পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসনের দিকে যাচ্ছে?
রাষ্ট্রপতি শাসনের তত্বাবধানে ভোটের সম্ভাবনাই প্রকট
নির্বাচন কমিশনের তথ্য থেকেই অশনি সংকেত
মানস বন্দ্যোপাধ্যায়
অনেক ঝড় তুফান,কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ,রাফেলগারের যুদ্ধের পর সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশ ও নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক নির্দেশের পর একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, এবং প্রশ্নও জেগেছে রাষ্ট্রপতির শাসন ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে বিধানসভার নির্বাচন সম্ভব হবে?
এবারে দেখা যাক সংকট কোথায়!! SIR এর নথিপত্রের পরিমাণ এখনো ৬০ লক্ষের বেশী পড়ে রয়েছে। ইতিমধ্যেই নথি যাচাই করে ৫৮ লক্ষ অবৈধ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুসারে নথিপত্র যাচাইয়ের দায়িত্ব বিচারপতিদের হাতে।
এপর্যন্ত ২৫২ বিচারককে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড থেকে আনা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মনোজ আগরওয়াল বলেছেন, এখনো ৬০ লক্ষ নথি যাচাই করা বাকি। একজন সর্বাধিক ৫০০ নথি যাচ করতে পারেন। সেই হিসাব অনুযায়ী যাচাই শেষ করতে আরো ৩ মাস লেগে যেতে পারে। অর্থাৎ মে মাসের আগে সম্ভব নয়। কিন্তু তাহলে মার্চ মাসে নির্বাচন কমিশন ভোটের ঘোষণা করবেন কীকরে? জানা গেছে সময়মতো পুরো নথি যাচাই করতে হলে আরো ২৮২:জন বিচারকের প্রয়োজন। যেটা অনেকটাই অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
ওদিকে বিজেপি সাংসদ,কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ও রাজ্যের বিরোধী দলের নেতা শুভেন্দু অধিকারী আজও বলেছেন , No SIR, NO vote, অর্থাৎ SIR সংক্রান্ত নথি যাচাই শেষ না হলে কোন ভোট নয়।
রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজেও বুঝতে পেরেছেন সেকথা। রাষ্ট্রপতি শাসনের আশংকা তার কণ্ঠেও ধ্বনিত হয়েছে। নিজেই বলেছেন,নির্বাচন কমিশন ১, কোটি ২০ লক্ষ ভোটারকে বাদ দেবার চক্রান্ত করেছে। যার নামই বাদ যাবে,তিনি তাদের সঙ্গে আছেন। শুভেন্দু বলেছেন, মমতা মৃত ভোটার, রোহিঙ্গা ভোটার, বাংলাদেশি ভোটারের সঙ্গে আছেন।
মমতার এই কথাতেই মনে হচ্ছে, মমতাও চান অস্থিরতা সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু হোক। তাহলে অন্তত সিম্প্যাথি ভোট মিলতে পারে।
###রাষ্ট্রপতি শাসন দেশে কবে ও কোথায় জারি হয়েছিল তার পরিসংখ্যান###
পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয় বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের প্রয়াণের অব্যবহিত পরে। ১ জুলাই ১৯৬২। এই শাসন জারি ছিল মাত্র ৭ দিন যতদিন তা কাউকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বেছে না নেওয়া হচ্ছে। এরপরে সেই বছরের ৮ জুলাই মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার বসেন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। শেষ হয় রাষ্ট্রপতি শাসন।
দ্বিতীয়বার বাংলা কংগ্রেস ওরফে ইউনাইটেড ফ্রন্ট ও প্রোগ্রেসিভ ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের যুক্তফ্রন্ট সরকার মুখ থুবড়ে পড়ে। ফের ১৯৬৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলায় জারি হয় রাষ্ট্রপতি শাসন। মোট ১ বছর পাঁচ দিন চলার পর তা শেষ হয় ১৯৬৯ সালের২৫ ফেব্রুয়ারি।
তৃতীয়বার ১৯ মার্চ ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১ বছর ১৪ দিন রাষ্ট্রপতি শাসন স্থায়ী হয় বাংলায়। মূলত বাংলা কংগ্রেস ও বামেদের জোট সরকারের পতনের কারণেই এই অবস্থা তৈরি হয়।
চতুর্থবার বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৮ জুন। চলেছিল ১৯ মার্চ ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ মোট ২৬৫ দিন। এরপরে নির্বাচন জিতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়।
পঞ্চম তথা শেষবার ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ২০ জুন পর্যন্ত বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন চলেছিল ৫১ দিন ধরে। পরে ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসে বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৭৭ সালের সেই অষ্টম বিধানসভা ভোটের পর থেকে আর এরাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়নি।
##কোন রাজ্যে সবচেয়ে বেশিবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল?##
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি RTI উত্তর অনুসারে, উত্তর প্রদেশে সর্বাধিক সংখ্যক বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল (১০ বার) এবং পাঞ্জাবে সর্বাধিক সংখ্যক দিন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি ছিল (৩০০০ দিনেরও বেশি)। কেন্দ্রে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন ৮৪ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল, যা সমস্ত ঘটনার ৭৩% এরও বেশি।
২০১৬ সালের মার্চ মাসে উত্তরাখণ্ডে যখন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল, তখন ১৯৫০ সালের পর থেকে এটি ১১৫ তম রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ঘটনা। ফ্যাক্টলির একটি RTI আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জবাব অনুসারে, উত্তর প্রদেশে সর্বাধিক সংখ্যক বার (১০ বার) রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল।
###২৯টি রাজ্যের মধ্যে ২৭টিতে কমপক্ষে একবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল##
দেশের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ২৭টিতে কমপক্ষে একবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল। ছত্তিশগড় এবং তেলেঙ্গানা বাদে বাকি ২৭টি রাজ্যে কোনও না কোনও সময়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ ১০ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার তালিকার শীর্ষে রয়েছে, তার পরে বিহারে ৯ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছে।
কেরালা, মণিপুর, ওড়িশা এবং পাঞ্জাবে ৮ বার করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছে। গুজরাট এবং কর্ণাটক উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচবার করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছে। উত্তরাখণ্ড, মিজোরাম এবং অরুণাচল প্রদেশই একমাত্র রাজ্য যেখানে কেবল একবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছে। উত্তরাখণ্ড এবং অরুণাচল প্রদেশে ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল।
পাঞ্জাব প্রায় ১০ বছর ধরে রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে ছিল। দিনের সংখ্যার দিক থেকে, পাঞ্জাব ৩৫১০ দিন রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে ছিল, যা প্রায় ১০ বছর। এর বেশিরভাগই ছিল ৮০-এর দশকে , যখন পাঞ্জাব জঙ্গিবাদের তুঙ্গে ছিল। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৮৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত টানা ৫ বছর ধরে পাঞ্জাব রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে ছিল। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর, যেখানে ২০৬১ দিন (প্রায় ৬ বছর)। এর বেশিরভাগই ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে একটি টানা সময় ধরে। প্রকৃতপক্ষে, এই দুটি ঘটনাই সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত সর্বোচ্চ ৩ বছরের সীমা অতিক্রম করেছে এবং সংবিধানেও এই পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশ ১৭০০ দিন রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে ছিল, তার পরে নাগাল্যান্ড ১৫৪৫ দিন। কেরালা ১৫১৫ দিন রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে ছিল। দশটি রাজ্যে ১০০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রপতি শাসন ছিল। শুধুমাত্র উত্তরাখণ্ড এবং অরুণাচল প্রদেশে ১০০ দিনেরও কম সময় ধরে রাষ্ট্রপতি শাসন ছিল।
মণিপুরে ১৯৫১ সাল থেকে ১১ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে। এবারে ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩৬৫ দিনের মতো মণিপুরে রাষ্ট্রপতি শাসন অব্যাহত ছিল।
## সর্বাধিক রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে কংগ্রেস আমলে ###
কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ৮৪ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল। ১১৫ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারির মধ্যে ৮৪ বার কংগ্রেস বা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল। দেশে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ৭৩% এরও বেশি সময় এটি। ১৬ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সময় জনতা জোট ক্ষমতায় ছিল। মজার বিষয় হল, ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে জনতা জোট মাত্র ২ বছর ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু ১৬ বার রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ করেছিল। বিজেপি বা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ৭ বার রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ করেছিল, তার পরে জাতীয় ফ্রন্ট জোট ৬ বার রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ করেছিল। যুক্তফ্রন্ট জোট (১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮) তাদের দুই বছরের মেয়াদে মাত্র দুবার রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ করেছিল।
Comments
Post a Comment