নিউইয়র্কে প্রথম মুসলিম ভারতীয় বংশভূত মেয়র নির্বাচিত
নিউ ইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভুত জোহরান মামদানি
কিশোর ভরদ্বাজ
অভিবাসীদের শহর নিউইয়র্কে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম রাজনীতিক জোহরান মামদানি। তিনি শহরের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই বিজয় শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং অভিবাসী সমাজ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
জোহরান মামদানি মূলত ভারতের তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মধু মামদানি একজন অর্থনীতিবিদ। মামদানির মা মীরা নায়ার খ্যাতনামা ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা। শৈশবে পরিবারসহ তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন এবং নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকায় বেড়ে ওঠেন। এখানকার বহুজাতিক সমাজ, শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং সামাজিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি গড়ে তোলে।
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে মামদানি সামাজিক সংগঠক হিসেবে কাজ করেন এবং বিশেষ করে অভিবাসীদের অধিকার, সাশ্রয়ী বাসস্থান, এবং গণপরিবহন সংস্কারের দাবিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২০২০ সালে তিনি নিউইয়র্ক রাজ্যের অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ করেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি অগ্রগতি ও সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী মুখে পরিণত হন।
নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে মামদানির প্রচারাভিযান ছিল একদম ভিন্নধর্মী। তার নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি শহরের আয়বৈষম্য হ্রাস, গৃহহীনতা দূরীকরণ, ন্যায্য মজুরি, পুলিশি জবাবদিহিতা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের মতো ইস্যু সামনে আনেন। তার প্রচারে অংশ নেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্বেচ্ছাসেবক, ছাত্রছাত্রী, শ্রমজীবী মানুষ এবং তরুণ অভিবাসীরা। মামদানি নিজে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, “নিউইয়র্ক এমন একটি শহর হবে, যেখানে কারও পাসপোর্ট, জাতিগত পরিচয় বা ধর্ম নয়, মানবিক মর্যাদা হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি।”
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এলাকায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। এই এলাকায় দক্ষিণ এশীয় এবং লাতিন আমেরিকান অভিবাসীদের ঘনবসতি রয়েছে। সেখানে উচ্ছ্বসিত সমর্থকরা পতাকা ওড়িয়ে, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জোহরান মামদানির বিজয় উদযাপন করেন। সামাজিক মাধ্যমে হাজারো মানুষ তার প্রতি অভিনন্দন বার্তা পাঠান এবং ‘People’s Mayor’ বা ‘জনতার মেয়র’ হিসেবে অভিহিত করেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মামদানির বিজয় নিউইয়র্কের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এতদিন শহরের মূল রাজনৈতিক শক্তি ছিল প্রথাগত ডেমোক্র্যাটিক দলের কেন্দ্রপন্থীরা, কিন্তু মামদানি প্রগতিশীল এবং তৃণমূলভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে সেই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার সাফল্য ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যেও অভিবাসী ও সংখ্যালঘু প্রার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে।
জোহরান মামদানি নির্বাচনের পর তাঁর প্রথম ভাষণে বলেন, “এই বিজয় কেবল আমার নয়, এটি নিউইয়র্কের সাধারণ মানুষের। যারা প্রতিদিন কাজ করে, ট্যাক্স দেয়, কিন্তু কখনও তাদের কণ্ঠস্বর রাজনীতিতে শোনা যায়নি—এই মেয়রশিপ তাদের জন্য।” তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন, সবার জন্য ন্যায্য শহর গড়ে তুলতে তিনি শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা বজায় রাখবেন।
জোহরান মামদানির এই ঐতিহাসিক জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয় ও মুসলিম সম্প্রদায়ের উপস্থিতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নিউইয়র্ক এখন কেবল অভিবাসীদের শহর নয়, বরং সেই অভিবাসীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক নতুন শহরের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
Comments
Post a Comment