বিপ্লবী বটু কেশ্বর কে বাঙালিরা মনে রাখেনি
ইংরেজ তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো খুঁজেছে। দিল্লির অ্যাসেম্বলিতে বোমা মারার পর ভগৎ সিংয়ের ফাঁসি হয় । তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল দ্বীপান্তরে। সেখানে অকথ্য নির্যাতন। বেতের ঘা, বুট দিয়ে বুকে পিঠে আঘাত, খেতে না-দেওয়া, ভেতর-বাইরে থেকে শরীরটা ঝাঁঝরা করে করে দিয়েছে ইংরেজ। তারপর.....?
দেশ স্বাধীন হল কিন্তু তিনি হলেন না। স্বাধীন ভারত সরকারও তাঁকে বাংলা বিহার ওড়িশার বাইরে বেরোতে মানা করে দিল। কেন, তা কেউ জানে না। এমনটা চলেছিল বেশ কয়েক মাস...
৮ই এপ্রিল, ১৯২৯
রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রীয় আইন সভাতে সেদিন পাবলিক সেফটি বিল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। হঠাৎই দর্শক গ্যালারি থেকে উড়ে এলো দুটো দেশি বোমা। বিকট শব্দে ফাটলো ট্রেজারি বেঞ্চের সামনে। ধোঁয়া সরে যেতে দেখা গেল দুই যুবক কিছু প্যামফ্লেট ছুড়ে দিচ্ছে নীচে, মুখে স্লোগান.... ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
ইতিহাস সাক্ষী সেদিন কেউ জখম না হলেও তাদের আওয়াজ কাঁপিয়ে দিয়েছিল বৃটিশ শাসনের ভিত। না, পালানোর কোন চেষ্টাই করেননি সেদিনের ঘটনার দুই নায়ক ভগত সিংহ ও বটুকেশ্বর দত্ত। ধরা দিলেন তাঁরা।
পিছিয়ে যাই আরো একটা বছর। সাল ১৯২৮, সাইমন কমিশন নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ তখন তুঙ্গে। এই কমিশনের বিরুদ্ধে ১৭ই ডিসেম্বর লাহোরে বের হলো এক প্রতিবাদ মিছিল। পুলিশ সুপার জেমস স্কটের আদেশে মিছিলে নৃশংস ভাবে লাঠিচার্জ করলো পুলিশ। আহত হয়ে দুদিন পর প্রাণ দিলেন পাঞ্জাবের জনপ্রিয় নেতা লালা লাজপত রায়। ভগৎ সিংহ ও তাঁর দল HSRA শপথ নিলেন বাঁচতে দেয়া হবেনা স্কটকে। এক সপ্তাহ পরেই অফিস থেকে বেরুনোর মুখে ভগত, রাজগুরু, শুকদেব ও আজাদ গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিলেন স্কটের পরিবর্তে ডেপুটি সুপার জন সন্ডার্স কে। ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো পুলিশ খুঁজতে লাগলো তাদের। গোপনে পাঞ্জাব ছাড়লেন সবাই।
বর্ধমানের খন্ডঘোষের ওয়াড়ি গ্রামে জন্ম বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্তের। রেলে চাকরি সূত্রে, বাবা গোষ্ঠবিহারী দত্ত কানপুরে বাস করায় তাঁর বাল্যশিক্ষা সেখানেই। কানপুরেই গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ‘প্রতাপ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে দুজনের সহযোদ্ধা হয়ে ওঠা।
সন্ডার্স হত্যার পর বিপ্লবী ভগৎ সিংকে সঙ্গে নিয়ে খণ্ডঘোষের ওঁয়াড়ি গ্রামে লুকিয়ে ছিলেন বটুকেশ্বর। তাঁদের খোঁজে ব্রিটিশ পুলিশ তখন দেশ জুড়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। কানপুরের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সন্ধান না-পেয়ে পুলিশ হানা দেয় ওয়ারি গ্রামে বটুকেশ্বরের বাড়িতে। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বটুকেশ্বর তৈরি করলেন একটি সুড়ঙ্গ। নিজের বাড়ির ভিতর তৈরি হওয়া সেই সুড়ঙ্গ জুড়ে গেল লাগোয়া নগেন্দ্রনাথ ঘোষের বাড়ির সঙ্গে। ইংরেজ পুলিশ বটুকেশ্বরের বাড়ি ঘিরে ফেললে ভগৎ সিংকে নিয়ে তিনি আশ্রয় নিলেন সেই সুড়ঙ্গে। প্রায় ১৮ দিন সেই চোরাকুঠুরিতে কাটিয়েছিলেন দু'জন।
নগেন্দ্রনাথের বাড়ি থেকে রাতের অন্ধকারে আসত খাবার, জল। এ ভাবে থাকার পর প্রতিবেশী এক পিসিমার সহযোগিতায় মহিলার ছদ্মবেশে এলাকা ছাড়েন বটুকেশ্বর ও ভগৎ সিং। সাড়ে ন'কিলোমিটার পথ হেঁটে বোঁয়াইচন্ডী স্টেশনে এসে ভোরের ট্রেনে এলাকা ছাড়েন দুই বিপ্লবী। এরপরেই দিল্লি সংসদে বোমা নিক্ষেপ।
১৯২৯ সালের জুন মাস থেকে নিয়মিত বিচার শুরু হয় ভগৎ, বটুকেশ্বর ও তাদের সঙ্গীদের বিরুদ্ধে।
এবার ফাঁস হয়ে গেল সন্ডার্স হত্যার কথা। বিচারের প্রহসনের পর ১৯৩১-এর ২৩শে মার্চ ফাঁসি হয়ে গেল ভগত সিং, শুকদেব ও রাজগুরু'র। যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়ে আন্দামানে চালান হলেন বটুকেশ্বর। ১৯৪১-এ মুক্তি পেয়ে ফের ’৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। আবার কারাবাস। মুক্তি পান স্বাধীনতার পর।
২০শে জুলাই, ১৯৬৫
দিল্লিতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বটুকেশ্বর। শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী অস্থি বিসর্জন দেয়া হয়েছিল ফিরোজপুর জেলার হুসেইনিওয়ালায়, চৌত্রিশ বছর আগে যেখানে একদিন রাতের অন্ধকারে শতদ্রু নদীতীরে গোপনে অন্তিম সংস্কার করা হয়েছিল তাঁর সহযোদ্ধা ভগৎ সিং, রাজগুরু ও শুকদেবের।
আজ সেই সুড়ঙ্গ প্রায় বুজে এসেছে। নগেন্দ্রনাথের বাড়ির হালও অত্যন্ত করুণ, ভেঙেছে কড়িকাঠ। সেখানে শুধুই আজ অবহেলার দীর্ঘশ্বাস! জন্মভূমিতেই বটুকেশ্বর আজ অবহেলিত, কেউ মনে রাখেনি....... কেউ মনে রাখেও না!
তিনি ভগৎ সিংহের সহযোদ্ধা। বঙ্গসন্তান বটুকেশ্বর দত্ত, ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক 'আনসাং হিরো' ! জন্মদিনে আজ লহ প্রণাম..
সংকলনে: স্বপন সেন
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
© এক যে ছিলো নেতা
Comments
Post a Comment