বাঙালি ,বাংলা ভাষা কিছু প্রশ্ন
# বাংলা ভাষা, ভাষা দিবস ও সমকালীন একটি প্রশ্ন #
* বিকাশ সামন্ত * 21/02/2020
আজ একুশে ফেব্রুয়ারি । ভাষা দিবস । কলকাতা সহ বিভিন্ন জায়গায় ঘটা করে পালিত হচ্ছে ভাষা দিবস বা বাংলা ভাষা দিবস । কিন্তু অনেকেই এর প্রকৃত ঘটনা সম্ভবত জানে না । বাংলাদেশের ভাষা শহীদ দিবসের সাথে গুলিয়ে ফেলে ।
আমাদের ছোটবেলায় এরূপ ছিল না । শুধু ছিল না বললে ভুল হবে । ভাষা দিবস হিসাবে যে একটা দিন পালিত হতে পারে ; সেটা তখনও জানতাম না বা শুনি নাই । এমনকি স্কুল, কলেজেও নয় । কিন্তু তা না জানলেও সেই পাঠশালা থেকেই আমাদের রক্তে মিশে গেছে- " মোদের গরব- মোদের আশা , আ'মরি বাংলা ভাষা " অথবা " হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন " ।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানতে পারি 1947 সালের 15 ই আগস্ট ভারতবর্ষ ইংরেজ শাসন মুক্ত হয় । তার ঠিক একদিন আগে 14 ই আগস্ট পাকিস্থান গঠিত হয় । অখণ্ড ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষ শুধুমাত্র দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্থান রূপে আত্মপ্রকাশ করে ।
এই বিভাজনের ফলে ভাষা , সংস্কৃতি এবং আচার আচরণগত ভাবে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় অবিভক্ত বাংলা ।
বাংলার পূর্ব অংশ পাকিস্থানের অন্তর্ভুক্ত হয় "পূর্ব পাকিস্থান " নামে । আর পশ্চিম অংশ থেকে যায় ভারতে - পশ্চিমবঙ্গ নামে এক অঙ্গরাজ্য হিসাবে । আমরা যে অংশের বাসিন্দা ।
1948 সালে পাকিস্থান সরকার সে দেশের একমাত্র সরকারি ভাষারূপে " উর্দু " ভাষাকে গ্রহন করে । এতে সবথেকে বিপাকে পড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষীরা । প্রতিবাদে গর্জে উঠেন । গড়ে উঠে আন্দোলন । যা ইতিহসের পাতায় " বাংলা ভাষা আন্দোলন " নামে পরিচিত ।
এই ভাষা আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল - "বাংলা ভাষাকে" সে দেশের অর্থাৎ পাকিস্থানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে ।
1952 সালের 21 শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে বাংলা ভাষাকে পাকিস্থান সরকারের স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের উপর তৎকালীন পাকিস্থান সরকারের পুলিশ আন্দোলন দমনের জন্য নির্বিচারে গুলি চালায় । এতে অনেক ছাত্র যুব শহীদ হন । আবুল বরকত , আব্দুল জব্বার , রফিক উদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালাম প্রমূখের নাম শহীদ হিসাবে জানা যায় ।
তৎকালীন পাকিস্থান সরকার ভেবেছিল - গুলি চালিয়ে মানুষ মেরে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেবে । কিন্তু তা হয় না । ফল হয় উল্টো । আবেগতাড়িত মানুষ গেয়ে উঠেন - " আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙা একুশে ফেব্রুয়ারি ; আমি কি ভুলতে পারি " ।
শুরু হয় যুদ্ধ । পাকিস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার যুদ্ধ । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ । নেতা - বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।
1971 সালের 26 শে মার্চ পাকিস্থানের শাসনমুক্ত হয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন দেশ তথা - "বাংলাদেশ " নামে আত্মপ্রকাশ করে ।
শুধুমাত্র ভাষার জন্য আন্দোলন করে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টির দ্বিতীয় উদাহরণ পৃথিবীর মানচিত্রে এখনো পর্যন্ত আর নাই ।
এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার 21 শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে সে দেশের জাতীয় ভাষা শহীদ দিবস হিসাবে করে এবং সরকারি ছুটি দেয় ।
সুতরাং এখনো পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গবাসী তথা ভারতবাসীর সাথে একুশে ফেব্রুয়ারি র কোনো যোগ পাওয়া যাচ্ছে না ।
1999 সালের 17 ই নভেম্বর " ইউনেস্কা " ঘোষণা করে সমগ্র বিশ্বে যার যেখানে যা মাতৃভাষা ; সেই মাতৃভাষাকে সন্মান জানাতে 21 শে ফেব্রুয়ারি দিনটি " আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস " হিসাবে পালিত হবে । সেই হিসাবে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা । যাদের মাতৃভাষা অন্য তারাও তাদের মাতৃভাষা দিবস পালন করবে ।
সুতরাং এটা স্পষ্ট " আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" এবং বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা শহীদ দিবস সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন পেক্ষাপট । একটার সাথে আর একটার কোনো যোগ নাই । যদিও দুটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট দিন একটাই ।
পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী অনেক বাঙালি এই দুইকে গুলিয়ে ফেলে এক করে দেন ।
দিন দিন সমাজ ও শিক্ষার হাল যে স্তরে পৌঁছাচ্ছে তাতে বাংলা ভাষাকে পুনরায় উদ্ধারের জন্য আবার একটা নবজাগরণের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে । যেমন আমরা ছাত্রাবস্থায় পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি- Cell = কোষ ; কিন্তু এখন পাঠ্যপুস্তকে লেখা থাকে Cell = কোশ । এই রকম ভুরিভুরি ।
এখন প্রশ্ন- কোনটি ঠিক ?
একজন বাঙালি ; যার মাতৃভাষা বাংলা সেই যদি সঠিকটা বলতে না পারে তবে কে বলবে ?
রাস্তাঘাটে বাংলায় সাইনবোর্ড , মোবাইল ফেসবুকের বিভিন্ন লেখনী , সমকালীন বিভিন্ন পত্র পত্রিকা এমনকি বাঙালির গর্ব আনন্দবাজার পত্রিকাতেও যে ভাষা বা বানান ব্যবহৃত হয় তাতে ছাত্রাবস্থায় বিদ্যালয়ে বাংলা শিক্ষকদের কাছে যে সমস্ত ভুলের জন্য তাঁরা যে শাস্তি দিয়েছেন - তাতে তাঁরাই লজ্জিত হবেন ।
বিগত কয়েক বছর আগে দেশের অন্যতম সেরা বাঙালি সম্ভবত সৌমিত্র চট্রোপাধ্যায় ( আমার সঠিক মনে নাই) আক্ষেপ করে বলেছিলেন- আমাদের বাঙালিদের লজ্জা ; আমরা আমাদের মাতৃভাষাটাকেও ঠিকভাবে বলতে পারি না ।
সত্যিই তাই । রাস্তাঘাটে অতি সাধারণ কথা বলার সময় সেই কথার মাঝে দু চারটে হিন্দি বা ইংরাজি প্রতিশব্দ না মেশালে আমাদের চলে না । ফলে প্রতিনিয়ত ভাষাটা তার কৌলিন্য হারাচ্ছে । এটা কি আমাদের লজ্জা নয় ?
হয়তো দেখা যাবে , আমার এই লেখনীতেই আমারই অজ্ঞতাবশত কিছু ভাষাগত ত্রুটি থেকে গেছে । কারণ আমিও তো এই সমাজের একটা অংশ ।
পেশাগত জীবনে চোখ পরীক্ষা করার সময় দেখি - বিভিন্ন বয়সের , বিভিন্ন শ্রেণীতে পড়া ছাত্রছাত্রীদের একটা অংশ বাংলায় সাধারণ লেখাটুকুও দু লাইন পড়তে পারে না । ইংরাজি পড়ে গড়গড় করে । যদিও তাদের মাতৃভাষা বাংলা। তাদের সাথে উপস্থিত বাবা মা গর্ব সহকারে হাসতে হাসতে বলেন - " আমার সন্তান বাংলা পড়তে পারে না " ।
আমরা বাংলা মাধ্যমে পড়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনেকের ইংরাজি ভীতির কথা জানি । কিন্তু তার মানে এই নয়- তারা ইংরাজি আদৌ পড়তে পারে না। ইংরাজিতে দুর্বল , তাই তারা হীনমন্যতায় ভোগে । কিন্তু কখনোই তারা ইংরাজি জানে না বলে গর্ব করে না । যেমনটি করে ইংরাজি মাধ্যমে পড়া বাঙালি ঘরের ছেলেরা । অজ্ঞতা কিরূপে গর্বের বিষয় হতে পারে ; আমি বুঝি না ।
একবার ইংরাজি মাধ্যমের এক মেধাবী ছাত্র যে আদৌ বাংলা জানে না , যার মাতৃভাষা বাংলা তাকে বলেছিলাম ; - মনে করো তুমি ভাল রেজাল্ট করে বিদেশের ( আমেরিকা বা ইংল্যান্ড) কোন ভাল বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছ । সেখানে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বলা হলো- যার যা মাতৃভাষা সেই ভাষায় তাকে কিছু বলতে বা লিখতে হবে । তখন তুমি কি করবে ? কিছুই না পারলে মাথা নীচু করে বসে থাকতে কি তোমার লজ্জা হবে না ?
রবীন্দ্রনাথ , নজরুল , শরৎচন্দ্র , বঙ্কিমচন্দ্র, জীবনানন্দ, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল এঁদের বাদ দিয়ে কি বাঙালি হওয়া যায় ? বন্ধু একটু ভেবে বলবেন ।
তাই শুধু মাল্যদান নয় , একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এটাই আমাদের সবার লক্ষ্য হোক - নিজ মাতৃভাষাটাকে সঠিকভাবে জানবো , শিখব , লিখব এবং বলবো ।
* বিনম্র নিবেদন :- বিকাশ সামন্ত ।
তারিখ - 21/02/2020
Comments
Post a Comment