বরাকের ভূবন তীর্থ স্মারক ইতিহাস
সঞ্জীব দেব লস্কর//
আজ থেকে হাজার বছর আগে আত্মপ্রকাশ করেছিল ভুবনতীর্থ। উঁচু পাহাড়ের শীর্ষে গুহার ভেতর অঙ্কিত বেশ কিছু চিত্র, কিছু দুর্বোধ্য প্রস্তরলিপি এবং প্রতিষ্ঠিত দেবমূর্তি নিয়ে এ তীর্থ বরাক উপত্যকার প্রাচীন তীর্থগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে পূজা পান ভুবনেশ্বর এবং ভুবনেশ্বরী। 'কাছাড়ের ইতিবৃত্ত' রচয়িতা উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ ভুবনেশ্বরের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে ----- 'কৌপিন বস্ত্র পরিহিত, দ্বিভুজ, দ্বিনেত্র, কৃশোদর, বাম হস্ত বাম জানুর নীচে রক্ষিত ও দক্ষিণ হস্ত হৃদয়ে ধারণ করতঃ পূর্বাভিমুখে পাষাণোপরি দণ্ডায়মান। গলদেশে প্রস্তর নির্মিত মালা শোভা পাইতেছে। বিগ্রহের উচ্চতা সার্ধ দুইহস্ত।' ভুবনেশ্বরীর বর্ণনায় এ ঐতিহাসিক লিখেছেন --- 'দ্বিভুজা, দ্বি-নেত্র নবযৌবনাসম্পন্না। ভুবনেশ্বরী মূর্তি স্বীয় বামহস্ত বক্ষস্থলে কিঞ্চিৎ নিম্নে পার্শ্বান্তর প্রসারিত অবস্থায় দক্ষিণাস্য দণ্ডায়মান। এই বিগ্রহের দক্ষিণহস্ত ভঙ্গ, মস্তক হইতে উপরিভাগ পর্যন্ত অনাবৃত। কটিদেশ হইতে জানু পর্যন্ত প্রস্তরবসন পরিহিতা এবং তন্নিম্নভাগ ভূমি হইতে প্রোথিত।'
বহুদিন এ তীর্থস্থান বিস্মৃতির অন্তরালে ছিল। এই মাত্র ১৭০৯ শকাব্দ, অর্থাৎ ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে, মতান্তরে ১৭৮৫ সালে, ডিমাসা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ধ্বজনারায়ণের আদেশে তাঁর সচিব জয়সিংহ বর্মন এ লুপ্ত তীর্থক্ষেত্রটি পুনরাবিষ্কার করেন। সেই থেকে জনমানসে তীর্থস্থানটির নবপর্যায়ে প্রসিদ্ধি। তবে ওই ভুবনতীর্থের নিম্নভূমিতে সোনাই অর্থাৎ প্রাচীন স্বর্ণপুরে চন্দ্রগিরিতে রাজার আদেশে জয়সিংহ বর্মন কর্তৃক শ্রীশ্রী ভুবনেশ্বরের একটি প্রস্তর নির্মিত মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।
ঐতিহাসিক উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ ভুবনের কয়েকটি ভগ্ন প্রস্তরমূর্তির সংবাদও দিয়েছেন। তিনি এ-ও বলেন, যে 'এ সম্বন্ধে জনশ্রুতি এই যে, পূর্বকালে ভুবনপাহাড়ে নাগাদের পুঞ্জি ছিল। নাগারা উক্ত দেব-দেবীকে আপনাদের আদিপুরুষ ভাবিয়া নিজ পুঞ্জিতে স্থাপন করিতে সঙ্কল্প করে।' এদের এ প্রচেষ্টা অবশ্য ব্যর্থ হয়, কিন্তু স্থানান্তরের এ প্রয়াসে মূর্তি কিঞ্চিৎ শ্রীহীনও হয়ে পড়ে। তাছাড়া প্রাকৃতিক কারণেও সময়ে সময়ে মন্দির এবং বিগ্রহের অনেক ক্ষতি হয়। এ মন্দির চত্বরে হনুমানজিউ, বিভীষণের মূর্তি এবং কয়েকটি ফলকে সুভদ্রা, গরুড় প্রভৃতি দেবগণের নামও খোদিত ছিল। মন্দির সংলগ্ন মোকাম টিলায় শঙ্খ-চক্র-পদ্মধারী বাসুদেব মূর্তি আজও বিদ্যমান।
ঐতিহাসিক সুজিৎ চৌধুরীর অভিমত, 'ভুবন পাহাড় এমন একটি সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছে যাতে আরোপিত ব্রাহ্মণ্য উপাদানের চাইতে পূর্ব ভারতীয় আঞ্চলিক উপাদানই বেশি সক্রিয়।' এখানে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র পুকুর, কয়েকটি গুহা, প্রাচীন ভাস্কর্যের কিছু নিদর্শন। অনুমান করা হয়, এখানের অনেকগুলো মূর্তিই বিলুপ্ত। তবে কয়েকটি আবার শিলচর নর্মাল স্কুলেও এনে রাখা হয়েছিল। দুটো প্রধান বিগ্রহ ছাড়াও এখানে আরেকটি অর্ধভগ্ন দেবমূর্তি রয়েছে। তাঁর অভিমত, এ মূর্তিকে যদিও বিষ্ণুমূর্তি বলা হয়ে থাকে, তবু পৌরাণিক বিষ্ণুর সঙ্গে এর কোনও মিল নেই। আরও দুটো মূর্তিকে তিনি দ্বারপাল হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন।
ওই স্থান থেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে অবস্থিত বহু বিখ্যাত সেই সুড়ঙ্গগুলো। সুজিৎবাবু লিখেছেন----- 'সংকীর্ণ একটি নুড়িপথ অতিক্রম করে পাওয়া যায় একটি ছড়া, অতিক্রম করে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ। প্রবেশ পথ অতিক্রম করে প্রথমেই পাওয়া যাবে একটি চত্বর, যার দৈর্ঘ্য আশি ফুট, প্রস্থ ত্রিশ ফুট ও উচ্চতা বিশ ফুট...।' এমনি রয়েছে অনেকগুলি সুড়ঙ্গ মুখ। এরকম একটি সুড়ঙ্গের ভেতরে দেওয়ালে দুটো মূর্তি খোদাই, এবং আরও একটিতে রয়েছে শিবলিঙ্গ। জনশ্রুতি আছে যে এ সুড়ঙ্গের সঙ্গে নাকি কামাখ্যারও সংযোগ রয়েছে। দুর্গমতা, প্রাচীনত্ব এবং রহস্যময়তা----এ তিনটি লক্ষণই নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে এ ভুবনতীর্থ। এ তীর্থস্থানটি গড়ে উঠতে বিভিন্ন পার্বত্য জনজাতির অবদানই হয়ত প্রধান ছিল। দেবদেবীর মূর্তিগুলোর উপর ব্রাহ্মণ্য ধর্মীয় সংস্রব আরোপণ হয়ত খুব বেশি দিনের ব্যাপারও নয়। তবে এ তীর্থ নিয়ে স্থানীয়ভাবে কিছু কিংবদন্তি এবং পাঁচালি আকারে লোককাহিনিও রয়েছে। এর মধ্যে ধনুকধারীর পাঁচালি এবং পাষাণ পাঁচালি বিশেষ উল্লেখ্য।
ধনুকধারীর পাঁচালিতে বর্ণিত হয়েছে কী করে শিব প্রাগৈতিহাসিক আয়ুধ থেকে লাঙ্গল সৃষ্টি করে জমি কর্ষণে নেমে গেলেন। শ্মশানে-মশানে বিচরণশীল শিবের এই গার্হস্থ্য জীবনে প্রবেশটা এ অঞ্চল কৃষিভিত্তিক জীবনচর্যার আত্মপ্রকাশের সূচক হিসেবেও দেখা সম্ভব।
এই তো গেল ভুবন ভুবনতীর্থের ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় দিক। কিন্তু এ মুহূর্তে সবার সামনে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হল, ভুবন পাহাড়ে তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা এবং সামান্য কিছু সুবিধার ব্যাপারটি। শিবচতুর্দশীতে প্রতিবছরই ভক্ত সমাগম বেড়ে চলেছে। দূরদূরান্ত থেকে জটাজুট সন্ন্যাসীর দল ছাড়াও বরাক উপত্যকার গ্রাম-গ্রামান্তর, চা-বাগিচা, এবং শহর, শহরতলি থেকে বিশাল সংখ্যক জনতা এখন এ তীর্থযাত্রায় সামিল হচ্ছেন। ওই যাত্রীদের জন্য সামান্য আহার, অন্ধকারে একটুকু আলোর ব্যবস্থা যে না করলেই না হয়! রাস্তাটিকে সময়ের দাবি মেনে আরও সুগম করে তোলাও নিতান্ত প্রয়োজন। এখন সময় এসব জাগতিক দিকেও একটু নজরদারির। 'কালি বক্সে স্থিতং দেবং গুপ্তাখ্যাং ভুবনেশ্বরম্ ত্বংপ্রণম্য নরো ভক্ত্যা প্রাপনুয়াদীশ্বরপদম্'----- এ মন্ত্র তো সর্বদাই ভক্তপ্রাণে উচ্চারিত হবে, তবে সেসঙ্গে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার দিকে নজর দিলেই এ তীর্থ মাহাত্ম্যটি যথাযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে দেশে-বিদেশে।
Comments
Post a Comment