সিরাজউদ্দৌলা কে নিয়ে গর্ব করার কিছু আছে কি?
(সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে যারা গর্ব করেন তাদেরকে অনুরোধ -- প্লিজ, একটু ধৈর্য ধরে পড়ুন । ভ্রম কেটে যাবে।
আমরা অনেকেই সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে গর্ববোধ করে থাকি। আর করবোই বা না কেন ! স্কুলের ইতিহাস বইয়ে যা পড়েছি শিশু মনে তা তো বিশ্বাস করতেই হবে! স্কুলের ইতিহাস বইয়ে কুতুবউদ্দিন থেকে আলাউদ্দিন খলজি এমনকি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসকারী বক্তিয়ার খিলজি সহ বিভিন্ন প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসকারী আওরঙ্গজেবকে যেভাবে মহান ও হিরো বানানোর চেষ্টা স্কুলের ইতিহাস বইয়ে দেখা যায় তাতে সিরাজউদ্দৌলা কে মহান দেখানো হবে এতে আর আশ্চর্য কি !!!
তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক কালের কিছু পুস্তকে সিরাজের ব্যাপারে কি বলা হয়েছে সেটা জানলে আমাদের ভ্রম কাটতে বাধ্য।
স্কুলের ইতিহাস বইয়ে সিরাজকে একজন প্রজাহিতৈষী শাসক , মহান দেশপ্রেমিক এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাকে হিরো হিসেবে দেখানো হয়েছে ,,, লম্পট দুশ্চরিত্র অত্যাচারী সিরাজকে দেখানো হলো একজন প্রজাবৎসল শাসক রূপে !!
আসলে সিরাজ কেমন ছিলো সে ব্যাপারে সরাসরি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের একটা উদ্ধৃতিই তুলে দেওয়া যাক নবাব সিরাজদৌলা সম্পর্কে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন> ‘'"সিরাজ উদ্দৌলা, সিংহাসনে অধিরূঢ় হইয়া, মাতামহের পুরাতন কৰ্ম্মচারী ও সেনাপতিদিগকে পদচ্যুত করিলেন। কুপ্রবৃত্তির উত্তেজক কতিপয় অল্পবয়স্ক দুষ্ক্রিয়াসক্ত ব্যক্তি তাঁহার প্ৰিয়পাত্র ও বিশ্বাসভাজন হইয়া উঠিল। তাহারা, প্ৰতিদিন, তাঁহাকে কেবল অন্যায্য ও নিষ্ঠুর ব্যাপারের অনুষ্ঠানে পরামর্শ দিতে লাগিল। ঐ সকল পরামর্শের এই ফল দর্শিয়াছিল যে, তৎকালে, প্ৰায় কোনও ব্যক্তির সম্পত্তি বা কোনও স্ত্রীলোকের সতীত্ব রক্ষা পায় নাই""।
--( বাঙ্গালার ইতিহাস, প্রথম অধ্যায়, শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর) ।
সিরাজের সমকালীন ঐতিহাসিক গোলাম হোসেনের ( ইনি সিরাজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সৈকত জঙয়ের গৃহশিক্ষক ছিলেন ) লেখা পুস্তক " সায়র- উল- মুতাক্ষরিণ" এ সিরিজের নিষ্ঠুরতা,অর্থলোভ, নারী পিপাসু তথা লাম্ফট্যের বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়।
পলাশীর যুদ্ধ কাব্যে নবীনচন্দ্র বা স্যামুয়েল চার্লস তার "Bengal in 1756-1757'' তে সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে কিভাবে সিরাজের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। ইচ্ছা থাকলে যে কেউ এগুলো পড়ে দেখতে পারেন।
পলাশীর যুদ্ধ কাব্যের প্রথম সর্গে নবীনচন্দ্র স্পষ্ট লিখেছেন ----
"" যবনের অত্যাচার করি দরশন,
বিমল হৃদয় পাছে হয় কলুষিত,
ভয়েতে নক্ষত্র-মালা লুকায়ে বদন,
নীরবে ভাবিছে মেঘে হয়ে আচ্ছাদিত""।
সিরাজের প্রথম সন্তান জন্মিয়েছিল তার বিবাহের আগেই !! সিরাজের সেনাপতি মোহনলালের বোন 'মাধবীর'(হীরা) সাথে সিরাজ জোরপূর্বক অবৈধ সম্পর্ক বানায়। এবং এর ফলে মাধবী গর্ভবতী হয়ে যায় এবং পুত্র সন্তান জন্ম দেয় । উৎপন্ন ছেলের দায়িত্ব নেওয়ার জন্যে অবিবাহিতা তথা কুমারী মা মাধবী সিরাজকে জোর করলে সিরাজ একটা ঘোড়ার পিঠে বাচ্চাটাকে বেঁধে ছেড়ে দিয়ে ঘোড়াকে তাড়িয়ে দিয়ে মজা দেখতে থাকে এবং অপেক্ষা করতে থাকে কখন বাচ্চাটা মারা যায় ! তখন মাধবী দৌড়ে গিয়ে মোহনলালকে অনুরোধ করে এবং মোহনলাল গিয়ে ঘোড়াকে থামিয়ে সেই বাচ্চাকে উদ্ধার করে। বিবাদ বেশিদূর গড়ানোর আগেই আলীবর্দী খবর পেয়ে সিরাজের সাথে মাধবীর বিয়ে দেয়। অবশ্যই মাধবীকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার পর।
(Source - সিরাজের পুত্র ও বংশধরদের সন্ধানে- অমলেন্দু দে) ।
বাঙালী বিদ্বেষের পরিচয় ::-
সিরাজের সাথে বৃটিশদের আলীনগরের যুদ্ধে (পলাশী যুদ্ধের পূর্বে) বৃটিশদের পরাজয়ের পর সিরাজের সৈন্য কলকাতার বাঙ্গালীদের এলাকায় ঢুকে পড়ে ও প্রবল লুটপাট ও হত্যাকাণ্ড ঘটায়। সেখানে ব্রিটিশদের বাঙ্গালী কর্মচারীদের উপর সাঙ্ঘাতিক অত্যাচারও করে। কলকাতার যাবতীয় অট্টালিকাও সিরাজের সৈন্যরা গুঁড়িয়ে দিয়েছিলো সিরাজের নির্দেশ মতো !! রেহাই পায়নি ইংরেজদের হতভাগ্য বাঙালি কর্মচারীদের বাসগৃহগুলোও।
(Source - মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্ররায়ের জীবনচরিত। পৃষ্ঠা - ৭৩-৭৪) ।
সর্বশেষে সিরাজের সমকালীন মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজারে অবস্থিত ফরাসি কুটিরের অধ্যক্ষ্য " মঁসিয়ে জাঁ লাঁ " সিরাজ সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছিলন --
" সিরাজ চরিত্র সর্বকালের এক নিষ্ঠুর চরিত্র। বাস্তবিক সবরকমের ব্যাভিচারে তিনি নিজেকে লিপ্ত করেছিলেন। ভয়ানক নিষ্ঠুরতা তার জীবনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। গঙ্গায় স্নানরত হিন্দু মেয়েদের প্রতি সিরাজের ললুপ দৃষ্টি এবং তাদের মধ্যে যারা সুন্দরী, সিরাজের হাত থেকে তাদের রেহাই ছিল না । সুন্দরী মেয়েদের প্রতি সিরাজের আগ্রহ দেখে এবং সিরাজের নির্দেশে তার চাটুকারেরা পানসি নৌকা নিয়ে গঙ্গায় বিচরণ করতো এবং স্নানরত সুন্দরী মেয়েদের ধরে নিয়ে সিরাজকে উপহার দিয়ে নিজেদের কাজ হাসিল করতো বা উপঢৌকন লাভ করতো ।
এইসব ঘটনার আরও প্রমাণ পাওয়া যায় --
উনিশ শতকের বাঙালি লেখক ভোলানাথ চন্দ্র এবং অক্ষয় কুমার মৈত্র মহাশয়ের লেখায় । গঙ্গা স্নানরত সুন্দরী মেয়েদের প্রতি সিরাজের কামললুপ দৃষ্টি এবং তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে নিজের কামবাসনা পুরনের কথা উল্লেখ করেছেন ইনারা । অক্ষয়কুমার মৈত্রের লেখা পুস্তক " রাণী ভবানীতে পাওয়া যায় সিরাজের দৃষ্টি রাণী ভবানীর আত্মীয়া ( সম্ভবত তাঁর বিধবা কন্যা) তারাসুন্দরী দেবীর উপর পড়লে কিভাবে সিরাজ তার দলবল দিয়ে তারাসুন্দরীকে খুঁজতে গিয়ে সাধুসন্তের আশ্রম তছনছ করেছিল এবং সাধুসন্তদের মেরেছিল। কারণ তারাসুন্দরীকে সিরাজের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সাধুসন্তরা তাকে আশ্রমে লুকিয়ে রেখেছিল। যাইহোক, তারাসুন্দরীকে সাধুসন্তরা গার্ড করে বাঁচাতে সক্ষম হলেও পরবর্তীতে সিরাজের আক্রোশ বিভিন্ন জায়গায় সাধুসন্তেদের উপর পড়তে শুরু করে এবং হিন্দু নারীদের দুরবস্থা আরও বাড়তে থাকে। রানী ভবানী শেষ পর্যন্ত তারাসুন্দরীকে লুকিয়ে যশোরে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু সেখানেও সিরাজের নজর যায় "।
জাঁ লাঁ আরও উল্লেখ করেন --বর্ষার সময় গঙ্গার জল যখন দুকূল ছাপিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করতো তখন নৌকাই অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে যেতো। সিরিজের নজরে পড়লে সিরাজের নির্দেশে যাত্রী ভর্তি নৌকা উল্টে দেওয়া হতো। এতে সিরাজ আনন্দ উপভোগ করতো। সাঁতার না জানা শিশু, নারী অনেকেই মারা যেতো।
ফরাসি লেখক মঁসিয়ে জাঁ লাঁ -র অনুরূপ মন্তব্য করেন বিখ্যাত ঐতিহাসিক আচার্য ডক্টর যদুনাথ সরকারও।
ফলে সিরাজের এইধরনের কুকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে তৎকালীন সময়ের প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার, স্থানীয় রাজা,, ব্যবসায়ী ( জগত শেঠ, রায়দুর্লভ, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র.....) সিরাজকে সরানোর জন্য পরিকল্পনা করেন এবং এবং ভিতরে ভিতরে মির জাফরকে রাজি করান। পরবর্তী ইতিহাস আমরা সবাই জানি।
আমরা ইতিহাস বইয়ে জগত শেঠ, রায়দুর্লভ, মির জাফরকে বিশ্বাস ঘাতক হিসেবেই পড়েছি। কিন্তু সিরাজের চরিত্রের এইসব সুমহান দিকগুলি আমরা অনেকেই জানি না বা আমাদের জানতে দেওয়া হয় নি।
তাই বলি পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের বিদায় ও ইংরেজদের আগমনে বাঙলা পরাধীন হয়নি। আমরা আগে থেকেই পরাধীনই ছিলাম। সিরাজের পরাজয়ের পর আমাদের প্রভু বদল হয়েছিল মাত্র। মধ্য এশীয় বর্বর প্রভুদের হাত থেকে ব্রিটিশ প্রভুদের হাতে‚ এক আব্রাহামিক প্রভুদের হাত থেকে অন্য আব্রাহামিক প্রভুদের হাতে বাঙ্গালীর হস্তান্তর হয়েছিল মাত্র। যার এক তৃতীয়াংশের স্বাধীনতা এসেছে ১৯৪৭ সালে। বাকি দুই তৃতীয়াংশ এখনো প্রাক-ব্রিটিশ প্রভুদের ( মুঘলদের)হাতেই থেকে গেছে।
[ এই পোস্টের তথ্যগুলি বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত, তবে ভেরিফাইড ]।
[[এই লেখা প্রথমে 2019 এর নভেম্বরে আমার ব্যক্তিগত আইডিতে প্রথম পোস্ট করি, তারপর আমার ব্যক্তিগত আইডিতে এবং কিছু গ্রুপে বেশ কয়েকবার পোস্ট করি, ,,শেষে আজ কিছুটা পরিবর্তন করে পুনরায় পোস্ট করকরলাম ]]
Comments
Post a Comment