নেতাজি সুভাষ বনাম অভেদা নন্দ জি স্মরনীয় স্মৃতিকথা
🙏🙏🙏🌹🌼🌹।।'সুভাষ! এসো, তোমায় আলিঙ্গন করি'।
একথাগুলো স্বামী অভেদানন্দজী বলেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে। সেই ১৯৩৮ সালের ১৫ই আগস্টের কথা।
🙏🌼🌹।।শ্রীরামকৃষ্ণের প্রায় সব লীলাপার্ষদরা তখন ইহধাম ত্যাগ করেছেন। শুধু স্বামী অভেদানন্দজী বেঁচে আছেন এবং কলকাতায় রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠে অবস্থান করছেন। তিনি তখন এই মঠের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ।
আবার সে সময় দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসুও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি। উভয়ই ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্থান করলেও, দুজনেই ছিলেন শীর্ষপদে আসীন। একজন ছিলেন আধ্যাত্মিক জগতের দিশারী, আরেকজন রাজনৈতিক জগতের বরেণ্য দেশসেবক। কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল এক -- মানবকল্যাণ।
“বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়”-- এই মন্ত্রে উভয়ের জীবন উৎসর্গীকৃত। তাই তাঁদের মিলন ছিল অবধারিত।
স্বামী অভেদানন্দজি তখন অসুস্থ। চিকিৎসকের কড়া নির্দেশ -- সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামা চলবে না। তাই তিনি আশ্রমের দোতলার ঘরেই বিশ্রাম করেন। একদিন তিনি সেবক সন্ন্যাসীকে বললেন :
"দেখ, দেশগৌরব সুভাষচন্দ্র বসুকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। খবরটা পৌঁছে দিতে পারো?"
খবরটি সুভাষচন্দ্রের কাছে যেতেই তিনি জানালেন -- তিনি অবশ্যই আসবেন, মহারাজকে দর্শন করতে ও আশীর্বাদ নিতে।
এ সংবাদ শুনে অভেদানন্দজি আনন্দে আত্মহারা হলেন। প্রতিক্ষণ তাঁর মন অপেক্ষা করতে লাগল প্রিয় দেশসেবকের জন্য।
অবশেষে ১৯৩৮ সালের ১৫ই আগস্ট, রাত প্রায় আটটার সময় ধুতি-পাঞ্জাবিপরা এক ভদ্রলোক মঠে প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখেই অভেদানন্দজি আবেগভরে বলে উঠলেন :
"সুভাষ! এসো, তোমাকে আলিঙ্গন করি।"
কীভাবে চিনলেন, আগে কখনো দেখা না হওয়া সত্ত্বেও, তা এক রহস্য। তবে মুহূর্তটা ছিল অলৌকিক। দুই মহামানবের মিলন যেন স্বর্গীয় দৃশ্য -- প্রত্যক্ষদর্শীরা আজও স্মৃতিতে তা ধরে রেখেছেন। দুজনের নয়নযুগল থেকে স্নেহ, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অমৃতধারা ঝরে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, এ সম্পর্ক যেন জন্ম জন্মান্তরের।
আলোচনার মাঝে অভেদানন্দজি সুভাষচন্দ্রকে প্রশ্ন করলেন :
"সুভাষ, ভারতের স্বাধীনতা কবে ফিরে আসবে?"
দেশপ্রেমে উদ্বেলিত সুভাষচন্দ্র উত্তর দিলেন :
“মহারাজ, জগদ্দল পাথরকে সরানো কি সোজা কথা! তবে আশা আছে। আশা না থাকলে এত খাটছি কেন? ভারত স্বাধীন হবেই।”
এই আশ্বাসে অভেদানন্দজি উল্লসিত হয়ে প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন :
“বিজয়ী হও। তোমার স্বাস্থ্য ভালো থাকুক। সময় পেলে আবার এসো।”
সুভাষবাবু বিনীতভাবে মহারাজের চরণে প্রণাম ক'রে তাঁর আশীর্বাদ গ্রহণ করলেন। এরপর দীর্ঘক্ষণ দেশের নানান সমস্যা নিয়ে আলোচনাও হলো। সবশেষে মহারাজ আনন্দে জয়ধ্বনি দিলেন :
"জয় রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্র বসু কী জয়! তুমি রাষ্ট্রপতি হয়েছো, তোমাকে দেখবার ইচ্ছে ছিল, তাই আজ আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। তুমি বাংলার গৌরব, সমগ্র ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছো।"
আলাপের শেষে মহারাজ উপদেশ দিলেন :
"এই জগদ্দল-পাথর সরানোর উপায় আছে -- সেটা একতার দ্বারা। চেষ্টা করো যাতে দেশের মানুষের মধ্যে সত্যিকারের ঐক্য আসে।"
বিদায়ের পরও মহারাজ সুভাষের কথা ভেবে বিভোর হয়ে রইলেন। সেবককে বললেন :
"দেখলে, সুভাষবাবুর সহাস্যবদন? মুখে হাসি, কিন্তু ভিতরে কেমন গম্ভীর, শান্ত! ভেতরে ত্যাগের ভাব আছে, সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করে।"
অন্যদিকে এলগিন রোডে ফিরে হরিদাস মিত্র জিজ্ঞেস করলেন :
"রাঙা কাকু, স্বামী অভেদানন্দকে কেমন দেখলেন?”
সুভাষচন্দ্র আবেগভরে বললেন :
"কী অপরূপ চেহারা! জ্বলজ্বল করছে, যেন আগুনের এক শিখা। এক বিরাট জ্যোতির্ময় পুরুষ! তাঁকে দেখে ধন্য হলাম।"
সৈনিক ও নেতার ভূমিকায় সুভাষচন্দ্র ছিলেন নির্ভীক, কিন্তু অন্তর ছিল এক মহান তপস্বীর জীবনের মতো। স্বামীজীর নির্দিষ্ট পথই ছিল তাঁর প্রেরণা।
দেশমাতার জন্য অক্লান্ত সংগ্রামে যিনি নিজেকে নিঃশেষ করেছেন, সেই মহাবীর সুভাষচন্দ্র -- আজ তাঁর আত্মত্যাগের ঋণ আমরা ভুলে যেতে বসেছি। অথচ যাঁর দৌলতে এই স্বাধীনতা, তাঁরই শিক্ষা ও ত্যাগের আদর্শকে যথার্থভাবে অনুসরণ করা -- এ আমাদের প্রকৃত কর্তব্য।
সূত্র : 'প্রচারক অভেদানন্দ' থেকে সংক্ষেপিত ও সংগৃহীত।।🙏🙏🙏🌹🌼🌹
Comments
Post a Comment