মুর্শিদাবাদ জেলার রেশম শিল্প বাংলার গৌরব

ভাগীরথীর তীরে বালুচরির উত্থান: নবাবি বাংলার রেশমি ঐতিহ্যের গল্প

শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ:  কলকাতা

ভাগীরথীর ধারে এক সময় ছিল ছোট্ট এক জনপদ—বালুচর। আজ নামটি ইতিহাসের পাতায় আবছা, কিন্তু এককালে এই অঞ্চলই জন্ম দিয়েছিল বাংলার অন্যতম গৌরবময় বয়নশিল্প, বালুচরি শাড়ি। রেশমের মসৃণ জমিনে গল্প বোনার যে ঐতিহ্য, তার সূচনা হয়েছিল এখানেই, নবাবি আমলের মুর্শিদাবাদে।
১৭০৪ সালে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে সরিয়ে আনলে বদলে যায় এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্র। নবাবি দরবার, জমিদার সমাজ, বিদেশি বণিকদের আনাগোনা—সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ হয়ে ওঠে রেশম ও বিলাসপণ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই পরিবেশেই বালুচরের তাঁতিপাড়ায় জন্ম নেয় নকশাদার রেশম বোনার এক অভিনব ধারা। ১৭৫৫ সালে ওলন্দাজ নথিতে বালুচরের রেশমের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে এই শিল্পের আন্তর্জাতিক যোগাযোগও ছিল।
বালুচরির বিশেষত্ব ছিল তার নকশায়। শুধু পৌরাণিক আখ্যান নয়, সমকালীন সমাজজীবনের দৃশ্যও উঠে আসত শাড়ির আঁচলে ও পাড়ে। পেশোয়াজ-পরা বাবু-বিবি, হুঁকো হাতে রাজপুরুষ, ইউরোপীয় পোশাকে মেমসাহেব, এমনকি রেলগাড়ির কামরার দৃশ্য—সবই জায়গা পেত রেশমি সুতোয়। এক অর্থে বালুচরি ছিল সময়ের দলিল, যেখানে নবাবি ঐশ্বর্য ও ঔপনিবেশিক প্রভাব পাশাপাশি বোনা থাকত।
এই শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তার বহুসাংস্কৃতিক চরিত্র। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের অভিজাত সমাজেই বালুচরি সমান জনপ্রিয় ছিল। হাজারদুয়ারির মহাফেজখানায় সংরক্ষিত ফারসি নথিতে নবাব পরিবারের বিবাহে বালুচরি ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার ইউরোপীয় প্রদর্শনীতেও স্থান করে নেয় এই শাড়ি। শিল্পীরা ছিলেন সমাজের নানা প্রান্তিক গোষ্ঠী থেকে—কৈবর্ত, মাল, বাগদি, মুসলিম যুগী ও বৈষ্ণব তাঁতি—যাঁরা মিলেই গড়ে তুলেছিলেন এই ঐতিহ্য। ‘নকশাবন্দ’ শিল্পীরা সুতো বেঁধে জটিল নকশার ছক তৈরি করতেন, যা ছিল অত্যন্ত দক্ষতার কাজ।
তবে এই উত্থানের গল্প দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ভাগীরথীর ভাঙনে বালুচর অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক নীতি, যা দেশীয় শিল্পকে দুর্বল করে তোলে। ধীরে ধীরে উৎপাদন কমে যায়, শিল্পীরা অন্যত্র পাড়ি জমান। পরবর্তীকালে বিষ্ণুপুরে মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বালুচরি নতুন রূপে পুনর্জন্ম লাভ করে, কিন্তু তার শিকড় রয়ে যায় মুর্শিদাবাদের মাটিতেই।
আজ বালুচরি ভৌগোলিক স্বীকৃতি পেয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারেও তার কদর আছে। তবু ভাগীরথীর ধারে সেই আদিম উত্থানের ইতিহাস অনেকটাই বিস্মৃত। বালুচরি শুধু একটি শাড়ি নয়; এটি নবাবি বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক সহাবস্থান এবং শিল্পসৃজনের এক উজ্জ্বল স্মারক। রেশমি বুননে যে গল্প একদিন শুরু হয়েছিল বালুচরে, তার আলো আজও ছড়িয়ে আছে বাংলার ঐতিহ্যের ভাঁজে।

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর