ভোরের কুয়াশা ধান সেদ্ধ র সুবাস,শুধুই স্মৃতি
ঠাম্মা ভোরে উঠেই বিশ নম্বরি ধানসেদ্ধর কড়াইয়ে গরম জল করার জন্য বাইরের চুলায় আগুন দিতেন। বাইরের চুলা বলতে একটা কেরোসিনের টিনের ছাপরা, তার তলায় শুকনো,নারকেল পাতা, কাঠখড়ের আগুন। আমরা ঠান্ডায় কাঁপতে-কাঁপতে সাতসকালে জড়ো হতাম চুলার পাড়ে। পিঁড়ি, জলচৌকি বা পাছার তলায় কাঠের ঠ্যাঙা, চেলা কাঠ...যা জুটত সেটাই আসন। 'আগুন তাপানো' বলতাম। মাঘী শীত। দাঁতে ঠকঠক কাঁপন। ঘন কুয়াশা। অমন শীত এখন শহরে পাই না। শীত কমতে কমতে মাসখানেকে পৌঁছেছে, শীত মানে কেবল জানুয়ারি মাসটুকু।
শীতের কাপড় তেমন জুটত না। বাবার ঘাড়ে মস্ত সংসারের চাপ। তাছাড়া, জমিজমা থাকার পরও বাবা চিরদিন আস্ত হরিহর। বিষয়বুদ্ধিহীন সংসারবিবাগী সদানন্দ উদাসীন মানুষ। তাই আমাদের শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যে। অবশ্য, সেইসময় সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক অবস্থা বেশির ভাগ মানুষেরই ভালো ছিল না।
একেবারে স্পষ্ট মনে আছে, ঘরের পুরনো জীর্ণ ছেঁড়াফাড়া শাড়ি ধুতি দিয়ে
ঠাম্মার হাতের তৈরি কাঁথাই(আমরা বলতাম "খেতা")ছিল ঠান্ডা নিবারণের মূল সম্বল। দিদিরা অবসরে সারাক্ষণ উলের সুয়েটার বুনত। বাইরে যাবার সেগুলোই ভরসা। তাও বড়দের। কেননা, দাদারা বাজার হাটে যায়, কিংবা সামাজিক কাজে। আমাদের ছোটদের তো এইটুকুন পৃথিবী। বাড়ি থেকে লাল টাঙির ওধারে সড়ক। ব্যস, ভালুকমারি জোড়াপুখুরি স্কুল। বাইরের পৃথিবীটা ওটাই।
মোজা? জুতো? বিশ্বাস করুন, সেসবের চল আজকের মতো ছিলই না গাঁয়ে। 'ইনার'!!! হায় হায়, সেটা আবার কী! আমাদের শীতবস্ত্র বলতে বড়জোর টুপি, মাফলার। গায়ে হাফ সুয়েটার, কম্বলমার্কা চাদর। মাফলারটা অবিকল অরবিন্দ কেজরিবালের মতো পরত লোকে। হাওয়াই চপ্পল বা শস্তা প্লাস্টিকের জুতো। মোজাটা একটু 'শখ' ও আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রতীক। আমি ছোটদিদির একটা পুরনো 'চাদর'(গরম কাপড়ের) পরে কলেজে যেতাম। রুনুমি তখন এট্টু এট্টু পছন্দ করা শুরু করেছে আমাকে।হালকা মন দেয়া-নেয়া পর্ব।ছেলেদের কেউই ওরকম মেয়েলি চাদর(শালও নয়, শালের তবু নারী পুরুষ ভেদ রয়েছে) পরত না। ফিচেল ছোকরা বন্ধুরা ঠাট্টা করে মাথায় গাট্টা মেরে বলত, 'কী রে, গার্ল ফ্রেন্ড কি উপহার দিছে নাকি?' কষ্ট হতো, একটা ভালো সুয়েটারও ছিল না বলে। তাও সুখ, সঙ্গে তো একটি মেয়ে আছে, যে-আমার কষ্টটা বোঝে। আজ দাম্পত্য জীবনের পঁচিশ বছরে পা দিয়েও রুনুমি আমার কলেজজীবনের সেই চাদরটির কথা বলে। আমি আনমনা হয়ে সেই চাদরের ঘ্রাণ এখনও যেন পাই। যেন আমার সর্বাঙ্গে উঠে আসে পরম গৌরবের এক গরিব শৈশব। আজ আমার গোদরেজের প্রকাণ্ড আলমারি ভরা রকমারি জ্যাকেট, স্যুট, সুয়েটার, কত কত গরমকাপড়। কিন্তু আজও রুনুমির প্রিয় সেই চাদরটির মতো মায়াময় শীতবস্ত্র একখানাও নেই।
সবচেয়ে কষ্ট হতো রাতে। একেবারে ছোটবেলায় এইটুকুন আমি ঠাম্মার বুকের ভেতরে গিয়ে ঢুকতাম। কী এক অনির্বচনীয় ওম...! একটু বড় হবার পর একটা কাঁথার তলায় আমরা তিন ভাই, কুটিদা, নীলুদা আর আমি...জড়াজড়ি করে শুতাম। আমাদের শরীরের মধ্যে পরস্পরের তাপ সঞ্চারিত হতো। সামান্য কাঁথায় মাঘের শীত কাটত না। প্রবল শৈতপ্রবাহ...হাড় কাঁপানো ঠান্ডা...বিছানায় তোষক বলতে খড়...খড়ের গরম অনেক...অন্তত তলা থেকে হাড়হিম শীত উঠে আসে না। দিনে রোদ উঠলে পাথারে লেপ কম্বল কাঁথা সব ফেলে রাখা হতো...রাতে গরম-গরম একটা ভাপ লাগত গায়। 'লেপ' থাকা মানে তো পরম ভাগ্য। পুজোর পরেই বাবা ডেকে আনতেন ধুনুড়ি বা ধুনকর। বিহারি ধুনুড়িরা সাইকেলের ক্যারিয়ারে কার্পাস তুলার গাট্টি বেঁধে ফটাং ফটাং করে তুলাধুনার যন্ত্র বাজিয়ে বাজিয়ে যেত। উঠানে লেপ তৈরি হচ্ছে, অঘ্রানের বিকেলের নরম রোদ, ভারা-ভারা ধানের বোঝা উঠে আসছে খেত থেকে....আহা, আমরা তন্ময় হয়ে দেখতাম...লেপ তৈরির সেই অনন্য মুহূর্ত...! ছোট্ট মন কল্পনা করত এবারকার শীতে লেপের তলায় ঘুমুতে পারব...!
আজ চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর পর ছোটবেলায় তিনভাই ঠান্ডায় জড়াজড়ি করে কাঁথার তলায় ঘুমানোর সেই দিনগুলি মনে পড়ল...। কেন পড়ল তা এই ভিডিও ও ছবি দেখেই বুঝতে পারবেন।
শীতকে কাবু করে আপাদমস্তক গরম রাখার সমস্ত গরমকাপড় এখন আমাদের জীবনে আছে। কিন্তু কুটিদা, নীলুদা আর আমি~তিন ভাই মিলে জড়াজড়ি করে ঘুমানোর সেই সুখ কি অনুভব করি এখন?
Comments
Post a Comment