আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতি বৃত্ত আনুষ্ঠানিক প্রকাশ শিলচরে
বিশিষ্ট সাংবাদিক বিকাশ চক্রবর্তীর " আসাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত ' বইয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হল শিলচর ইলোরা হেরিটেজ হলে।
১৯৮৩ থেকে ১৯৯৩ অব্দি দীর্ঘ দশ বছরের নিরবিচ্ছিন্ন আন্দোলনের ফলে ১৯৯৪ সালে শিলচরে প্রতিষ্ঠা হয় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের। এই দীর্ঘ আন্দোলনের লিখিত ইতিহাস এযাবৎ প্রকাশ করতে ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাই নিজস্ব তাগিদে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রচুর শ্রম দিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক বিকাশ চক্রবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের একটি প্রামাণ্য ইতিহাস লিপিবদ্ধ করছেন। আজ ইলোরা হেরিটেজ হলে বিশিষ্টজনের উপস্থিতিতে তাঁর ' আসাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত ' শিরোনামে বইটির উদ্বোধন হল।
এদিনের সভায় অভ্যাগতদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিকাশ চক্রবর্তী ছাড়াও আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য্য, সাময়িক প্রসঙ্গ পত্রিকার কর্ণধার তৈমুর রাজা চৌধুরী, আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রদীপ দত্তরায়, হাইলাকান্দি এস এস কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ হিলাল উদ্দিন লস্কর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নিরঞ্জন দত্ত , বিশিষ্ট সমাজকর্মী স্বর্ণালী চৌধুরী, বিশিষ্ট শিল্পপতি মহাবীর জৈন সহ আরো বহু বিশিষ্টজনেরা।
সন্ধ্যা চক্রবর্তী ও সহশিল্পীদের উদ্বোধনী সঙ্গীতের পর প্রারম্ভিক বক্তব্যে বিকাশ চক্রবর্তী বলেন স্বাধীনতার আগে থেকেই বৃহত্তর সিলেট কাছাড় অঞ্চলে এরকম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি ছিল। তিনি বলেন কিছুদিন আগে'আসাম বিশ্ববিদ্যালয় আসাম আন্দোলনের ফসল এমন একটি তথ্য বিকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবার পরই তিনি এই উদ্যোগ নেবার সিদ্ধান্ত নেন । তিনি বলেন যতটুকু সম্ভব আন্দোলনের খুঁটিনাটি তিনি এই বইয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
বইটির আবরণ উন্মোচন করেন হিলাল উদ্দিন লস্কর সহ মঞ্চে উপস্থিত বিশিষ্ট জনেরা।
পরে হিলাল উদ্দিন লস্কর তার বক্তব্যে বলেন যে নতুন প্রজন্মের জন্য এই বই অত্যন্ত জরুরি কারণ তারা এই আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেনি। তিনি এইজন্য লেখক বিকাশ চক্রবর্তীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন যে যাঁরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে রাস্তায় যারা ঝাঁপিয়ে ছিলেন যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভোধন হয় সেদিন তাঁরা কিন্তু আমন্ত্রণ পাননি। তিনি বলেন যে এটা প্রত্যাশিত ছিল যে স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এই বিশ্ববিদ্যালয় নতুন দিশা দেখাবে।এই অঞ্চলের সাহিত্য শিল্প,কৃষ্টি সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করবে এই প্রতিষ্ঠান। কিভাবে স্থানীয় সম্পদ ব্যাবহারের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেই ব্যাপারে যথাযথ গবেষণা ও প্রয়োগের ব্যাবস্থা করার দায়িত্ব ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। কিন্তু তার বিচারে বিশ্ববিদ্যালয় সেই মানে উন্নীত হয়নি। তিনি সবাইকে এনিয়ে চিন্তা ভাবনা করা ও সোচ্চার হবার আহ্বান জানান।
অধ্যাপক নিরঞ্জন দত্ত বলেন যে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ৬০টি কলেজ রয়েছে।প্রাক আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগে মাত্র ৯টি কলেজ স্বীকৃত ছিল। ফলে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য এই অঞ্চল শিক্ষা ক্ষেত্রে কতটা উপকৃত হয়েছে তা বলা বাহুল্য। তিনি এজন্য লেখক বিকাশ চক্রবর্তীকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি এই ব্যাপারে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিভাবে রাজনৈতিক কারণে এই ইতিহাস ছাপাতে টালবাহানা করেছে তা বিশদে জানান। এই বই সমস্ত বিতর্কে ইতি টানবে বলে তিনি মনে করেন।
বিশিষ্ট শিল্পপতি মহাবীর জৈন এদিন তাঁর বক্তব্যে আকসার আন্দোলনের জন্যই আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এইজন্য অবশ্যই আকসা নেতৃত্বের ধন্যবাদ প্রাপ্য। তিনি বলেন বই সমাজের আয়না। এই বই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ইতিহাস ছড়িয়ে দেবে। এজন্য তিনি লেখকের প্রতি পুনরায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রদীপ দত্তরায় এদিন বলেন যে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন শুধু আকসার আন্দোলন ছিলনা। বরাকের সর্বস্তরের মানুষ, বিভিন্ন দলের বিধায়ক,চা বাগানের মজুর,এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মহিলারাও এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তিনি এই ব্যাপারে দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ সহ বরাকের বিভিন্ন সংবাদ পত্র ও সাংবাদিকের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি এই ব্যাপারে বোরো জননেতা উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্ম, ত্রিপুরার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী, মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালথানওয়ালার সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি এই ব্যাপারে ব্যাবসায়ী মহাবীর জৈন ও জৈন পরিবারের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে বিকাশ চক্রবর্তী পরিশ্রম করে যে বইটি প্রকাশ করেছেন তাঁকে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটিকে কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন ইতিহাস উপেক্ষিত বলেই বরাকের নবীন প্রজন্ম আন্দোলন বিমুখ হয়ে পড়েছে। তিনি আরো বলেন যে এই বিশ্ববিদ্যালয় বরাকের শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এবং শুধু বরাক নয় এতে এখন পড়াশোনা করছেন অসমিয়া, বিহারী,মিজো,কুকি সহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ।
এ ছাড়াও আকসার আন্দোলন নিয়ে আবেগিক বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সমাজ কর্মী স্বর্ণালী চৌধুরী মহাশয়া।
শেষ বক্তা এদিনের সভার সভাপতি তৈমুর রাজা চৌধুরী বলেন যে অধ্যাপক সুবীর কর লিখিত পান্ডুলিপি প্রকাশে আগ্রহী ছিল বরাক বঙ্গ। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনো তাঁর পরিবারের অনুমতি মেলেনি। অনুমতি পেলে বরাক বঙ্গের পক্ষ থেকে তাঁরা এই ইতিহাস প্রকাশে এখনো প্রস্তুত রয়েছেন।
তিনি এদিন আকসার আন্দোলনের বিভিন্ন অজানা ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে ইতিহাস রচনা একটি চলমান ঘটনা। এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে পূর্ণতা লাভ করে। তিনি বলেন লেখক বিকাশ চক্রবর্তীকে ধন্যবাদ যে তিনি সেই প্রক্রিয়ার ইতিমধ্যে শুরুয়াত করে দিয়েছেন। এর উপর ভিত্তি করেই আরো পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আগামীতে লিখিত হবে বলে তিনি আশাবাদী। তিনি এই বইটি আসাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।
মনোজ্ঞ এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন এই বইয়ের প্রকাশক সংস্থা নতুন দিগন্ত প্রকাশনী'।
Comments
Post a Comment