আজও মানুষের সেবায়
প্রেসক্রিপশন লেখা থামে না, জীবন থেমে গেছে বহু আগেই! একসময়ের মেধাবী চিকিৎসক আজ পথের মানুষ—মানসিক অসুস্থতার নিষ্ঠুর গ্রাসে ড. সৌরভ ঘোষ
দক্ষিণ কলকাতার নাকতলা, রামগড় কিংবা বাঘাযতীনের সরু গলিপথে মাঝেমধ্যেই দেখা যায় এক অদ্ভুত মানুষকে। অগোছালো চুল, লম্বা দাড়ি, মলিন পোশাক আর শরীরজুড়ে অনাদরের গন্ধ। পথচলতি মানুষ চোখ ফিরিয়ে নেয়। অনেকের কাছেই তিনি শুধু একজন “মানসিক ভারসাম্যহীন ভবঘুরে”। কিন্তু এই অবহেলিত অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অসমাপ্ত স্বপ্ন, এক ভেঙে পড়া ইতিহাস—ড. সৌরভ ঘোষ।
কলম আর কাগজ হাতে দিলেই যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। চোখে হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে। হাসিমুখে একের পর এক ওষুধের নাম লিখে চলেন। রোগের কথা বললে থামে না হাত—ইনজেকশন, ট্যাবলেট, ডোজ, সবই যেন অদ্ভুত নিখুঁততায় ভেসে ওঠে কাগজে। প্রেসক্রিপশনের শেষে অবশ্যই লেখা থাকে তাঁর নাম, ডিগ্রি আর রেজিস্ট্রেশন নম্বর—WBMC 60314। যেন নিজের পরিচয়টা এখনও হারাতে রাজি নন।
টাইমস নাও-এর সাংবাদিক রাজেশ সাহার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই হৃদয়বিদারক গল্প। আজ যাঁকে মানুষ চিনছে এক ভবঘুরে হিসেবে, তিনি একসময় ছিলেন নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেধাবী ছাত্র। ২০০৩ সালের আশপাশে সেখান থেকেই চিকিৎসাবিদ্যায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন ড. সৌরভ ঘোষ। নাকতলা হাই স্কুল থেকে ১৯৯৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে জয়েন্ট এন্ট্রান্সে উজ্জ্বল র্যাঙ্ক নিয়ে মেডিক্যালে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
সৌরভের পরিবারও ছিল মেধার প্রতিচ্ছবি। বাবা রেল দপ্তরের কর্মী, পাশাপাশি প্রাইভেট টিউটর। দিদি, ভাই—তিনজনই ছাত্রজীবনে অত্যন্ত কৃতী। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তিন ভাইবোনের জীবনেই ধীরে ধীরে বাসা বাঁধে মানসিক অসুস্থতা। দিদি সাথী ঘোষ নিজেও মেডিক্যাল পাশ করেছিলেন, কিন্তু মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে কয়েক বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়। ছোট ভাই গৌরব ঘোষ—যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা মেধাবী ছাত্র—তিনিও মানসিক অসুস্থতায় মারা যান। বাবা-মা তার আগেই প্রয়াত।
একটার পর একটা ধাক্কা সৌরভের জীবনকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। প্রতিবেশীদের কথায়, মেডিক্যাল পাশ করার পর সৌরভ কিছুদিন কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই মানসিক ভারসাম্য হারাতে শুরু করেন। চিকিৎসাজীবন থেমে যায়। আজ তিনি নিজের বাড়ির এক কোণে, প্রথম তলায় একটি নোংরা ঘরে একা পড়ে থাকেন।
ঘরের দেওয়ালজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র লেখা—মেডিক্যাল কলেজের নাম, হাসপাতালের নাম, নিজের নাম, ডিগ্রি, রেজিস্ট্রেশন নম্বর। কোথাও লেখা NRS Medical College, কোথাও CMC Vellore, কোথাও KPC Medical College। কেন এই নামগুলো? কেউ জানে না। হয়তো স্মৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করার একমাত্র উপায় এটুকুই।
পাড়ার কিছু মানুষ আজও তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন মানবিকতায়। কেউ খাবার দেন, কেউ খেয়াল রাখেন। একাধিকবার চিকিৎসার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান মেলেনি। তিনবার বাড়ি ছেড়েও চলে গিয়েছিলেন তিনি।
স্থানীয় মুদি দোকানদার শঙ্কর বলেন, “মানসিক রোগী হলেও ওষুধের নাম একদম ভুলে যায়নি। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে দু’সেকেন্ডের মধ্যে লিখে দেয়।” এক সব্জি বিক্রেতা জানালেন, সৌরভের দেওয়া ওষুধ খেয়েই একবার তিনি সুস্থ হয়েছিলেন। এমনকি কয়েক মাস আগেও বাঘাযতীনে এক ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে, সৌরভের লেখা প্রেসক্রিপশনেই প্রাথমিকভাবে উপকার মিলেছিল বলে দাবি স্থানীয়দের।
যে মানুষটা রোগ সারানোর কথা ছিল সারাজীবন, আজ সেই মানুষটাই লড়ছেন নিজের অদৃশ্য রোগের সঙ্গে। কলম থামে না, স্মৃতি থামে না—থেমে গেছে শুধু জীবনের স্বাভাবিক গতিটা। ড. সৌরভ ঘোষের গল্প শুধু একজন মানুষের পতনের নয়, এটা মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা, সমাজের উদাসীনতা আর ভাগ্যের নির্মমতার এক জ্বলন্ত দলিল।
আজও যদি কেউ এসে বলেন, “ডাক্তারবাবু, একটা ওষুধ লিখে দেবেন?”
তিনি লিখবেন। অবলীলায়। কারণ কোথাও গভীরে, তিনি এখনও একজন ডাক্তারই।
✍️অর্ঘ্য রায়
Comments
Post a Comment