বাঙালিদের বড় দিন


•••
রাত বারোটা থেকে বড়দিনের শুভকামনার ধুম লেগেছে। আমাকেও অনেকে পাঠাচ্ছেন :  Happy Christmas to you and your family 💝 
এরা সকলেই হিন্দু বাঙালি। 
    আমি লিখেছি : "আমি তো খ্রিষ্টান নই এবং আমার পরিবারও নয়।" 
   এদের যুক্তি  : তাতে কী? উৎসব তো সবার। 
   উৎসব সবার? আচ্ছা, খ্রিষ্টানরা কি জন্মাষ্টমী পালন করে? দুর্গাপূজায় কি খ্রিষ্টানরা দলে দলে পালে পালে পূজা মণ্ডপ উপচে পড়ে? খ্রিষ্টান মিশনারি পরিচালিত স্কুলগুলোতে সরস্বতী পূজা হয়? কয়টা স্কুলে হয়? ওদের বাচ্চাদের কি জন্মাষ্টমীর দিন কৃষ্ণ সাজায়? তুলসী গাছে জল ঢাললে  সেটা কুসংস্কার, আর নকল গাছে টুনি লাইট লাগিয়ে কেক কাটা আধুনিকতা? সান্তাক্লজ খায় না মাথায় দেয়? সান্তাক্লজের ইতিহাস তো বিতর্কিত!!
    সকলেই এর উত্তরে জানাচ্ছেন :  "আমরা হিন্দুরা উদার। আমরা আমাদের মতো। ওরা কী করল বা না-করল তাতে আমাদের কী যায় আসে?"
   আমি বলেছি : তা তো ঠিক ~কথায় আছে, তুমি অধম হইবে বলিয়া আমি কি উত্তম হইব না?! কিন্তু আত্মবিস্মৃত হিন্দু বাঙালি এটা ভুলে গেছে যে, অমন উদারতা দেখাতে দিয়েই তাদের অনেকের পূর্বপুরুষদের কাঁটাতারের তলা দিয়ে এপারে পালাতে হয়েছে। আমরা এটা বলছি না যে : নোয়াখালিতে হাজার হাজার ধর্ষণ ঘটেছে বলে ধর্ষিতার পরিবারের পুরুষেরা ফের গণধর্ষণ করুক। কিন্তু আর যাতে হাজার হাজার নারী ধর্ষিতা না হয়~সেই পরিবেশ আনতে হলে নিজ সংস্কৃতিগত সংঘবদ্ধতা কত জরুরি সেটা আজও হিন্দু বাঙালিরা বোঝেনি। অথচ গুরুবাক্য আছে~ নিজত্ব হারিয়ে কাউকে খুশি করতে নেই। যে-পরমপুরুষ এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন, তিনি এটা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উভয় ক্ষেত্রেই বলেছেন। এটাও বলেছেন : "আর্যকৃষ্টির যা ব্যাঘাত/ খড়্গে তোরা কর নিপাত"।সান্তাক্লজ নামক সং সাজাটা যে আর্যকৃষ্টির মধ্যে পড়ে না~ সেটাও কি বোঝাতে হবে?! উদারতা এক তরফা নয়। উভয় তরফা হয়। উদারতার নামে যা করা হয় সেটা আদৌ ধর্মাচরণই নয়। দুর্বলতা। পরমপুরুষ কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষার্থে "ধর্মগুন্ডা" শব্দটি পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন। গুন্ডা মানে গুন্ডামির করার জন্য নয়। একরোখা প্রহরী। প্রভু জিশুর জীবনই আমাদের শিক্ষা। কিন্তু মিশনারিদের কারবার আমাদের অনুকরণীয় হতে পারে না।  প্রলোভন ও অর্থের সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের টোপ দিয়ে গোটা উত্তর-পূর্বের সহজ সরল আদিবাসী ও পাহাড়িয়াদের এরা খ্রিষ্টান করে ছেড়েছে। অথচ এই মানুষগুলো প্রাচীন অষ্ট্রিক ও মঙ্গোলীয় ধারার। ইরান থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত আর্য সভ্যতার বিস্তৃত সংস্কৃতির সঙ্গে এদের অনেকে সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার ছিল। সব মিলিয়েই ভারতীয় আর্য জীবন। পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা। বাঙালি হিন্দুদের বড় অংশ আমোদ প্রমোদপ্রিয় বিনোদনবাদী "ধর্মে" ও সংস্কৃতির গড্ডলিকায় গড়িয়েই চলছে। অথচ একবারও ভাবছে না : স্বাভিমান ও স্ববোধ কত দরকার। আজ গুয়াহাটির গির্জাঘরগুলোতে ৯৯% হিন্দু বাঙালি উপচে পড়বে। অথচ আজ "তুলসী পূজন দিবস"। বাড়িতে একটি তুলসীগাছও গাছ লাগাবে না। জল দেওয়া তো দূর। এবং কী মজার ~ সর্দি কাশি হলেই তুলসী পাতার খোঁজ করবে! মধুর সাথে মিশিয়ে খাবার নিদান দেবে। এটা বুঝতে পারে না~আর্য কৃষ্টির মূল বাণীই হচ্ছে :"বাঁচতে নরের যা যা লাগে, তা নিয়েই ধর্ম জাগে"। "ধর্ম যদি না ফুটল তোর সংসারেরই প্রতি কর্মে, বাতিল করে রাখলি তারে, কী হবে তোর তেমন ধর্মে?" এই বাঁচাবাড়ার মর্মটি তো নকল গাছে টুনি লাইটের মধ্যে নেই। ওটা বিনোদন। ধর্মের নামে ভড়ং। প্রথমে শকহুনদল পাঠান মোগলের পায়ের তলায় এবং এরপর ব্রিটিশের গোলামি করে হিন্দুদের অমন "উদারতা" রক্তবাহিত হয়ে গেছে। তাই মিশনারি স্কুলে গিয়ে চিবিয়ে ইংরেজি বলাটাই "শিক্ষিত" হওয়া বোঝে এরা। সেই সঙ্গে মিশনারি স্কুলে বাচ্চাদের "ভূত পেতনি" সাজানোর মধ্যে এরা গর্ববোধ করে। কয়টি হিন্দু বাঙালি বাড়িতে কালীপূজার রাতে পাল্লালাল ভট্টাচার্যের কালীর মালশী বাজে? অথচ মেরি ক্রিসমাসের উল্লাসে থাকা যায় না ঘরে, পাড়ায়, মহল্লায়। খানার সঙ্গে পিনা। 
   পরমপুরুষ বলেছেন : "তুষ ফেলে চাল নিতে হয়"। আমরা তুষ নিচ্ছি। ভুষি নিচ্ছি। চাল নিচ্ছি না। অথচ প্রভু জিশুর জীবনের বাণী স্মরণ করার কথা।  গ্যালিলির হ্রদে মাছ ধরছিল দুই ভাই ~সাইমন আর অ্যান্ড্রু। জিশু বললেন ~ "এতকাল মাছ ধরেছ। চলো এবার মানুষ ধরি।" তিনি মাত্র তেত্রিশ বছরের জীবনে মানব সভ্যতার চরম সত্য বলে গেছেন ~ "মানুষ ধরো"।  ভারতীয় যোগ ধ্যান প্রাণায়াম শিখতে তিনি কাশ্মীরে এসে ঋষিমুনিদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন। এই কথা লিখছেন ব্রিটিশ পণ্ডিতেরাই। আর আমরা মিশনারিদের উৎপাতকে এবং পরধর্মআগ্রাসনকে জিশুর জীবনবাণী বলে উচ্ছিষ্ট খাচ্ছি। 
   জিশু একদিন পার্ষদদের নিয়ে বসেছিলেন। ফ্যারিসিরা একটি নারীকে ধরে নিয়ে এল। বলল :"প্রভু, মেয়েটি ব্যাভিচারিণী। হাতেনাতে ধরা পড়েছে। মোমেস এরকম মেয়েদের পাথর ছুঁড়ে মারার নিদান দিয়ে গেছেন। তবু আপনি কী বলেন শুনি।" প্রভু জিশু সোজা হয়ে বসে বললেন :"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি জীবনে কোনো পাপ করেনি, সে প্রথমে ওকে পাথর ছুঁড়ে মারুক।" ব্যস। হাত থেকে সব পাথর খসে পড়ল।  অন্যকে দোষী করার আগে নিজের বিচার কতটা জরুরি~সেটা তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন।মানব সভ্যতায় এই চিন্তাগুলো চিরন্তন হয়ে রইল। 
   তাঁকে ধরিয়ে দিয়েছিল তাঁর এক "শিষ্য"। জুডাস ইসক্যারিয়ট। পরে লোকটি আত্মঅনুশোচনায় আত্মহত্যা করেছিল। জিশুকে রাজার সৈন্যরা চিনতে পারেনি। তিনি নিজেই "আমিই ন্যাজারেথের জিশু" বলে পরিচয় দিয়ে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছিলেন। তাঁকে ধরতেই শিষ্যরা সব পালিয়ে গেছিল। মনুষ্য চরিত্র। য পলায়তি সঃ জীবতি। চাচা আপনা প্রাণ বাঁচা। যাঁরা গুরুকে রক্ষা করতে পারে না~তাঁরা আবার কীসের শিষ্য?! একজন শুধু পালাননি। তিনি মার্ক। যিনি জিশুর কাহিনির প্রত্যক্ষদর্শী শিষ্য। প্রাণ রক্ষার্থে শেষ মুহূর্তে তিনি সরে গেছিলেন। মানুষের ইতিহাস জিশুর জীবন জেনেছিল এই মানুষটির জন্য। 
   জিশুকে যখন তক্তায় পেরেক মেরে ও কাঁটায় বিঁধে তিলে তিলে মারা হয়েছিল~তখন তাঁর ডানে-বাঁয়ে দুই ডাকাতও ছিল। ধর্মযাজকেরা বলছিল : "যিনি নিজেই নিজেকে উদ্ধার করতে পারেন না, তিনি মানুষের উদ্ধারের কথা বলতে এসেছিলেন!" মূর্তি ভাঙার আগে-পড়ে ইসলামি মৌলবাদীরাও এরকম বলে~হিন্দুদের দেবদেবীদের মূর্তি ভাঙি, কই তাঁরা তো নিজেদের রক্ষা করতে পারেন না। মূর্খরা এটা বোঝে না যে, ভারতীয় আর্য সভ্যতার দর্শন হলো ~ "রক্ষা" নিজেকেই করতে হয়। আকাশ থেকে কেউ নেমে আসেন না। যা যা করলে জীবন রক্ষা হয় ও বৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলে সেটাই ধর্ম। তার জন্য কিছু বিধিবিধানের অনুসরণ করতে হয়। সবই নিয়মের অধীন। বিধির অধীন। তাই তো ঈশ্বরকে "বিধি" বা "বিধাতা" বলা হয়। আমরা এই বিধি ও সত্য জানি না। জানেন গুরুরা~ পরমপুরুষেরা। যেমন জেনেছিলেন জিশু বা সক্রেটিস বা বুদ্ধদেব। নিজেদের জীবন দিয়ে তাঁরা মানব সভ্যতাকে মার্গদর্শন দিয়ে গেছেন। আর ভাব যার মধ্যে মূর্ত হয়~সেটাই মূর্তি। মূর্তির মধ্যে একটি ভাবকে দেখা যায়। যেমন, ক্রস চিহ্নকে দেখলে জিশুর কথা মনে আসে।
   আমাদের দেশ পৃথিবীর আদিতম সভ্যতা ও দর্শনের দেশ। অথচ আমরা নিজেদের সব কিছুকে অবহেলা করে বাইরের নিকৃষ্ট কালচারকে "আধুনিক" বলে ভাবি। কবি ঈশ্বর গুপ্ত রেগে গিয়ে লিখেছিলেন :"স্বদেশের ঠাকুর ফেলে বিদেশের কুকুর ভজা"।
    আমরা "গুড মর্নিং"-এর জায়গায় বসিয়ে দিয়েছি "জয়গুরু"কে। জয়গুরু মানে গুরুর জয় ঘোষণা। গুরুকে নমন। তাঁকে স্মরণ করে তাঁর ভাব অন্যের মধ্যে সঞ্চার। নমস্কার বা হাতজোড় করে প্রণামের মাধ্যমে। আর গুড মর্নিং হলো ~ সুন্দর সকাল। শীতের দেশে সারা বছর রোদের দেখা নেই। বিলেতে সকালগুলো তাই বিমর্ষ বিষণ্ণ থাকে প্রায়শ। ব্রিটিশেরা তাই দিনটাকে চাঙ্গা করতে সামান্য রোদ বা ফর্সা আকাশ দেখলেই বলত  আর সময়কে নিয়ত উপভোগ করার জন্য গুড ডে, গুড নুন, গুড ইভনিং, গুড নাইট~ইত্যাদি। আমাদের দেশে গুরুর বাণী ও বার্তা জীবনে নিয়ত উপভোগ করা ও সঞ্চার করার জন্যই "জয়গুরু" "জয়গুরুদেব" "প্রণাম" "নমস্কার" বলার প্রথা আছে। দুটি ধারা কি এক হলো? 
   আমাদের দেশের "স্বামী" কি "Husband"? যাঁকে অগ্নিসাক্ষী করে সারাজীবন বহন করার সংকল্প নিই~তিনি "বধূ"। আবার "পা"ধাতুর সঙ্গে +অতি যোগ করে "পতি" শব্দ এসেছে। পা ধাতুর অর্থ পালন করা। যিনি নারীর জীবনকে পালন করবেন, রক্ষা করবেন~তিনিই "পতি"। তিনি রক্ষক। জীবনের ও সংসারের। "স্বামী" এসেছে "স্ব"+মিন থেকে। যিনি আমার(অর্থাৎ "স্ব"-র) সর্বস্ব। সেটা কি "মিস্টার" "হাজব্যান্ড", "হাব্বি"-তে প্রতিফলিত হয়? অনেকে ফেসবুকে "হাব্বি" বলে বিদেশী সুখ পায়। কিন্তু "বর" যে "বরণ" থেকে এসেছে, সেটা জানে না। যাঁকে সারাজীবনের জন্য প্রাণমনদেহ দিয়ে বরণ করা হয় তিনিই "বর"। ওদের দেশে সকাল বিকাল জামা পালটানোর মতো বর পাল্টানো যায়। পান থেকে চুন খসলে ডিভোর্স হয়। আর আমাদের পাগলা ভোলা আশুতোষ শিবঠাকুরকে নিয়ে মা পার্বতীর নিত্য কলহ~তবু সারা জীবনের সুখদুখের সাথি। একজন আরেকজনকে ছেড়ে থাকতে পারেন না। এই আমাদের দেশ।আমাদের সভ্যতা। পার্থক্য আছে। থাকবে। 
•••
প্রশান্ত চক্রবর্তী
গুয়াহাটি
২৫ ডিসেম্বর ২০২৪

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর