অরুন্ধতী রায় সম্মানিত
অরুন্ধতী রায়কে ৬৫তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন
(জন্ম : ২৪ নভেম্বর, ১৯৬১)
বিশ্বসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, মানবাধিকার রক্ষায় সাহসী কণ্ঠস্বর—অরুন্ধতী রায়। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক সচেতন নাগরিক ও পরিবেশ-মানবাধিকার আন্দোলনের দৃপ্ত মুখ। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে এবং ১৯৯৮ সালে এনে দেয় ম্যান বুকার পুরস্কার।
১৯৬১ সালের ২৪ নভেম্বর মেঘালয়ের শিলংয়ে জন্ম অরুন্ধতীর। বাবা রাজীব রায় ছিলেন বাঙালি, টি-এস্টেট ম্যানেজার; মা মেরি রায় কেরালার খ্রিষ্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন শক্তিমনা নারী–অধিকারকর্মী। তাঁদের বৈবাহিক বিচ্ছেদের সময় অরুন্ধতীর বয়স মাত্র দুই বছর। এরপর মা'র সঙ্গে কেরালায় বড় হওয়া—এ পরিবেশই তাঁর মধ্যে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আপোষহীন মনোভাব তৈরি করে।
কেরালার নৈসর্গিক সৌন্দর্য, স্বাধীন পরিবেশ ও মা'র মানবাধিকার-সংগ্রাম তাঁর ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তিনি প্রথমে কেরালার ‘করপাস ক্রিস্টি’ স্কুলে পড়ালেখা শুরু করেন। পরে তামিলনাড়ুর নীলগিরির লাভডেল লরেন্স স্কুলে পড়েন। উচ্চশিক্ষার জন্য যান দিল্লির স্কুল অব প্ল্যানিং অ্যান্ড আর্কিটেকচার–এ, যেখানে আর্কিটেকচার বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
এখানেই সহপাঠী আর্কিটেক্ট জেরার্ড দা কানহা–র সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। একসময় তাঁরা আলাদা হয়ে যান।
দিল্লিতে ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আরবান অ্যাফেয়ার্স’-এ কাজ করার সময় তাঁর পরিচয় হয় চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রদীপ কৃষাণ–এর সঙ্গে। ১৯৮৪ সালে ‘ম্যাসেই সাহিব’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন অরুন্ধতী। পরে দু’জন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
দুজনের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি হয়—
• ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস (১৯৮৯) — এ চলচ্চিত্রের জন্য অরুন্ধতী পান “সেরা চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার”।
• ইলেকট্রিক মুন (১৯৯২)
তবে চলচ্চিত্র জগৎ তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। নানা কাজের পাশাপাশি তিনি লেখালেখিকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেন।
১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’—এক অর্থে তাঁর আত্মজৈবনিক উপাদানে সমৃদ্ধ উপন্যাস—মুহূর্তেই বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা পায়।
এই উপন্যাসের—
কেরালার সমাজবাস্তবতা, পরিবার ও পরিচয়ের জটিলতা, নিষিদ্ধ প্রেম, এবং ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার— সব মিলিয়ে এটি আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের এক মাইলফলক হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক প্রশংসার পাশাপাশি ভারতে সমালোচনারও মুখে পড়েন। তাঁর সাহসী যৌনতা–চিত্রণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
সাহিত্য প্রকাশের পূর্বে জীবিকার প্রয়োজনে দিল্লির একটি পাঁচ তারকা হোটেলে এরোবিক্স প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছিলেন।
সাহিত্যজীবনের পাশাপাশি অরুন্ধতী রায় ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী কণ্ঠস্বর।
১৯৯৮ সালে ভারতের পরমাণু নীতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বিশ্বমিডিয়ার আলোচনার কেন্দ্র হন। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য:
“আপনি যদি ঈশ্বরে বিশ্বাসী হন, তবে মনে রাখুন—এই বোমা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের চ্যালেঞ্জ। আর আপনি যদি নাস্তিক হন, তবে জানবেন—৪৬০ কোটি বছরের পুরোনো পৃথিবী বিকেলের মধ্যে ধ্বংস হতে পারে।”
প্রবন্ধগ্রন্থসমূহের মধ্যে—
• দ্য অ্যালজেবরা অব ইনফিনিট জাস্টিস—এর জন্য ২০০৬ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
• ২০১১ সালে অর্জন করেন নরমান মেইলার পুরস্কার।
টাইম ম্যাগাজিনের “বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকা”—তেও স্থান পেয়েছেন অরুন্ধতী রায়।
মানবাধিকার ও সামাজিক আন্দোলনে ভূমিকা
অরুন্ধতী রায়—
• পরিবেশ সংরক্ষণ,
• আদিবাসী অধিকার,
• রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার,
• যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসনের সমালোচক
এক উজ্জ্বল সক্রিয়তাবাদী।
বিশেষত ভারতের বহু নারীর কাছে তিনি প্রতিবাদের অনুপ্রেরণা।
অরুন্ধতীর কাকাতো ভাই প্রণয় রায় ভারতের অন্যতম টিভি মিডিয়া গ্রুপ NDTV–র প্রতিষ্ঠাতা।
বর্তমানে তিনি দিল্লিতে বসবাস করছেন।
সাহিত্য, সমাজ, মানবতা ও সত্য উচ্চারণে অটল এই অনন্য ব্যক্তিত্বকে ৬৫তম জন্মদিনে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
অরুন্ধতী রায়—মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিকতার পথিকৃৎ।
Comments
Post a Comment