বেঙ্গল ফাইলস দেখে ফিরে অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তী ,গুয়াহাটি
"বেঙ্গল ফাইলস" দেখে ফিরলাম। এইমাত্র। একটা ঘোরের মধ্যে আছি। কলকাতা দাঙ্গা(১৯৪৬, ১৬আগস্ট), গোপাল পাঁঠা, সোরাবর্দির কীর্তি,ডাইরেক্ট অ্যাকশন ঘোষণা, হিন্দু নিধন, শেখ মুজিবের প্রথম জীবনে মৌলবাদীদের সঙ্গে সংযোগ, কলকাতা দাঙ্গায় অসমের কবি অমূল্য বরুয়ার হত্যা, কাজি নজরুল ইসলামের শাশুড়ি আশালতা দেবীর নিখোঁজ হওয়া(দাঙ্গাবাজরা তাঁকে হত্যা করেনি তো?), নোয়াখালিতে কোজাগরি লক্ষ্মীপূর্ণিমার দিন নির্বিচার হিন্দু নিধন(১০ অক্টোবর ১৯৪৬) হাজার হাজার হিন্দু মহিলাকে ধর্ষণ(জোছনা ছিল বলে পালাতে পারেনি), পুরুষদের জবাই, গান্ধির নোয়াখালি ভ্রমণ, উলটোপালটা বিবৃতি, রক্তের মধ্য দিয়ে দেশ ভাগ, জিন্না নেহরুর ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন পূরণ...সবই জানি, কেননা, আমাকে তা পড়াতে হয়। "দেশভাগ ও বাংলা সাহিত্য", " বঙ্গভঙ্গ ও তার প্রতিক্রিয়া", "স্বদেশী আন্দোলন" আমিই পড়াই। সিলেবাসের মিটিঙে বলেছিলাম~দেশভাগের ওপর গল্প কবিতা উপন্যাস হ্যানাত্যানা সব পড়ানো হয়, কিন্তু দেশভাগের পটভূমি, ধর্মীয় উন্মাদনা, কারণ ইত্যাদি নিয়ে বঙ্গদেশীয় তাবৎ অধ্যাপককুল সিঁটিয়ে পিছিয়ে যান। পাছে লোকে "নাগপুরের লোক" বলে! আপত্তি আমাদের মিটিঙেও উঠেছিল। ছুঁড়ে ফেলেছি। প্রজন্মকে জানতে হবে সত্যটা। দেশভাগের ওপর পঞ্চাশ-ষাটটা বই তো আমার সংগ্রহেই আছে। অমন জ্বলন্ত সত্যকে চাপা দেওয়া যায়?! সম্ভব?
পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী ইতিহাসের জ্বলন্ত সত্যকে চরমতম রূপে তুলে ধরেছেন। ডকুমেন্টেশন, গবেষণা ছাড়া এই ছবি বানানো সম্ভব নয়। এতে ইতিহাসবিকৃতির সম্ভাবনা থাকে।
মিঠুন চক্রবর্তী কত বড় অভিনেতা, সেটা বারবার প্রমাণিত। কিন্তু এবারে ফাটিয়ে দিয়েছেন তাঁর পুত্র নমস্বী চক্রবর্তী। "বাপ কা বেটা সিপাই কা ঘোড়া, কছু নেহি তো থোড়া থোড়া"। পল্লবী যোশি আমাদের যৌবনকালের রূপসী রোমান্টিক হিরোইন। তিনি এই ছবির 'রোজ'(টাইটানিকের হিরোইন বৃদ্ধা বয়সে যেমন স্মৃতিমন্থন করেন)। জরাসন্ধের মতো দুফালা করে 'অমর' নামক পঞ্জাবি বীরকে মারাটা অবশ্যই মহাভারতীয় প্রভাব। অনুপম খের গান্ধি চরিত্রকে পুরো উদোম করে ছেড়েছেন। তবে গান্ধি আরেকটু ক্ষীণকায়, গায়ের রংও আরেকটু ময়লা। কোটি কোটি টাকার সেট তৈরি করা হয়েছে নির্ঘাৎ। অসাধারণ আর্ট ডাইরেকশন। গোপাল পাঁঠা ভীষণ জীবন্ত। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় সহ বঙ্গের কয়েকজন অভিনেতা পরে বিবৃতি দিয়েছেন, তাঁরা জানতেন না ছবিটি কী বিষয়ে তৈরি। এঁদের জন্য রোদ্দুর রায়ের " ফাজলামো হচ্চে" আর নোংরা খিস্তি দরকার। কেননা, বিষয় না-জেনে এরকম চরিত্রে অমন অভিনয় সম্ভব?!
ছবি দেখার সময় পেছন থেকে কে যেন বলছিল "ইস বার তেরি ক্যা হোগা রে ক্ষমতাবেগম!" কিন্তু, মেরুদণ্ডহীন কাঙালিরা হ্যানাশ্রী ত্যানাশ্রী বিশ্রী কুশ্রী ইত্যাদি বেনিফিটের লোভে এই মহিলাকেই আবারও ক্ষমতায় আনবে, নিশ্চিন্ত থাকুন। এটাই হিন্দু কাঙালি চরিত্র। দেশভাগের উৎসে যে-দুর্বলতাই দায়ী।( মতামত নিজস্ব )
Comments
Post a Comment