দুর্গাপুজো বাইরে চাকচিক্য ভেতরে ফাঁকা বাঙালিরা অতলে তলিয়ে যাচ্ছে
দুর্গাপূজা: বহিরঙ্গের চাকচিক্যে অন্তরের ভক্তি ভাব যেন ম্লান না হয়
প্রদীপ দত্ত রায়
বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা। এককালে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে যে উৎসাহ উদ্দীপনা তা অনেকটাই বর্তমান সময়ে ফিকে হয়ে এসেছে। প্রাচীনকালে দূর্গা মায়ের আরাধনায় সাত্ত্বিক ভাবনা বজায় রাখা হতো। আগেকার দিনে বিদেশে যারা চাকরি-বাকরি করতেন তারা পুজোর কদিন ছুটিতে বাড়ি ফিরে আসতেন। গ্রাম বা সেই নির্দিষ্ট শহরে নিজেদের আত্মীয় পরিজন ছাড়া পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে পূজার আনন্দটা পুরোপুরি উপভোগ করতেন । মহিলাদের মধ্যে এই পুজোর সময় তৎপরতাটা থাকতো অন্যরকম। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত নানা আচার অনুষ্ঠান পালন করার জন্য তাদের কাজের শেষ ছিল না। এবং এর সঙ্গে দুর্গা মায়ের আরাধনার জন্য তাদের স্নেহপরায়ন মনে অন্যরকম ভাবাবেগ থাকতো। দুর্গা মায়ের আগমন ছিল ঘরের মেয়ে উমার বাপের বাড়িতে আসার মত আনন্দের। আত্মীয় পরিজন বাড়িতে বেড়াতে এলে যেমন আনন্দ হয় তেমনি আনন্দে কাটতো দুর্গাপূজার দিনগুলি। প্রায় সব পূজা মন্ডপে শাস্ত্র মতে সাত্বিক উপায়ে এ পূজার আয়োজন করা হতো। ভক্তিতে অবিচল থাকতো মানুষ। দেবীর আশীর্বাদ লাভ জীবনের পাথেয় ভোগ করে তোলার জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতো সবাই। পূজা মণ্ডপগুলিতে উশৃংখলতার কোনো স্থান ছিল না। এই প্রজন্ম যথেষ্ট শিষ্টাচারি ছিল। উৎসবে নানাভাবে যুক্ত থাকতেন গ্রামের প্রতিটি পেশার প্রতিটি শ্রেণির মানুষ । উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হত আবাল বৃদ্ধ বণিতা। মন্ডপ সাজিয়ে তোলা হত প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে। কলাগাছ, আমপাতা ইত্যাদি মণ্ডপগুলিতে শোভা পেত। কখনো রঙিন কাগজের ঝালোট টাঙিয়ে মন্দিরের চারপাশে সৌন্দর্য আনা হতো। মন্ডপ শয্যায় তখন ছিল না কোনো অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা। তখনকার আমলে কেবল বাড়ির পুজোয় নয় বারোয়ারী পুজোগুলোতেও একই দৃশ্য বিরাজমান ছিল। পুজোর দিনগুলিতে আনন্দ উপভোগ করার মেজাজটা ছিল অকৃত্রিম। হৃদয় থেকে মানুষ একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা করত। দশমীতে মূর্তি বিসর্জনের পর মন্ডপে ফিরে এসে নারায়ণ পূজায় শান্তি জল গ্রহণ করে একে অপরকে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করত। বিজয়া দশমীর এই শুভেচ্ছা বিনিময় সপ্তাহ জুড়েই চলত। সে দিনগুলো যেন এখন স্বপ্নের মত অতীতের ইতিহাস হয়ে থেকে গেছে। আগের জমানায় ষষ্ঠীর সন্ধ্যা থেকে দশমীর বিসর্জন পর্যন্ত পূজা মন্ডপে সারাক্ষণ যে জমজমাট অবস্থা দেখা যেত তাও এখন ক্রমান্বয়ে কমে এসেছে। পুজোকে কেন্দ্র করে নতুন কাপড়চোপড় কেনা আগেও ছিল এখনো আছে তবে অবস্থার পরিবর্তনে এর রূপ বদল হয়ে গেছে। এখন আর এলাকার দোকান থেকে নয় অনলাইনে বহুজাতিক সংস্থা থেকে বস্ত্র কেনার চল শুরু হয়ে গেছে। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
Comments
Post a Comment