসে। ভারতীয় সেনা বাংলাদেশ ত্যাগ করে।

জেনারেল নিয়াজীর নির্দেশে এই পাক সেনারা বাঙালিদের ওপর বিভৎস নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল। ৫ লক্ষ মহিলাকে গণ ধর্ষন করে কয়েক হাজার মহিলার স্তন কেটে, নিম্নাঙ্গে বেয়নেট চার্জ করে ক্ষতবিক্ষত লাশে পরিণত করেছিল। আড়াই লক্ষ মহিলা গর্ভবতী হয়েছিলেন।
এই যুদ্ধে ভারতের সাড়ে চার হাজার সেনার মৃত্যু হয়েছিল। শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল পাকিস্তানের। পাকিস্তানের কুচক্রী শাসক জুলফিকার আলী ভুট্টো ভারতে সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত করতে আসেন কয়েক সপ্তাহ পরে। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে ইন্দিরার নাম। লৌহ মানবী হিসাবে পরিচিত হয়ে যান।

কিন্তু জানেন কি এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কোনেও লুকিয়ে রয়েছে এক অভিশপ্ত কলংক গাঁথা!!

ইন্দিরা গান্ধীকে 'Iron Lady' বা লৌহ মানবী মনে করা হলে নিঃশব্দে পড়ুন এই নামগুলো...

উইং কমান্ডার হর্ষরণ সিং দন্ডোস
স্কোয়াড্রন লিডার মোহিন্দর কুমার জৈন
স্কোয়াড্রন লিডার জে এম মিস্ত্রি
স্কোয়াড্রন লিডার জে ডি কুমার
স্কোয়াড্রন লিডার দেব প্রশাদ চ্যাটারজি
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সুধীর গোস্বামী
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ভি ভি তাম্বে
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাগাস্বামী শংকর
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রাম এম আডবানি
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মনোহার পুরোহিত
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তন্ময় সিং দন্ডোস
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বাবুল গুহা
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সুরেশ চন্দ্র সন্দল
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হারবিন্দর সিং
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এল এম সাসুন
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে পি এস নন্দা
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট অশোক ধবলে়
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শ্রীকান্ত মহাজন
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট গুরুদেব সিং রায়
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রমেশ কাদম
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট প্রদীপ ভি ওপ্টে
ফ্লাইং অফিসার কৃষ্ণ মালকানী
ফ্লাইং অফিসার কে পি মুরলিধরান
ফ্লাইং অফিসার সুধীর ত্যাগী
ফ্লাইং অফিসার তেজিন্দর সেঠি

এছাড়া আরও অনেকেই আছেন যাদের কোণ খোঁজ পাওয়া যায় নি।এদের অনেকেরই নাম গৌরবময় ইতিহাসের পাতায় তোলা হয় নি।

এরা ছিলেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর সেই সাহসী যোদ্ধারা যারা ১৯৭১  সালের যুদ্ধে পাকিস্তানে যুদ্ধবন্দী  হয়েছিলেন পাকিস্তানীদের হাতে । আর কখনো ফিরে আসেননি। তাদের চিঠি পরিবারদের কাছে পৌঁছেছিল, কিন্তু তখনকার ভারতের ইন্দিরা সরকার কখনো তাদের খোঁজখবর নেয়নি।

১৯৭২  সালে সিমলাতে তথাকথিত 'লৌহ মানবী"' ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে সিমলা চুক্তিতে ৯০ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি করে ফিরলেন.কিন্তু তার কখনও মনে পড়লোনা নিজের পুত্রসম ভারতীয় জওয়ানদের কথা। 
ইন্দিরা গান্ধী সিমলা চুক্তির সময় পরাজিত পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী ভুট্টোকে লাহোর ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে অধিকৃত কাশ্মীরকে  ছেড়ে দেওয়ার জন্য শর্ত দিতে পারতেন। পাকিস্তানের ৯৭ হাজার যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে পাকিস্তানে বন্দী ভারতীয় সেনাদের ছাড়িয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি কোনটাই করেন নি। দেশবাসীকেও জানতে দেন নি।
দেশবাসীও তাদের সম্পর্কে কখনো খোঁজ করেনি। 
তিনি যদি লৌহ মানবী হতেন তাহলে অধিকৃত কাশ্মীর না ছাড়লে লাহোর কখনোই পাকিস্তানকে ছেড়ে দিতেন না। 
লৌহ মানবী উদাত্ত কণ্ঠে বলেন নি,  মাত্র সত্তুর -আশী জন ভারতীয় সেনার মুক্তি না হলে, পাকিস্তানের হাতে তুলে দেবেন না ৯৭ হাজার পাকিস্তানি সেনাদের। 
তবে একটা কথা জানা গেছে, ভুট্টো নাকি যুদ্ধে হেরে যাবার পর বলেছিলেন," বাংলাদেশ বা ভারত পাকিস্তানি সেনাদের নিঃশর্তে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। অন্যথায় প্রায় এক লক্ষ পাক সেনাদের নিজেদের দেশে রেখে খাদ্য সরবরাহ করতে হিমসিম খাবে। এদের মুক্তি চায় না পাকিস্তান"।

ইন্দিরা গান্ধী কূটনীতিক,রাজনৈতিক, সামরিক কোন চাপ সৃষ্টি করেই এই হতভাগ্য ভারতীয় সেনাদের জল্লাদ পাকিস্তানের জেল থেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করেন নি। কেন?? এটা আজও রহস্য জনক।
খবরের কাগজে তাদের ছবি কখনো ছাপা হয়নি। দেশের স্বার্থে,দেশের মর্যাদা রক্ষায় যারা জীবন বাজি রেখে লড়াই করলেন, তাদের মরতে, পচে যেতে পাকিস্তানি জেলখানায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের অস্তিত্বই অস্বীকার করা হয়েছে।

এই পোস্ট নেহরু-গান্ধী পরিবারের সমর্থকদের জন্য কষ্টদায়ক হবে,কিন্তু দেশের প্রতিটি নাগরিকের এনিয়ে চোখ খুলে দেওয়ার 
 জন্যই এই অজানা কাহিনী তুলে ধরছি।
দুঃখ হয় অত্যাচারী পাকিস্তানি সেনাদের সকলেই  ছিল মুসলমান। তাদের ছেড়ে দেওয়াটা যদি মানবিক হয়, তাহলে দেশের জন্য যারা রক্ত ঝরালেন সেই হিন্দু, শিখ,নেপালি সেনাদের কথা ইন্দিরা একবারও ভাবলেন না?
 নরেন্দ্র মোদির কাছে অনুরোধ দীর্ঘ ৫৪ বছর পর এই ঘটনা নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে মানবিকতার প্রশ্নে আলোচনা করুন। দেশের গর্ব এই ভারতীয় সেনার অনেকেরই হয়তো বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কম, কিন্তু অনেকে বেঁচে থাকতেও পারেন। তাছাড়া এই নক্কার জনক ঘটনার কারণ কী? সেটাও আমরা যেন জানতে চাই।( লেখকের নিজস্ব মত) 

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর