রেকর্ড জয়ের পরেও তৃণমূলের বিক্ষোভ
ডায়মন্ড হারবারে রেকর্ড জয়ের পরও ক্ষোভ—সংগঠনের ভেতরে দানা বাঁধছে অসন্তোষ
দেবকিশোর চক্রবর্তী। ডায়মন্ড হারবার
ডায়মন্ড হারবারে ইতিহাস গড়ে রেকর্ড ব্যবধানে জয় পেলেও নিজের সংসদীয় এলাকাতেই একাংশের ক্ষোভের মুখে পড়ছেন তৃণমূলের যুব শীর্ষনেতা। এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ও শহরাঞ্চলে ঘুরে দেখা গেছে, ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই দলের স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে অসন্তোষ জমে উঠছে। দল পরিচালনা, সাংগঠনিক ভূমিকা বণ্টন ও জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।
সংগঠনের অন্দরে কী ঘটছে, কেনই বা মানুষের একাংশ ক্ষুব্ধ—এসব জানতে কথা হলো দলের বিভিন্ন স্তরের কর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পঞ্চায়েত স্তরের নেতা অভিযোগ করলেন,“আমরা মাঠে-ঘাটে লড়াই করি। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত আসে ওপরের দিক থেকে। স্থানীয় সমস্যাগুলো জানানো হলেও প্রবল গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সেবাশ্রয় প্রকল্পের ফাইলও বহু গ্রামে মাসের পর মাস আটকে থাকে, এগোয় না।”
আরেক যুব নেতা জানান,
“ভোটের সময় আমরা দিনরাত খেটেছি। কিন্তু সংগঠনের দায়িত্ব বণ্টনে সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছি। বিশেষ কিছু নেতাকে সামনে রেখে বাকিদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। সেবাশ্রয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তার প্রকল্প বাস্তবায়নেও আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করলেও কৃতিত্ব পায় অন্যরা।”
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দলের জেলা ইউনিটের এক সদস্য—যিনি ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত—বললেন,“ক্ষোভ বলে যেটা বলা হচ্ছে, সেটা আসলে গোষ্ঠীভিত্তিক প্রতিযোগিতা। নির্বাচনের পর এই ধরনের পরিস্থিতি প্রায়ই দেখা যায়। সংগঠনই ঠিক করে নেবে। সেবাশ্রয়-সহ সব প্রকল্পই দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য আমাদের নজরদারি আছে।”
এদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন তুললেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নাম নিতে অনীহা সকলেরই। দলের মূল কাঠামোর প্রতি আনুগত্য অটুট রেখেই তাঁরা স্থানীয় স্তরের অভিমান প্রকাশ করছেন।
ডায়মন্ড হারবার শহরের বাসিন্দা রাকেশ দাস বললেন,
“বড় নেতা ভোটের আগে-পরে আসেন ঠিকই। কিন্তু এলাকায় চিকিৎসা, রাস্তা আর পরিষেবা নিয়ে সমস্যা থেকেই যায়। এমপি সাহেবকে আমরা দেখতে পাই কম। সেবাশ্রয় প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করার জন্যও বারবার অফিসে ঘুরতে হয়।”
ফলতা ব্লকের রুনা বিবির অভিযোগ,“আমরা মহিলা ক্লাবের মাধ্যমে বেশ কিছু প্রকল্প চাই। কিন্তু অনুমোদনের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। নেতাদের বললে তাঁরা বলে, ‘উপরে পাঠানো হয়েছে।’ সেই ‘উপরে’ কে, তা আমরা জানি না। সেবাশ্রয় প্রকল্পের আবেদনও তিনবার দিতে হয়েছে।”
তবে কিছু মানুষ সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছেন। ভাঙড়ের অমল বাগ বলেন,“যুবরাজের নেতৃত্বে অনেক উন্নয়ন হয়েছে—রাস্তা, আলো, জল, সেবাশ্রয় প্রকল্পের সুবিধা অনেক পরিবার পেয়েছে। ভোটে যে বড় ব্যবধানে জয় এসেছে, সেটাই মানুষের বিশ্বাসের প্রমাণ।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিতাভ চক্রবর্তী মনে করেন,
“প্রচুর ব্যবধানে জয় মানেই গ্রাউন্ড লেভেলে সবকিছু মসৃণ—এমন নয়। বিশাল জয়ের পরে দলীয় কর্মীদের প্রত্যাশাও বাড়ে। নেতৃত্ব যদি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ না রাখে, তাহলে ক্ষোভ জমাট বাঁধা স্বাভাবিক। সেবাশ্রয়ের মতো জনমুখী প্রকল্প মানুষকে দ্রুত দেওয়া না গেলে অসন্তোষ বাড়বেই।”
তিনি আরও জানান,
“ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূলের সংগঠন মূলত কেন্দ্রীভূত। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ যত বাড়বে, তৃণমূলের ভেতরেই প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এই চাপ সামলাতে নেতৃত্বকে আরও বেশি করে নিচুতলার সঙ্গে কথা বলতে হবে—বিশেষত যেসব প্রকল্প সরাসরি মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়, যেমন সেবাশ্রয়।”
তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা কমিটির এক সদস্য এ বিষয়ে বলেন,
“দলে ভাঙন বলে কিছু নয়। গণতান্ত্রিক দলে সামান্য অভিমান থাকতেই পারে। সবাই মিলে বসে কথাবার্তা বললেই মিটে যাবে। সেবাশ্রয়-সহ সব প্রকল্প সঠিকভাবে পৌঁছোচ্ছে কি না, জেলা পর্যায়ে তার পর্যালোচনাও চলছে।”
তবে বিরোধী শিবির অন্য ব্যাখ্যা দিচ্ছে। সিপিএম সমর্থক শিক্ষক সুকুমার ভট্টাচার্যর দাবি,
“রেকর্ড ভোট মানে তৃণমূলের জোরদার দাপট, কিন্তু ওদের ভেতরে যে অসন্তোষ বাড়ছে সেটা চোখে পড়ছে। উন্নয়নের নামে প্রচার থাকলেও জনসংযোগ কমে গেছে। সেবাশ্রয় প্রকল্পের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।”
সাংগঠনিক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের পর এলাকাভিত্তিক পর্যালোচনা বৈঠক শুরুর কথা আছে। তাতে স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ জানার সুযোগ থাকবে। জেলা স্তরের তৃণমূল পরিচালন কমিটি ইতিমধ্যেই একাধিক রিপোর্ট চেয়েছে—সেবাশ্রয়-সহ বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও।
রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মতে, ভোটে জয়ের পরেই মূল চ্যালেঞ্জ শুরু হয়—জমে থাকা ক্ষোভ প্রশমিত করা, উন্নয়নের গতিবেগ বজায় রাখা এবং মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। ডায়মন্ড হারবারের পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়।
রেকর্ড ফলাফল সত্ত্বেও এই ক্ষোভ কতটা সামলাতে পারবে তৃণমূল নেতৃত্ব—এখন সেটাই দেখার।
Comments
Post a Comment