ওডাল বাকরা তে শ্রীমন্ত শংকরদেবের ৪৫৭ তম জন্মতিথি উৎসব
গুআহাটি, ২৬ আগষ্ট, ২০২৫ - গতকাল ২৫ আগষ্ট গুআহাটির ওদালবাক্রাস্থ বিবেকানন্দ কল্যাণ কেন্দ্রের যোগমন্দির প্রাঙ্গনে যথারীতি একটি গাম্ভীৰ্যপূৰ্ণ ছাত্র কেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মহাপুরুষ শ্ৰীমন্ত শঙ্করদেবের ৪৫৭ তম তিরোধান বার্ষিকী পালিত হয়। কল্যাণ কেন্দ্রের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক শিক্ষয়িত্ৰী, কর্তৃপক্ষীয়বর্গ তথা শুভানুধ্যায়ীদের উপস্থিতিতে গুরুজনার পাদপদ্মে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও পুষ্পার্ঘ্ প্রদানের সঙ্গে সমবেত কণ্ঠে প্রাত্যহিক সুপ্রভাত স্তোত্ৰ পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। কল্যাণ কেন্দ্রের সম্পাদক জহরলাল সাহা দ্বারা গুরুজনার উদ্দেশ্যে সংস্কৃতে রচিত স্তোত্ৰটির বাংলা অর্থ হল "তুমি ধ্রুব ভারতের প্রহরী হয়ে নব বৈষ্ণবীয় একশরণ ধর্ম স্থাপন করে এই উত্তর পূর্ব ভারতকে দৃঢ় ধর্মসূত্রে বেঁধে দিয়েছ। হে দেব শঙ্কর গুরু, তোমাকে সুপ্রভাত।" অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণে আশীষ দাস মহোদয় শ্ৰীমন্ত শঙ্করদেব কিভাবে এক ভয়ঙ্কর ক্রান্তি লগ্নে গোড়া ঐশ্লামিক ধর্মীয় শক্তির আক্ৰমণের মুখে এই সমগ্র উত্তর পূৰ্বাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠী, তার ধর্ম ও সমাজকে রক্ষা করেছিলেন তার ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরেন। শঙ্করদেবকে নিয়ে জাতীয়স্তরে অপ্রতুল গবেষণার প্রসঙ্গে তিনি শঙ্করদেবকে আদিগুরু শঙ্করাচার্য বলে বিবেকানন্দের ভুল ধারণাটি উল্লেখ করেন।
তারপর ছাত্রছাত্রীদের অনুষ্ঠানে নিম্ন শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা গুরুজনার জীবনী সম্পর্কযুক্ত ভাষণ ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে ছিল রাজু শর্মা (ix), অনুষ্কা কুমারী (VI), ঋষিকা বৈদ্য (VII), দিব্যা কুমারী (VII), দিয়া এবং দীক্ষা (VIII), ধীরাজ কুমার (IX), বিকাশ গুপ্তা (IX) ।
কাহীলিপাড়া হাইস্কুলের শিক্ষক গোবিন্দ অধিকারী মহোদয় বিবেকানন্দ কল্যাণ কেন্দ্রে বহুকাল ধরে ছাত্র কেন্দ্রিক শঙ্করদেব চর্চার ঐতিহ্যকে তুলে ধরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের প্রচেষ্টার কথা ব্যক্ত করেন। উপসংহারে কল্যাণ কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জহরলাল সাহা বলেন যে শঙ্করদেবকে নিয়ে একেবারে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিবেকানন্দ কল্যাণ কেন্দ্রে যে চর্চা ও কার্যক্রম চলছে তা নিতান্ত অনুষ্ঠান মাত্র নয়। বৈদান্তিক বিবেকানন্দের অদ্বৈতবাদ ভিত্তিক বিশ্বাত্মিক ধর্ম স্থাপনের কার্য্যসূচীর অংগ রূপে এই প্রতিষ্ঠানের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কামাখ্যায় তীর্থ যাত্রাকালে বিবেকানন্দকে "হঙ্কর"-এর কথা বলা হয়েছিল। তিনি আদি গুরু শঙ্করাচার্যের নামের সঙ্গে কেবল উচ্চারণ বৈসাদৃশ্যের ফলেই শঙ্করদেবকে শঙ্করাচার্য বলে ভুল করেছিলেন, ব্যাপারটা অতটাই সরল ছিল না। এখানে শঙ্করদেবের মহাপুরুষীয় ধর্মের অদ্বৈতবাদী ভাবাদৰ্শটিও শঙ্করাচার্যের ঘোষিত মতবাদের সঙ্গে একাত্ম ছিল। যার ফলে বিবেকানন্দ সেদিনের স্বল্প পরিচিত শঙ্করদেবকে তার কাছে নিজের দার্শনিক আদি গুরু শঙ্করাচার্যের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেছিলেন। এই ভুলটি স্থান কাল ও ব্যক্তির ঐতিহাসিক দূরবর্তিতাকে পার হয়ে একটি অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক দার্শনিক মতবাদের একাত্মতাকে প্রতিষ্ঠা দান করেছে।
গুরুজনার নির্দেশ -
" শৃগাল-কুক্কুর-গর্দভরো আত্মারাম,
জানিয়া সবাকো পরি করিবা প্রণাম।"
আর বিবেকানন্দের কলিজা নিঙরানো চিৎকার -
"ব্রহ্ম হতে কীট-পরমাণু সর্বভূতে সেই প্রেমময়,
মন প্রাণ শরীর অর্পণ কর সখে এ-সবার পায়,
বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর!
জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।।"
-এই দুই উচ্চারণ তো চারশ' বছরের কালসমুদ্রের ও-পার এ-পারের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি মাত্র।
তাছাড়া ইসলাম ধর্ম এদেশের ব্ৰাহ্মণ্যবাদী জাতিভেদ ও ধর্মীয় অ-সাম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের বাণী নিয়ে অত্যাচারিত ও ধর্মের অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষের কাছে এসেছিল। তার সঙ্গে রাজত্বপ্রতিষ্ঠার কৌশলী বলপ্ৰয়োগও ছিল। কিন্তু ইসলামের সাম্যের আবেদনটি বঞ্চিত বুকে মুক্তির ঢেউ তুলেছিল। তাতেই হিন্দু ধৰ্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণের ঢল নেমেছিল। শ্রীচৈতন্য-শঙ্করদেব-নানক-কবীরেরা ইসলামের এই সাম্যবাদী আবেদনের ফলে সংঘটিত ব্যাপক ধর্মান্তরণের সামনা করতে গিয়ে বৈষ্ণব ধর্মের ব্ৰাহ্মণ্যবাদ বিরোধী প্রেমধর্মের সাম্যাদর্শকে তুলে ধরেন। এভাবেই ইসলামের সাম্যবাদী ধারণাটি আত্মীকরণের পদ্ধতিতে ঐ ধর্মান্তরণের প্রবল বণ্যাকে রোধ করে হিন্দু ধর্মকে বাঁচিয়েছিলেন। এই সমন্বয়বাদই আরও চারশ বছর পর রামকৃষ্ণ - বিবেকানন্দে পূর্ণাঙ্গ বিকাশ লাভ করেছে। আজ এই পথই সমগ্র বিশ্বকে বিনাশের গভীর সঙ্কট থেকে উদ্ধার করতে পারে। বিবেকানন্দ কল্যাণ কেন্দ্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংস্থান ও সামর্থ্য নিয়ে এই সমন্বয়ের ধারাকে নৈষ্ঠিক শিক্ষার অঙ্গীভূত করতে চেয়েছে। গত চার দশক ধরে তারই সংগ্রাম চলছে অরণ্যের অন্তরালে। কেন্দ্রের পরিসরে ১৯৮৫ সালে শ্ৰীমন্ত শঙ্করদেব শিশু উদ্যান প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে এই ভাবনাই ছিল মূল অনুপ্রেরণা।
বিবেকানন্দ কল্যাণ কেন্দ্র জাতীয় শিক্ষা নিকেতনের প্রধান শিক্ষয়িত্ৰী যামিনী শর্মার ধন্যবাদ প্রদানের পর জাতীয় সঙ্গীত অনুষ্ঠিত হয় এবং সমাপ্তিতে সকলেই মাহপ্রসাদের দ্বারা আপ্যায়িত হয়।
Comments
Post a Comment