নববর্ষে গুয়াহাটি সোনাপুর জুবিন সমাধি ক্ষেত্র কলকাতার দেশ ভাবনার জুবিন স্মরণ

নববর্ষের প্রথম প্রহরে জুবিন: সম্প্রীতির সুরে বাঁধা এক সমাধিক্ষেত্র

নিজস্ব প্রতিনিধি: ইংরেজি নববর্ষের প্রথম সকাল। চারপাশে যখন নতুন বছরের আনন্দে শহর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে, ঠিক তখনই সোনাপুরের এক কোণায় তৈরি হচ্ছিল এক ভিন্ন ছবি—নীরব, গভীর, অথচ অসাধারণভাবে মানবিক। ২০২৬ সালের প্রথম দিনেই মানুষের ঢল নামল জুবিন গার্গের সমাধিক্ষেত্রে। কেউ আসছেন ফুল হাতে, কেউ চোখ ভেজা আবেগ নিয়ে, কেউ আবার নিঃশব্দ প্রার্থনায় ডুবে। এখানে কেউ পর্যটক নন, সবাই যেন এক আত্মিক টানে ছুটে আসা মানুষ।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাধিক্ষেত্রের বাতাস ভরে উঠল নানা ভাষার সুরে। কোথাও হিন্দি গান, কোথাও অসমিয়া, কোথাও আবার বাংলার সুর। এই গানের মধ্যে ছিল না কোনও ভাষার বিভাজন, ছিল না কোনও ধর্মীয় সীমারেখা। ছিল শুধু একজন শিল্পীর প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা। জুবিন যেন আজ আর কেবল একজন জনপ্রিয় গায়ক নন—তিনি হয়ে উঠেছেন এমন এক নাম, যা মানুষকে একত্রিত করতে জানে।
সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে কেউ দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রার্থনা করছেন, কেউ চোখের জল গোপন করছেন রুমালে। কেউ আবার চাপা কণ্ঠে বলছেন—ন্যায়বিচার চাই। মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে একটাই দাবি—ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি নেই। অনেকের বিশ্বাস, সুবিচারই পারে জুবিনের আত্মাকে প্রকৃত শান্তি দিতে। সেই বিশ্বাস থেকেই উঠে আসছে একটাই উচ্চারণ—“জুবিন সুবিচার পাক।”
তবে এই দিনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সম্প্রীতি। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেছেন। কোথাও হাঁটু গেড়ে খোলা আকাশের দিকে হাত তুলে প্রার্থনা, কোথাও নীরব ধ্যান, কোথাও আবার মাথায় হাত জুড়ে শ্রদ্ধা নিবেদন। মুহূর্তের মধ্যেই সমাধিক্ষেত্র পরিণত হয়েছিল এক মিলনভূমিতে, যেখানে ধর্ম নয়, পরিচয় ছিল কেবল মানবিকতা।
অনেক দর্শনার্থী বলছেন, নববর্ষের দিনে এমন দৃশ্য তাঁরা আগে কখনও দেখেননি। যখন চারদিকে আনন্দ-উৎসব, তখন মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে—জুবিনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধুই শিল্পীর নয়, তা হৃদয়ের। তাঁর গান যেমন জীবদ্দশায় ভালোবাসা আর সম্প্রীতির কথা বলেছে, তাঁর সমাধিক্ষেত্রও আজ সেই একই বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। জুবিন ক্ষেত্রে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন অসমের রাজধানী দিশপু্র প্রেস ক্লাবের সভাপতি তথা প্রবীণ সাংবাদিক অমল গুপ্ত, সঙ্গীত শিল্পী মলিনা বর্মন, সাংস্কৃতিক সংগঠন দেশ ভাবনা'র অন্যতম প্রধান শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ এবং সাংবাদিক দেবকিশোর চক্রবর্তী। 
এই সমাধিক্ষেত্র আজ শুধুই স্মৃতির স্থান নয়। এটি হয়ে উঠেছে এক প্রতীক—যেখানে বিভেদ নেই, সংকীর্ণতা নেই, আছে শুধু মানুষে মানুষে সংযোগ। নববর্ষের প্রথম দিনের এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ যতই বিভক্ত হোক, ভালোবাসা চাইলে মানুষকে আবার একসূত্রে বাঁধতে পারে।
২০২৬ সালের প্রথম দিনে জুবিন গার্গের সমাধিক্ষেত্র তাই কেবল স্মরণস্থল হয়ে থাকেনি। তা হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির সুরে বাঁধা এক অনন্য মানবিক পরিসর। জুবিন আজ শুধুই একজন শিল্পী নন—তিনি এক অনুভূতি, এক মানবিক চেতনা, যাঁর সুর এখনও মানুষকে এক করে রাখে।

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর