দলিত সমাজ কি অত্যাচারিত সমাজ ?

 চন্দন সিনহা :  আজকাল খুব একটা কথার প্রচলন হয়েছে -----                        " দলিত সমাজ " অত্যাচারিত , ব্রাম্মণ্যবাদীদের দ্বারা অত্যাচারিত ! এবং এই অত্যাচারের ফলেই নাকি বহু নিম্ন বর্ণের হিন্দু ধর্মান্তরিত হয়েছেন - বলা ভালো মুসলিম হয়েছেন , খৃস্টান হয়েছেন - সেই বহুকাল আগে থেকে ! হিন্দু সমাজ বা হিন্দু সংস্কৃতি - নাকি ব্রাম্মণ্যবাদী !! একটু আদিকাল থেকে দেখে আসা যাক :------
শ্রুতি থেকে বেদ যখন লিপিবদ্ধ হয় ------ যিনি লিপিবদ্ধ করেন ----- সেই ব্যাসদেব , তিনি ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! ব্রাম্মণ যখন পৈতা ধারন করেন - তাঁকে যে " গায়ত্রী "মন্ত্র জপ্ করতে হয় বা পাঠ করতে হয় , সেই গায়ত্রী মন্ত্রের যিনি স্রষ্ঠা -------- মহর্ষি বিশ্বামিত্র - তিনি ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! দেবতারা যাঁর সাহায্যে - স্বর্গ পুনর্দ্ধার করেন এবং যাঁর আত্মত্যাগ জগৎ স্বরণীয় , সেই দধিচি মুনি ------ শূদ্র ছিলেন - ব্রাম্মণ ছিলেন না ! যাঁকে দক্ষিণ ভারতের উদ্ধারকর্তা বলা হয় ------ সেই অগস্ত্যা মুনি - শূদ্র ছিলেন , ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাম্মণ্যবাদী ?

ত্রেতা যুগে রচিত রামায়ণ - যিনি রচনা করলেন - মহর্ষি বাল্মীকি , ব্রাক্ষণ ছিলেন না ( আজও দেখুন - উত্তর প্রদেশের বাল্মীকি যাঁরা , তাঁরা এস.সি. ) ! রামায়ণে সব থেকে শ্রদ্ধেয় চরিত্র ----- রাম , ক্ষত্রিয় ছিলেন - ব্রাক্ষণ নয় ! শ্রীরামের যুদ্ধ যাঁর বিরূদ্ধে - তিনি রাবণ , রাবণ ব্রাক্ষণ ছিলেন ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি - ব্রাম্মণ্যবাদী ?

মহাভারতে তিন নীতির যুদ্ধ ! ধর্মনীতি , রাজনীতি এবং কূটনীতি ! ধর্মনীতি যিনি ধারন করে আছেন তিনি শ্রীকৃষ্ণ ! রাজনীতি যিনি ধারন করে আছেন - তিনি মহামতি বিদুর ! আর কূটনীতির ধারক - শকুনি ! ভারতীয় সভ্যতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী যাঁকে বলা হয় - সেই মহামতি বিদুর ----- ব্রাক্ষণ ছিলেন না , ছিলেন দাসী পুত্র ! মহাভারত যুগে শ্রীকৃষ্ণের পর যিনি সব থেকে জ্ঞানী ব্যক্তি - সেই মহামতি বিদুর শূদ্র ছিলেন - ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাম্মণ্যবাদী ?

প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ তিন রাজবংশ ------ নন্দ বংশ ( শূদ্র ) , মৌর্যবংশ ( শূদ্র ) এবং গুপ্ত বংশ ( বৈশ্য ) ! এঁরা কেউ ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! এরপরেও যাঁদের রাজত্বের বিস্তৃতি , প্রায় মোগলদের রাজত্বের ভূখণ্ডের সমান বিস্তৃতি ছিলো - সেই পালবংশও ব্রাক্ষণ ছিলো না ! এমন কি সেন বংশও ব্রাক্ষণ ছিলো না ! তাহলে কখন ব্রাম্মণ্যবাদীরা অব্রাক্ষণদের উপর অত্যাচার করেছিলো বলতে পারেন ? যখন প্রাচীন সব গল্পই দেখা যায় , দরিদ্র ব্রাক্ষণ - ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে প্রতিদিন ভিক্ষা করতে বের হচ্ছেন , ঘরে ব্রাক্ষণপত্নী পথ চেয়ে আছেন - কখন ব্রাক্ষণ ফিরবেন , ভিক্ষা নিয়ে - তারপর রান্না হবে - সেই ব্রাক্ষণগণ অত্যাচারী ?

আধুনিক যুগের ভারতের দিকপুরুষ - যিনি ব্রাক্ষণশ্রেষ্ঠ শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্য এবং যিনি রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন , সেই স্বামীবিবেকানন্দ ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা প্রণবানন্দ মহারাজ - ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! আজ সারা বিশ্বে শ্রীকৃষ্ণ নাম মাহাত্ম্য বিতরণ , মন্দির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে- যেই সংঘঠনের মাধ্যেমে - সেই " ইসকন " এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল প্রভুপাদ - ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! তাহলে বলতে পারেন - কোথায় এই সংস্কৃতি ব্রাম্মণ্যবাদী ????

হ্যাঁ এঁরা সকলেই - নিজ কর্ম গুনে ব্রাক্ষণ শ্রেষ্ঠ , এবং কর্ম দ্বারাই ব্রাক্ষণ ! গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন - তিনি গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে চারিবর্ণের সৃষ্টি করেছেন ! চারজাতি নয় !

আমাদের সংস্কৃতি কখনো কারও মাঝে বিভেদ রাখেনি ! নাহ্ - ব্রাক্ষণ , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য , শূদ্র - কারো মাঝে না ! ব্রাক্ষণশ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য যেমন - মেথর কে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পিছপা হননি , তেমননি - আমাদের সংস্কৃতি - পিছপা হয়নি শূদ্র থেকে ব্রাক্ষণকে সন্মান জানাতে ! আমাদের সংস্কৃতি - ব্রাক্ষণ শ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য , রামকৃষ্ণ দেব , চৈতন্য মহাপ্রভু সবাই কে সন্মান দিয়েছে - তাঁদের কৃতকর্মের জন্য !

তবে কি - সেই সমাজে বা এই সমাজে বিভেদ ছিলো না - অত্যাচার ছিলো না ? অবশ্যই ছিলো - সেটা ধনী দরিদ্রের বিভেদ, দরিদ্রের উপর ধনীর অত্যাচার ! তাহলে - কেনোই বলা হয় - উচ্চজাতির প্রতি নিম্নজাতির অত্যাচার ছিলো ? কারণ - হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া একটি চক্রান্ত যা আড়াইশত বছর পূর্বে আরও জোরদার হয় এবং এই হিন্দু সমাজ কে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যা - আজও সমান তালে চলছে ! না হলে বলুন তো প্রায় দূ'কোটি " মতুয়া " সম্প্রদায় কেনো ইসলামিক পূর্ব পাকিস্থান বা ইসলাম প্রধান বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসে - ভারতে আশ্রয় নিতে হয় ? যদি- উচ্চবর্ণের অত্যাচারে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা মুসলিম হয়ে থাকে ? আজও কেনো বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসতে হয় - প্রধানতঃ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ! বাংলাদেশ সংলগ্ন বর্ডার সাইট গুলি লক্ষ্য করুন - দেখবেন , বেশীর ভাগই তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু ! কেনো - তাঁরা আজও মুসলিম নয় ? কারণ - যা আমাদের ইতিহাস পাল্টে গুলে খাওয়ানো হচ্ছে - তা ভুল ইতিহাস ! উল্লেখ করা যেতে পারে - পূর্ব পাকিস্থানের মন্ত্রী - যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কথা ! তাঁকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে হয়েছিলো - তিনি ক্ষমা পাননি - তিনি নিম্ন বর্ণের হিন্দু হলেও !

কোন সমাজ - ব্রাম্মণ্যবাদী ছিলো ? কিভাবে ছিলো ? যেখানে হিন্দুদের সাতটি গোত্রই চতুর্বর্ণে দেখা যায় ! যেমন - ভরদ্বাজ গোত্র , ব্রাক্ষণের যেমন আছে তেমনি শূদ্রদেরও আছে ! কাশ্যব গোত্র - ব্রাক্ষণ থেকে শূদ্র সবার মধ্যে আছে ! এতেই কি প্রমাণ হয় না - হিন্দুরা সাম্য ? প্রাচীন তিনটি উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র , তক্ষশীলা - নালন্দা - কাশী তে দেখুন তো ক'জন ব্রাক্ষণ পণ্ডিত ছিলেন আর ক'জন অব্রাক্ষণ পণ্ডিত ! তারপরেও এই সংস্কৃতি নাকি - ব্রাম্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ????

সর্বশেষ উদাহরণ :- দলিত সম্প্রদায়ের - রামজি মালোজী শাকপাল ও ভীমারাই'র চৌদ্দতম তথা কনিষ্ঠ পুত্র ভীমরাও কে যিনি পুত্ররূপে " ভীমরাও অাম্বেদকর " নামে সারা পৃথিবী কে চিনিয়েছেন - তিনি ব্রাক্ষণ সম্প্রদায়ের মহাদেব আম্বেদকর (লক্ষ্য রাখুন - আম্বেদকর surname টি মারাঠি ব্রাক্ষণ surname) এবং যিনি - বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও রামজী আম্বেদকর কে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন - তিনি বরদা'র মহারাজা - সায়াজী রাও একজন ব্রাক্ষণ !

হিন্দু সংস্কৃতি কে ভাঙতে যাঁরা তখন থেকে এখন একই ভাবে চক্রান্ত করে গেছেন - তাদের কে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার সময় এখনই ! কারণ আপনিও আপনার কর্মগুনে ব্রাক্ষণ , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য এবং শূদ্র !
" ব্রাক্ষণ আমার ভাই - চন্ডাল আমার ভাই - সবার শরীরে মানুষেরই রক্ত ! "

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর