সাংবাদিক যিনি মানুষের জন্যে করে গেছেন
চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা আনন্দ
তোমাকে আজ আর ছোঁয় না
এত শব্দ, এত উচ্ছ্বাস, এত জীবন
তোমাকে ছাড়াই বহমান
দুপুর ২.৩৮মিনিট। ২৬শে ডিসেম্বর ২০২৫. অগ্নিদেব আলিঙ্গন করে কোলে তুলে নিলেন। রাজপুর-সোনারপুর মহাশ্মশানে শেষ হয়ে গেল এক বর্ণময়, নীতিনিষ্ঠ, দৃঢ়চেতা, সৃজনশীল, পরপোকারী জীবন। তারপর কেটে গেল মাসাধিক সময়। আমি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কিছু লিখতে পারিনি। এই আকস্মিক আঘাত সামলানোর শক্তি সঞ্চয় করে নিজের অনুভূতি প্রকাশে সমর্থ হতে এই সময়টা জরুরী ছিল। কারণ জীবনের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এই মানুষটিকে পেয়েছিলাম এবং এমন এক গভীর আন্তরিক ও সৃজনশীল সম্পর্কের মধ্যে একসাথে পথ হেঁটেছি দীর্ঘ সময় যে এই চিরকালীন বিচ্ছেদ স্বভাবতই আমার কাছে একটা চরম ধাক্কা ছিল।
আমি প্রদীপদার কথা বলছি। সেই প্রদীপদা যিনি নীরবে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার form fill up এ সাহায্য করতেন। সাধারণ, অতি সাধারণ মানুষের সাথে সহজ সরল বন্ধুর মত মিশতেন, পাশে থাকতেন।
সমাজের সর্ব স্তরের মানুষ বিশেষত নারীদের প্রতি ছিল শ্রদ্ধা ও সম্মান। ছেলের জন্মদিনের অভিনব নিমন্ত্রণ পত্রে আগে রাখতেন স্ত্রীর নাম । প্রকাশ করতেন কবিতা সংকলন। নতুন বাড়ির গৃহ প্রবেশ অনুষ্ঠানে আগে ছেলে স্বপ্নদীপের নাম, তারপর স্ত্রীর নাম, শেষে নিজের নাম। সেই পত্রে ছিল সব গৃহহারাদের জন্য আশ্রয় পাবার আকুতি। এই ব্যতিক্রমী পত্র আছে আমার সংগ্রহে, প্রোমোটারের অফিসের দেওয়ালে। স্বপ্নদীপ নামটা রেখেছিলেন স্ত্রী স্বপ্না আর নিজের নাম মিলিয়ে। পথ কুকুরদের প্রতি এক বুক ভালোবাসা নিয়ে তাদের পালন করতেন, খাওয়াতেন নিয়ম করে। দেশভাগ কোনোদিনই মেনে নিতে পারেন নি। কাঁটাতার আজীবন বুকে বিঁধেছে। বাবা এবং মায়ের জীবন দর্শন ও আদর্শের প্রতি ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা। স্বপ্ন দেখতেন দুই বাংলা আবার একদিন এক হয়ে যাবে। তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা ম্যাগাজিন ইন্টারন্যাশনাল থেকে প্রকাশ করেছিলেন 'সেই কালো সীমানা মুছে যাবেই' শীর্ষক বই। সেখানে আমার কবিতাও ছিল। প্রকাশ করেছিলেন 'বাঙালীর শরৎ বাঙালীর পুজো' শীর্ষক বই। সম্প্রতি এই দুটো বইয়েরই দ্বিতীয় সংস্করণ বের করেছিলেন। মনে আছে এই বইগুলোর প্রথম প্রকাশ অনুষ্ঠান করেছিলেন আলিপুরদুয়ার জংশন রেল স্টেশনের সামনে এবং মহালয়ার দিন দমনপুরে হাইওয়ের ওপরে। এখানেও সহজিয়া অভিনবত্ব । সহজ ভাষায় মানুষের কথা লিখতেন। অসম্ভব ভাল ফটোগ্রাফি করতেন। বাবা প্রয়াত জগন্নাথ ঘোষের কাছে শিখে ঘরেই তৎকালীন ফটো রিল ডেভেলপ করতেন। পরিবর্তন পত্রিকার পাঁচটি জেলার দায়িত্বে ছিলেন। নিয়মিত লিখতেন আনন্দ বাজার পত্রিকার 'ভূমিলক্ষী'র পাতায়। পরবর্তীতে সাংবাদিকতা করেছেন 'কোলকাতা থেকে গ্রাম' নামের rural news weekly তে। তাঁর হাত ধরেই সেই ১৯৮৯-৯০ সালে ঐ কাগজেই আমার সাংবাদিকতা শুরু। মানুষের অধিকার নিয়ে সচেতন ছিলেন। আজীবন মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন। আজীবন হিন্দী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। আজীবন বাংলায় সই করেছেন। রাজনৈতিকভাবে মাও সে তুং এর আদর্শে বিশ্বাস রেখেছেন। ধর্মের সব নিয়মকানুন মানতে পারতেন না। তাই তাঁর মায়ের প্রয়াণের পরে করেননি কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান। কাটেননি চুল, দাড়ি। পরোয়া করেননি কোনো বিরুদ্ধ সমালোচনা। ভালোবাসতেন প্রকৃতি। একসাথে ঘুরে বেড়িয়েছি পাহাড়ে, জঙ্গলে, চাবাগানে। নানান কাজে মাঝে মধ্যে কলকাতায় চলে আসতেন। থাকতেন আমার কাছে। একসাথে ঘুরে বেড়াতাম তৎকালীন গড়ের মাঠের বইমেলায়; একাডেমি, রবীন্দ্রসদনে দেখতাম নাটক, সিনেমা। মনে আছে প্রদীপ দা একবার চলে এলেন ডায়মন্ড হারবারে পূর্ণ গ্রাস সূর্য গ্রহণ দেখার জন্য... আমরা গেলাম, দেখলাম। এমন কত স্মৃতি নানান জায়গার...
শেষ বয়সে ছেলের পড়াশোনা আর আমার ও আমার পরিবারের কাছাকাছি থাকবেন বলে আমার কাছাকাছি ফ্ল্যাট কিনে বসবাস শুরু করলেন। এখানকার বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের গুণী মানুষদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম । বইমেলায় কাঁটাতারের ব্যাথা নিয়েই বলার জন্য আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে ডেকেছি, সংবর্ধনা দিয়েছি। আবার আমাদের যৌথ পরিক্রমা শুরু হয়েছিল। ইদানিং বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন । বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। পাশে থেকেছি শেষ দিন পর্যন্ত।
এই স্মৃতিচারণ করার প্রয়োজন তো ছিলই। অন্ততঃ আমার নিজের জন্য। শোক সামলে একটু দেরিতে করলাম। গতকাল ১৬ই ফেব্রুয়ারি ছিল প্রদীপদার জন্মদিন। তুমি আছো প্রদীপদা... জন্মদিন জুড়ে, আমাদের ঘিরে... ❤️🙏
প্রীতম মজুমদার
১৭ ০২ ২০২৬
Comments
Post a Comment