বাংলাদেশের সাংবাদিক রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডে বাংলার মুসলিম সমাজের নিন্দা

বাংলাদেশের সাংবাদিক রানা প্রতাপ বৈরাগীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তীব্র নিন্দা পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের

কিশোর ভরদ্বাজ  ,কলকাতা সংবাদদাতা

বাংলাদেশ-এর যশোর জেলার কেশবপুর এলাকায় বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। এই হত্যাকাণ্ডকে তাঁরা কেবল একটি ব্যক্তি হত্যার ঘটনা নয়, বরং মানবাধিকার, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছেন।
সোমবার বিকেলে যশোর জেলার কেশবপুর থানাধীন মনিরামপুরের কোপালিয়া বাজার এলাকায় এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগীর বয়স ছিল ৩৮ বছর। তিনি কেশবপুর উপজেলার অরুয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পেশাগতভাবে তিনি একদিকে মনিরামপুরে একটি বরফ তৈরির কারখানার মালিক ছিলেন, অন্যদিকে নড়াইল থেকে প্রকাশিত দৈনিক দৈনিক বিডি খবর-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রজিউল্লাহ খান সাংবাদিকদের জানান, বিকেল আনুমানিক ৫টা ৪৫ মিনিট নাগাদ তিনজন মোটরসাইকেল আরোহী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে তাঁর কারখানার বাইরে একটি গলিতে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁকে নিকট দূরত্ব থেকে মাথায় তিনটি গুলি করা হয়। এরপর অত্যন্ত নৃশংসভাবে তাঁর গলা কেটে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এই নির্মমতা এলাকাজুড়ে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্য তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করছে, এটি নিষিদ্ধ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রানা প্রতাপ বৈরাগীর বিরুদ্ধে অতীতে চারটি মামলা দায়ের হয়েছিল। তবে তাঁর পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের দাবি, সাংবাদিকতা ও ব্যবসায়িক কারণেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে হুমকির মুখে পড়ে থাকতে পারেন। তাঁদের মতে, এই হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত এবং লক্ষ্যভিত্তিক।
এই ঘটনার পরপরই পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের বিভিন্ন সংগঠন, ধর্মীয় নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা একাধিক বিবৃতিতে হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান। কলকাতার বিশিষ্ট মুসলিম সমাজকর্মী ও সাংবাদিক শাকিলা বেগম বলেন,
“একজন সাংবাদিককে এভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ওপর এই আঘাত কোনো সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের একসঙ্গে রুখে দাঁড়াতে হবে।”
উত্তর ২৪ পরগনার মুসলিম ধর্মীয় নেতা মৌলানা বরকত উল্লাহ চৌধুরী বলেন,
“বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর ধারাবাহিক সহিংসতার যে চিত্র উঠে আসছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক। রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ড সেই ধারাবাহিকতারই একটি ভয়ঙ্কর উদাহরণ। অবিলম্বে দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি না দিলে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটবে।”
একই সুর শোনা গেছে কলকাতার ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ফিরোজ আহমেদের কণ্ঠেও। তিনি বলেন,
“এই ধরনের নিন্দনীয় ঘটনা কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ মেনে নিতে পারে না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সচেতন মুসলিম সমাজ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। হিন্দু ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের ওপর লাগাতার আক্রমণ কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। এর একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অনিবার্য। সাংবাদিক রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।”
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর একাধিক সহিংস ঘটনার খবর সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ জানুয়ারি খোকন চন্দ্র দাসের নির্মম হত্যা, ২৪ ডিসেম্বর অমৃত মন্ডলের লিঞ্চিং এবং ১৮ ডিসেম্বর দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড। একই সময়ে কালীগঞ্জে এক ৪০ বছর বয়সী হিন্দু বিধবাকে সম্পত্তি বিবাদের জেরে গণধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনাও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পুলিশ ওই ঘটনায় মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং ও জনতা-নির্ভর সহিংসতা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ক্রমশ আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে। এর প্রভাব দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও পড়ছে। ভারত সরকার ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
২০২২ সালের জনগণনা অনুযায়ী, বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩১ লক্ষ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ড সেই দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিল বলে মত বিশেষজ্ঞদের।ছবি আছে কিনা গতকাল হিন্দু ব্যবসায়ী মনী চক্রবর্তী কে হত্যা করা হয়েছে। এবার পশ্চিমবঙ্গের  নদিয়ার শান্তিপুরে   বহু সরস্বতী মূর্তি কালী মূর্তি  ভেঙে ফেলা হয়েছে। 

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর