মধ্যবিত্ত শ্রেণী চোরাবালিতে মুখ লুকিয়েছে ,বাঁচার পথ নেই
ঋণ করে ঘি খাওয়া মধ্যবিত্তের জাতীয় রোগে পরিণত হয়েছে।
আপনার নতুন ফোনের মাসিক কিস্তি (EMI) দেওয়ার তারিখ আসলেই কি বুকের ভেতরটা ধড়াস করে ওঠে? পাশের বাড়ির বৌদির নতুন নেকলেস দেখে আপনার স্ত্রীর দীর্ঘশ্বাস কি কানে বাজে? বাচ্চার স্কুলের বাড়তি ফি জোগাতে গিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেট খালি? যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে আপনার মাথা হ্যাঁ-সূচক নড়ে, তাহলে আপনাকে স্বাগতম! আপনি এক গভীর চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আছেন, যা আপনাকে একটু একটু করে নিচের দিকে টেনে নিচ্ছে।
কী হলো? কথাগুলো তেতো লাগছে? গায়ে লাগছে খুব? মনে হচ্ছে, লেখক আপনার ব্যক্তিগত ক্ষতে নুন ছিটিয়ে দিচ্ছে? দিন, যত খুশি গালি দিন। আপনার সব রাগ আমি মাথা পেতে নিচ্ছি। কিন্তু একটাই অনুরোধ, লেখাটা শেষ পর্যন্ত পড়ুন। যদি আপনার সাজানো-গোছানো 'ভালো থাকার' মিথ্যা দেওয়ালটা একটুও না কাঁপে, তবে বুঝবেন আমার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
আমরা এমন এক অদ্ভুত সমাজে বাস করি, যেখানে নিজের সামর্থ্যের চেয়ে অন্যের চোখে 'বড়লোক' সাজার অভিনয় করতেই আমরা বেশি ভালোবাসি। আমরা এমন এক প্রতিযোগিতায় নেমেছি, যেখানে জেতার কোনো পুরস্কার নেই, আছে শুধু ঋণের বোঝা আর দীর্ঘশ্বাস। এই লেখা কোনো অর্থনীতিবিদের কঠিন আলোচনা নয়। এটা আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের সেই ভয়ংকর অসুখের এক্স-রে প্লেট, যার নাম 'ধার করে স্ট্যাটাস বজায় রাখা'।
কখনো ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছেন, আপনার আসল প্রয়োজনটা কতটুকু? এমন একটা ফোন, যা দিয়ে ভালোভাবে কথা বলা যায় আর ইন্টারনেট চলে? নাকি বাজারের সবচেয়ে দামী সেই ফোনটা, যেটা হাতে থাকলে বন্ধুদের আড্ডায় একটা আলাদা ভাব পাওয়া যায়?
এই অসুখের জীবাণু আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে মূলত সোশ্যাল মিডিয়া আর আমাদের চারপাশের মানুষ। ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রাম খুললেই দেখবেন, কেউ দামী রেস্তোরাঁয় খাচ্ছে, কেউ বিদেশে ঘুরতে গেছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনে ছবি পোস্ট করছে। এই ঝলমলে ছবিগুলো দেখতে দেখতে আমাদের অবচেতন মনে একটা হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। আমাদের মনে হতে থাকে, "আরে, সবাই কত আনন্দে আছে! আমিই কি শুধু পিছিয়ে পড়লাম?"
এই 'পিছিয়ে পড়ার ভয়' থেকেই শুরু হয় এক অন্ধ দৌড়। অমুকের ছেলে দামী স্কুলে পড়ে, আমার ছেলেকেও সেখানেই পড়াতে হবে—দরকার হলে লোন নেব। অমুকের বউ প্রতি মাসে নতুন ডিজাইনের শাড়ি কেনে, আমার বউকে এর চেয়েও ভালোটা কিনে দিতে হবে—ক্রেডিট কার্ড তো আছেই! এই 'দেখাতেই হবে'র নেশা যেকোনো মাদকের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
আর এই নেশার আগুনে ঘি ঢালে আমাদের আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবরাই। "কী রে, এখনো পুরনো বাইকটা চালাচ্ছিস?" বা "বৌদি তো দার্জিলিং ঘুরে এলো, তুমি এবার কোথায় যাচ্ছো?"—এই সাধারণ প্রশ্নগুলোই আমাদের বুকে তীরের মতো এসে বেঁধে। এই চাপ সহ্য করতে না পেরেই একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ ঋণের ফাঁদে পা দেয়। সে ভাবে, এইটুকু বিলাসিতা তার পরিবারকে খুশি করবে। কিন্তু সে বোঝে না, এটা খুশি নয়, এটা সর্বনাশের শুরু।
ব্যাংক আর বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এই খেলার আসল শিকারি, আর আমরা হলাম তাদের সহজ শিকার। 'জিরো পার্সেন্ট ইন্টারেস্ট', 'এখনই কিনুন, পরে টাকা দিন', 'সহজ মাসিক কিস্তি'—এই কথাগুলো হলো মাছ ধরার টোপ। আমরা ভাবি, "মাসে মাত্র কয়েক হাজার টাকা তো! এটা তো দেওয়াই যায়।"
এটাই সবচেয়ে বড় ভুল। আপনি যখন পকেট থেকে একবারে অনেকগুলো টাকা দিয়ে কিছু কেনেন, তখন আপনার মনে একটা কষ্ট হয়। এই কষ্টটা আপনাকে অপ্রয়োজনীয় খরচ থেকে বাঁচায়। কিন্তু EMI এই কষ্টের অনুভূতিটাকেই মেরে ফেলে। এটা একটা মিষ্টি বিষের মতো, যা আপনি আনন্দের সাথে গ্রহণ করেন।
প্রথম একটা-দুটো কিস্তি হয়তো আপনার গায়েই লাগে না। কিন্তু যখন আপনার ফোন, ফ্রিজ, টিভি, গাড়ি—সবকিছুর কিস্তি একসাথে আপনার বেতনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন আপনি বুঝতে পারেন, আপনি আসলে আপনার জীবনের মালিক নন। আপনার জীবনের রিমোট কন্ট্রোল এখন ব্যাংকের হাতে। আপনি মাসভর হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন নিজের বা পরিবারের জন্য নয়, ব্যাংকের দেনা শোধ করার জন্য।
আপনি চাইলেও আর চাকরি ছাড়তে পারেন না, বস যতই অপমান করুক। আপনি নিজের একটা ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন দেখতে ভয় পান। আপনি অসুস্থ হলে ভালো ডাক্তার দেখাতে ইতস্তত করেন, কারণ কিস্তির টাকাটা তো দিতেই হবে। আপনি তখন আর মুক্ত মানুষ নন, আপনি একজন আধুনিক দাস। যার গলায় শেকল নেই, কিন্তু ঘাড়ে আছে ঋণের অদৃশ্য এক পাহাড়।
এখন অনেকেই হয়তো বলবেন, "তার মানে কি আমরা ঋণ নেবই না? বাড়ি বা গাড়ি করার স্বপ্ন দেখব না?"
পার্থক্যটা এখানেই। সব ঋণ খারাপ নয়। আপনাকে বুঝতে হবে, কোনটা দরকারী আর কোনটা শখের।
দরকারী ঋণ : যে ঋণ আপনার জন্য ভবিষ্যতে সম্পদ তৈরি করে বা আপনার আয় বাড়াতে সাহায্য করে, সেটাই ভালো ঋণ। যেমন:
বাড়ি কেনার লোন: ভাড়ার টাকাটা না দিয়ে আপনি নিজের বাড়ির জন্য কিস্তি দিচ্ছেন। একদিন বাড়িটা আপনার নিজের হবে, যা একটা বিশাল সম্পদ।
শিক্ষার জন্য লোন: এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে ভালো চাকরির মাধ্যমে কয়েকগুণ হয়ে ফেরত আসবে।
ব্যবসার জন্য লোন: যা সরাসরি আপনার আয় বাড়াতে সাহায্য করে।
শখের ঋণ : যে ঋণ শুধুমাত্র লোক দেখানো বা সাময়িক আনন্দের জন্য নেওয়া হয়, সেটাই মরণফাঁদ। যেমন:
দামী মোবাইল, যা এক বছর পরেই পুরনো হয়ে যাবে।
ব্র্যান্ডেড জামা-কাপড় বা ঘড়ি।
বিদেশে ছুটি কাটানোর জন্য পার্সোনাল লোন।
সাধ্যের বাইরে গিয়ে বিয়ে বা জন্মদিনের অনুষ্ঠান করা।
এই শখের ঋণগুলো হলো নিজের রক্ত বিক্রি করে দামী মদ খাওয়ার মতো। মুহূর্তের আনন্দ, কিন্তু এর পরিণাম দীর্ঘস্থায়ী আর ভয়ংকর।
আমরা শুধু টাকার হিসাবটাই করি। কিন্তু ঋণের কারণে আমাদের মনের যে কী অবস্থা হয়, সেই হিসাব কি কখনো করি?
স্থায়ী টেনশন: মাস শেষে কিস্তির টাকা কীভাবে জোগাড় হবে, এই চিন্তাটা মাথার মধ্যে পোকার মতো কিলবিল করতে থাকে।
রাতের ঘুম নষ্ট: টেনশনে রাতে ভালো ঘুম হয় না। শরীর ও মন দুটোই দুর্বল হতে থাকে।
পারিবারিক অশান্তি: টাকার টানাটানি থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া, অবিশ্বাস আর দূরত্ব বাড়ে। অনেক সাজানো সংসার এই ঋণের চাপে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
আত্মসম্মান নষ্ট: যখন আপনি পাওনাদারের ফোন ধরা বন্ধ করে দেন বা বন্ধুর কাছে হাত পাততে বাধ্য হন, তখন নিজের কাছেই নিজে ছোট হয়ে যান।
একবার ভাবুন তো, আপনার কেনা সেই দামী সোফা বা নতুন ফোনটা কি আপনার রাতের ঘুম আর মানসিক শান্তির চেয়েও বেশি দামী? যে 'ভালো থাকা' দেখাতে গিয়ে আপনার ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, সেই ভালো থাকার কি আদৌ কোনো দাম আছে?
এই লোকদেখানো জীবনের ফাঁদ থেকে বেরোনোর পথটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এর জন্য দরকার শুধু একটু সাহস আর আত্মসম্মানবোধ।
অন্যের সাথে নিজের তুলনা করা বন্ধ করুন। আপনার জীবন আপনার, আপনার সুখ আপনার নিজের শর্তে।
'না' বলতে শিখুন। পরিবারের অপ্রয়োজনীয় বা লোকদেখানো আবদারকে হাসিমুখে 'না' বলার সাহস রাখুন। সাময়িক মন খারাপ হলেও, আখেরে আপনার পরিবারই বাঁচবে।
আয়ের মধ্যে বাঁচতে শিখুন। চাদর যত বড়, পা ততটুকুই ফেলুন। এটাই সুখী থাকার সবচেয়ে সহজ সূত্র।
খরচের হিসাব রাখুন। কোথায় কত টাকা যাচ্ছে, তার একটা হিসাব থাকলে অপ্রয়োজনীয় খরচ আপনি নিজেই বন্ধ করতে পারবেন।
সময় এসেছে এই মিথ্যা স্ট্যাটাসের মুখোশটা ছুড়ে ফেলার। সময় এসেছে এটা মেনে নেওয়ার যে, ঋণের টাকায় কেনা জিনিস দিয়ে সুখী হওয়া যায় না। আসল সুখ থাকে দুশ্চিন্তামুক্ত ঘুমে, পরিবারের সাথে কাটানো হাসিখুশি মুহূর্তে আর মানসিক শান্তিতে।
এখন শেষবার নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনার ক্রেডিট কার্ডটা কি আপনার কাছে স্বাধীনতার চাবি মনে হচ্ছে, নাকি দাসত্বের শেকল?
(Collected)
Comments
Post a Comment