তাসলিমা নাসরিন কেমন করে দেখেছেন আমাদের জুবিন কে

আসামের ১৫ লক্ষ মানুষ জুবিন গর্গের কফিনের সঙ্গে কাঁদতে কাঁদতে, চোখের জল মুছতে মুছতে  হেঁটেছে গৌহাটির রাস্তায়। সব শিল্পীই হয়তো এমন ভালবাসা পাওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সবার স্বপ্ন সফল হয় না, হয়তো লাখে একজনের জোটে এমন  সম্মান। জুবিন  কোনও রাজনৈতিক দলের সমর্থক ছিলেন না।  নিজেকে বলতেন সোশ্যাল লেফটিস্ট।  রাজনৈতিক বামপন্থী নন, সামাজিক বামপন্থী।  বন্যার্তদের জন্য সাহায্য করতেন। গরিব দুঃখীদের সাহায্য করতেন। ১৫টি শিশুকে লালন পালন করতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন।  শক্তিশালী-প্রভাবশালী কারও সঙ্গে আপোস করতেন না।  যশ খ্যাতির শীর্ষে  অবস্থান করেও  সাধারণ জীবন যাপন করতেন। রাস্তার দোকান থেকে খাবার কিনে  আর সবার মতো বেঞ্চে বসে খেতেন। প্রকাশ্যেই বলতেন তিনি মদ্যপান করেন, বলতেন  তাঁর শ্রেষ্ঠ গানগুলো গেয়েছেন মাতাল অবস্থায়। তিনি বাঙালি শিল্পীদের মতো ভদ্রলোক সাজার চেষ্টা করেননি। অহংকার করেননি। গা ভর্তি  টাট্টু করেছেন। আলিশান কোনও প্রাসাদ তাঁর ছিল না। সাধারণ মধ্যবিত্তর মতো ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকতেন। বোম্বেতেও  তাঁর ছিল একখানা ফ্ল্যাট, যেখানে কাজের  জন্য যেতে হতো।    কিন্তু বোম্বেয় বাস করতে তাঁর ভাল লাগতো না। আসাম ছিল তাঁর সত্যিকার ঘরবাড়ি। আসাম ছিল তাঁর প্রাণ।  এমন নির্লোভ উদার মানবিক মানুষটিকে আসামের  মানুষ ভালবাসবে না কেন? ব্রাহ্মণ হয়েও তিনি পৈতে খুলে ফেলেছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন তাঁর কোনও জাত নেই, ধর্ম নেই, ভগবান নেই, রাজনৈতিক দল নেই। সেকারণেই সম্ভবত, সব ধর্মের, সব জাতের, সব দলের লোক তাঁর মৃত্যুতে চোখের জল ফেলেছে, হাহাকার করেছে, শোক করেছে। 

 জুবিনের মৃত্যু,  আমি মনে করি,  হয়েছে তাঁর সঙ্গীসাথীদের  অবহেলার কারণে। তাঁর কিন্তু কোনও সিজার হয়নি, চোখে অন্ধকার দেখেননি;   মদ্যপানও করেননি স্কুবা ডাইভিংএর আগে বা জলে নামার আগে। তিনি লাইফ জ্যাকেট খুলে ফেলেছিলেন, কারণ জ্যাকেটটি সাইজে বড় ছিল বলে তাঁর সাঁতরাতে অসুবিধে হচ্ছিল। উচিত ছিল তাঁকে তাঁর শরীরের মাপে  একখানা জ্যাকেট দেওয়া। উচিত ছিল তিনি যে ডুবে যাচ্ছিলেন তা লক্ষ্য করা, এবং তাঁকে দ্রুত  ইয়টে ফিরিয়ে আনা। ফিরিয়ে আনলো বটে সঙ্গীসাথীরা, তবে জলের ভেতর তাঁর মৃত্যু হওয়ার পর। 

একবার যদি জুবিন দেখতে পেতেন গৌহাটির দীর্ঘ শোকযাত্রা, যদি দেখতে পেতেন মানুষ তাঁকে কত ভালবাসে, হয়তো মরেও শান্তি হতো তাঁর। মানুষ তো যাবেই একদিন না একদিন। কেউ ক’বছর আগে, কেউ ক’কবছর পরে। এক জীবনে এমন সফল হন  আর  ক’জন শিল্পী ! জুবিনের জীবন অভাবনীয় রকম সার্থক ছিল, কারণ তিনি বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছিলেন বলে নয়, কারণ তিনি  অগুনতি মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা পেয়েছিলেন। 

জুবিনের জন্ম যদি আসামের ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিবারে না হয়ে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিবারে হতো ! তিনি যদি তাঁর জাত ধর্মকে ছুঁড়ে ফেলতেন, তাহলে বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে কি তাঁর গানের জন্য এইভাবে সম্মান করতো, যেভাবে আসামের লোকেরা করেছে? এই প্রশ্নটি রেখে গেলাম। By Taslima Nasrin

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর