বিপিন চন্দ্র পালের জন্ম দিবস পালন শিলচর

*বিপিনচন্দ্র পালের ১৬৮ তম জন্মদিবস পালন শিলচরে*
*পুরনিগমে "কামিনী কুমার চন্দ ভবন" সাইনবোর্ড লাগানোর আহ্বান*    

      শুক্রবার ৭ নভেম্বর স্বাধীনতা সংগ্রামী বাগ্মীশ্রেষ্ঠ বিপিনচন্দ্র পালের ১৬৮ তম জন্মদিবস উপলক্ষে "শিলচর প্রতিমূর্তি সংরক্ষণ কমিটি"-র পক্ষ থেকে সদরঘাটে পৌর নিগমের সামনে স্থাপিত বিপিনচন্দ্র পালের আবক্ষ প্রতিমূর্তির পাদদেশে এক শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্কুলপড়ুয়া কচিকাঁচা সহ শহরের বিশিষ্টজনেরা জমায়েত হয়ে এই দেশবরেণ্য নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।    
     অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে প্রতিমূর্তি সংরক্ষণ কমিটির সম্পাদক প্রবীর রায় চৌধুরী  মূর্তি প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বিপিনচন্দ্র পাল প্রতিমূর্তি হয়ে যে রাস্তাটি মধুরাঘাট পর্যন্ত গেছে সেই রাস্তাটির নামকরণ " বিপিনচন্দ্র পাল রোড" করা হলেও কেউই এই নামটি ব্যবহার না করায় আক্ষেপ ব্যক্ত করেন।
     প্রাসঙ্গিক বক্তব্যে  হাইলাকান্দি এসএস কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ পরিতোষ চন্দ্র দত্ত স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপিনচন্দ্র পালের আপসহীন অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন। বিশিষ্ট সমাজসেবী আশু পাল তাঁর বক্তব্যে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিপিনচন্দ্র পাল সম্পর্কে রচনা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করেন।  ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই মহান সংগ্রামীর জীবন ও সংগ্রামী আদর্শের বার্তা পৌঁছে দিতে তিনি সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন।সাময়িক প্রসঙ্গ পত্রিকার সম্পাদক তৈমুর রাজা চৌধুরী তার বক্তব্যে এই দেশবরেণ্য নেতার ত্যাগ ও আদর্শের কথা স্মরণ করে আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রাক্তন পৌর কমিশনার তথা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্মৃতি রক্ষা কমিটির সম্পাদক সাধন পুরকায়স্থ জানান,মহান এই দেশনেতার জন্মস্থান বর্তমান বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার পৈল গ্রামে একটি পাঠাগার তৈরি হয়েছে । বাংলাদেশ সরকার তাঁর পৈতৃক বাড়িটি সংরক্ষণ করেছে। তিনি বলেন,অখন্ড ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপিনচন্দ্র পাল বাগ্মীশ্রেষ্ঠ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি "বন্দেমাতরম" সহ বিভিন্ন সংবাদপত্র  সম্পাদনা করেন। বিভিন্ন সময়ে ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক,বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের নেতা এবং সম্পূর্ণ স্বরাজের  অগ্নিবর্ষী প্রবক্তা হিসেবে তিনি আমাদের শহর শিলচরে পপদার্পণ করেছেন। শ্রীপুরকায়স্থ প্রসঙ্গক্রমে এখানকার স্বাধীনতা সংগ্রামী শিলচর পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান কামিনী কুমার চন্দের কথা উল্লেখ করেন। শিলচর পৌরসভা পৌর নিগমে উন্নীত হয়েছে। ভবনের ফলকে কামিনী কুমার চন্দের নাম থাকলেও নিগমের বাইরে "কামিনী কুমার চন্দ ভবন" বলে কোনও সাইনবোর্ড টাঙানো হয়নি । এ ব্যাপারে তিনি পৌরনিগমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পৌরনিগমের পক্ষ থেকে সদরঘাটের নতুন সেতুর নিচের খালি জায়গায় ফুটপাত ব্যবসায়ীদের বসার সুযোগ করে দেওয়ায় পৌরনিগম কর্তৃপক্ষকে তিনি ধন্যবাদ জানান। সেই সঙ্গে পুরাতন ব্রিজের নিচে যে খালি জায়গা আছে সেই জায়গায় ফুটপাত ব্যবসায়ীদের বসানোর দাবিও জানান । তিনি তার বক্তব্যে আরও বলেন শ্রীহট্টের ইতিহাস,ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য শ্রীহট্টের মূল ভূখণ্ড থেকে যারা তখন কলকাতায় শিক্ষা-দীক্ষা ও নানা কাজে থাকতেন তাদের থাকার সুবিধার জন্য বিপিনচন্দ্র পাল সুন্দরী মোহন দাস ও তারা কিশোর রায় চৌধুরীকে নিয়ে কলকাতায় শ্রীহট্ট সম্মেলনী নামে সংগঠনের জন্ম দিয়েছিলেন। আজ ভারতবর্ষের তথা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় সিলেটিদের ভাষা সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে সংগঠন গড়ে উঠেছে ,কিন্তু তার গোড়াপত্তন করেছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল ও তার সহযোগীরা।
        বিশিষ্ট গবেষক প্রাক্তন প্রকৌশলী শ্রী নীহার রঞ্জন পাল তার বক্তব্যে বিপিনচন্দ্র পালের জীবন ও আদর্শের নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন,বিংশ শতকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামকে মুখ্যত তিন অধ্যায়ে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম অধ্যায় লাল-বাল-পালের আপসহীন প্রচেষ্টার গণচেতনার যুগ। দ্বিতীয় অধ্যায় গান্ধীজির নেতৃত্বে গণ জাগরণের যুগ। তৃতীয় ও শেষ অধ্যায় হল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের যুগ।
স্বাধীনতার গণচেতনার পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল,লালা লাজপত রায় ও বালগঙ্গাধর তিলক। বিপিনচন্দ্র পালের জ্বালাময়ী ভাষণে সমগ্র ভারত এক সময় উদ্বেল হয়ে ওঠেছিল। ইতিহাসে তাঁকে "Father of Revolutionary Thoughts in India" বলে অভিহিত করা হয়েছে। চিদম্বরণ পিল্লাই তাঁকে "স্বাধীনতার সিংহ " বলে উল্লেখ করেছেন।
    প্রতিমূর্তি সংরক্ষণ  সমিতির কার্যকরী সভাপতি 
শামল কান্তি দেব তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এই আপসহীন স্বাধীনতা সংগ্রামীর সাহিত্য প্রতিভার কথা তুলে ধরে জানান, বিপিনচন্দ্র পাল বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় দক্ষ হস্ত ছিলেন। তাঁর লেখা প্রথম বাংলা উপন্যাসের নাম "শোভনা"। এছাড়াও বাংলা ভাষায় লেখা তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ হল "ভারত সীমান্তে রুশ", "মহারাণী ভিক্টোরিয়ার জীবনী", " ছেলের খাতা", "নবযুগের বাংলা","সত্তর বছর"(আত্মস্মৃতি)," "চরিত্র চিত্র" এবং "সাহিত্য ও সাধনা"।
    স্বাধীনতা আন্দোলনে যে সঙ্গীত বা মন্ত্রে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা উজ্জীবিত হতেন  সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সেই "বন্দেমাতরম"- এর ১৫০ বছর পূর্তিকে স্মরণ করে উপস্থিত সকলের সমবেত কণ্ঠে সেই সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে।
      অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন  অধ্যাপক অজয় রায়,পীযূষ চক্রবর্তী, শৈবাল গুপ্ত,সুগত পাল,সুনীল দাস ও বেশ কিছু স্কুল পড়ুয়া। পৌরনিগম এর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সৌরভ দেব ,তোফজ্জুল হোসেন খান। সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রবীর রায়চৌধুরী।

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর