জাগো বাঙালি জাগো : অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তী গুয়াহাটি



জাগো বাঙালি, জাগো
•••
প্রশান্ত চক্রবর্তী
••••••
বাঙালি হিন্দু দুর্গা পূজা করে। কালী পূজা করে। দুর্গা পূজার চল মূলত রাজা জমিদার সামন্ত ভূস্বামীরা শুরু করলেও পরে সেটা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। হুগলির গুপ্তি পাড়ার বারোজন যুবক মিলে সাধারণ মানুষের জন্য দুর্গা পূজা শুরু করেছিলেন। বারো ইয়ার বা বন্ধু থেকে "বারোইয়ারি" পূজার প্রচলন শুরু। কোচবিহারের রাজবাড়ির বর্ণাঢ্য দুর্গাপূজা দেখে আহোম রাজকুমার সুন্দর কোঁওর অসমে এসে রাজঘরানার দুর্গাপূজা শুরু করেন। 
    কালীপূজা সরাসরি শক্তির আরাধনা। "শক্তি" মানে আত্মশক্তি। মূলত ইসলামি শক্তির হত্যা লুণ্ঠন বলাৎকার ধর্মনাশের বিরুদ্ধেই দুর্গা ও কালীপূজার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল। "অসুর" বা সভ্যতা সংস্কৃতি ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে নিজের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করার সাধনাই ছিল দুর্গা ও কালী পূজার প্রাধমিক কারণ। 
    দুর্গা মানে যিনি দু্র্গ রক্ষা করেন। দুর্গ মানে জীবন। জীবনের দুর্গ। জীবনকে দুর্গতির হাত থেকে বাঁচান বলেই তাঁর আরেক নাম "দুর্গতিনাশিনী"। তাঁর দশ হাত। তাই তিনি দশভূজা। অর্থাৎ একজন নারীর মধ্যে দশ দিক রক্ষা করার মতো শক্তি আছে।তিনি ঘরের মায়ের মতো যেমন দশ হাতে সংসার সামলাতে পারেন, তেমনি প্রয়োজনে অস্ত্র তুলে নিতে পারেন দশ রকম। এই দুর্গা মানে প্রতিটি ঘরের প্রতিটি নারী-শক্তি। আকাশে কোনো দুর্গা নেই। সাধারণ মানুষ এত গভীর ব্যঞ্জনা বুঝবে না বলেই প্রতীকি ঘটনার মধ্য দিয়ে জীবনের সত্যগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলোই ভারতীয় পুরাণ। অর্থাৎ পুরাতন কাহিনি। 
    তো, দুর্গার হাতে তো অস্ত্র। থালা বাটি হাতা খুন্তি নয়।ক্ষেপণার্থক অস্ ধাতু থেকে "অস্ত্র" শব্দটি এসেছে। এগুলো ক্ষেপণ করার জন্য। অসুর বা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে। এই অসুর কারা? এই অসুর আপনার আমার চারপাশেই তো ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেমন— আর জি কর হাসপাতালে কতকগুলো অসুর মিলে একটি নারীকে ধর্ষণ করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এইরকম লোকেরাই অসুর। এরা স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে। দখল করে। তারপর নানারকম ধ্বংসে হত্যায় ধর্ষণে লিপ্ত হয়। "স্বর্গ" মানে কী? স্বর্গ মানে সুন্দর জীবন। মরার পর কোনো স্বর্গ-টর্গ আছে কিনা সে-প্রশ্ন অবান্তর। জীবনকে নষ্ট যারা করে, শুভ ও সুন্দরের বিরুদ্ধে যারা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির নাশ করে যারা—তারাই অসুর। তাই শেখ ফজলুল করিম লিখেছিলেন :
 "কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?
মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর!
রিপুর তাড়নে যখনই মোদের বিবেক পায় গো লয়,
আত্মগ্লানির নরক-অনলে তখনি পুড়িতে হয়।
প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরস্পরে,
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরি কুঁড়ে ঘরে।"
     রিপুর দাসত্ব যারা করে, সোজা কথায় তারাই অসুর। একেকরকম অসুর একেক রকম রূপ ধরে আমাদের সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরাণে তাদের নাম চণ্ড, মুণ্ড, শুম্ভ, নিশুম্ভ, মহিষাসুর প্রভৃতি। কেউ সরকারি বেসরকারি অর্থ লুট করছে, মানুষকে ঠকিয়ে ধাপ্পা দিয়ে বাটপারি করে অর্থ আত্মসাৎ করছে, সেও কি অসুর নয়? আপনার প্রতিবেশী নিত্য আপনার ওপর নানা উৎপাত করছে, এরা কি অসুর নয়? এই যে নানা রকম মাফিয়া, সিন্ডিকেট—সবই তো অসুরের কারবার। 
     সমাজে যারা গুন্ডামি করে, তারা কি অসুর নয়?একটি ঘটনা বলি। এক ভদ্রলোকের প্রতিবেশী নতুন গাড়ি কিনেছে। সেটার মধ্যে কাঠপেনসিলের দাগের মতো ছোট্ট একটা দাগ পড়েছে। শহরে সমস্ত গাড়িমোটরেই কমবেশি দাগ পড়ে। এই আধা ইঞ্চি দাগের জন্য এরা ওই ভদ্লোকের পুত্রকে নিছক সন্দেহর বশে বাইরের থেকে গুন্ডা এনে ঘিরে ঘরে মারধর শুরু করে। একেকটা ষাঁড়ের মতন লোক। অথচ এরা ষাটের ওপর বয়স। তখন ভদ্রলোকের ঘরে মিটিং চলছিল। অনেক নারী পুরুষ। ওপর তলা থেকে নীচে নামতেই ষাটোর্ধ্ব ষন্ডারা তাদের ওপরও হামলা করে। তাতে চারজন মহিলা আহত হন। যে এই অসুরগুন্ডাদের ডেকে নিয়ে এসেছে সে রিপুর তাড়নায় মনোবিকারে ভোগা একটি সামাজিক অসুর নয় কি? এরপর ওকে ডেকে ভরা সভায় ভদ্রলোকের  স্ত্রী সামনাসামনি কথার তোড়ে অ্যায়সা ধোলাই দিয়েছেন যে সাত জন্মে আর অসুরগুন্ডা নিয়ে গুন্ডামি করবে না। ওই সময় ওই মুহূর্তে তিনিই তো ঘরের দুর্গা। প্রয়োজনে সন্তানের জন্য রুখে দাঁড়াতে পারেন। রান্নাঘরের হাতা খুন্তিতে আবদ্ধ নয়, বরং প্রয়োজনে রুদ্ররূপ ধারণ করে অসুরের শক্তিকে নাশ করতে পারেন। একটি সামান্য দাগের জন্য (তাও সন্দেহের বশে) যারা গুন্ডা ডেকে একটি তরুণের ওপর হামলা করেছিল তারা কি অসুর নয়? ভাগ্যিশ  তরুণটি জিম করে। একাই ছয়টি অসুরকে সে উচিত শিক্ষা দিয়েছে। এটাই তো বীরের কাজ। সমাজে সংসারে এটাই তো অসৎ-নিরোধী পরাক্রম।  
   গীতার ষোড়শ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অসুরপ্রকৃতির মানুষগুলো সম্পর্কে বলে গেছেন—এরা রিপুদাস। অহংকার, শারীরিক বল, দর্প, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা, অজ্ঞানতা এদের চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য। ভোগ ও বিলাস এদের জীবন। লক্ষ করবেন, এরা বলদর্পী হয়। জেলে যেসব মন্ত্রী-আমলা পচছে, তাদের মতো। ধরাকে এরা সরা জ্ঞান করে। অত্যাচারই এদের ধর্ম। নারী এদের কাছে কেবল ভোগের উপকরণ। ধর্মের নামেও কখনও বলা হয়েছে "গণিমতের মাল" বা যুদ্ধে অর্জিত সম্পত্তি। কাম-রিপুর প্রবল তাড়নায় এরা নারীকে যুগে যুগে ধর্ষণ করে এসেছে। নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনসম্ভোগই ধর্ষণ। নারীর ইচ্ছায় প্রকৃত পুরুষসঙ্গীর মাধ্যমে প্রজাতিরক্ষার বিধানের নাম বিবাহ। বিবাহ একটি আর্য বিধি। যার মাধ্যমে পরিবার সমাজ জাতি ও রাষ্ট্রের বৃদ্ধি ঘটে। আমাদের দেশে কাম একটি রিপু হলেও সেটির উপযুক্ত প্রয়োগের সমস্ত বিধান দেওয়া আছে। তাই তো মানুষের সভ্যতায় প্রথম সেক্সোলজি বা যৌনবিজ্ঞান এই আর্য ভারত থেকেই উদ্ভুত হয়েছিল। মহর্ষি বাৎসায়ন লিখেছিলেন অমর গ্রন্থ "কামশাস্ত্র"। কামকে এদেশে শাস্ত্র বলা হয়েছে। আমাদের সভ্যতায় ধর্ম, অর্থ এবং এরপরই কাম। আর এই তিনটি প্রাপ্ত হলে চতুর্থটি মোক্ষ। জীবনের সার সত্য। কাম আমাদের দেশে নিছক শারীরিক মিলন নয়। মানব-বিবর্তনের ধারা। কামের সুস্থ ও সঠিক প্রয়োগে সুসন্তান আসে। যন্ত্রের মতো কামপিপাসায় যে-জন্ম, তা উৎকৃষ্ট মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে না। তাই তো আমাদের প্রাজ্ঞ মুনিঋষিরা বিবাহ-সংস্কারের ওপর এত গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ "ভারতের নারী"-তে লিখে গেছেন : এই দেশের নারীরা সন্তান ধারণের আগে তপস্যা করতেন, যেন সুসন্তান আসে। সুসন্তান আসত, তাই তো এই দেশকে দেবভূমি বলা হত। দেবতা তো আকাশে থাকেন না। দেবচরিত্রের সন্তানেরাই সমাজে সভ্যতায় ক্রমশ "দেবতা"র মতো(enlightened বা wige person) মানুষ তৈরি হতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ বললেন : মায়ের মনোভূমিই জন্ম দেয়। শরীর তো পরে। কবি লিখলেন :
"খোকা মাকে শুধায় ডেকে—
‘ এলেম আমি কোথা থেকে,
কোন্‌খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে।'
মা শুনে কয় হেসে কেঁদে
খোকারে তার বুকে বেঁধে—
‘ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।"
  মায়ের ইচ্ছা ও তপস্যাজাত সন্তান জন্মসূত্রে সংস্কার নিয়ে আসে। এরপর পারিবারিক সংস্কার পেলে ধর্ষক হবে কী করে? যে মাতৃঅঙ্গটির প্রতি অমন লালসা, সেই অঙ্গ থেকেই তো একজন ধর্ষকেরও জন্ম। সে এটা ভুলে যায় কী করে? আমাদের দেশে সেই মাতৃঅঙ্গের পূজা করা হয়। কামাখ্যায়। সেই পূজার প্রথম ও শেষ কথা : সমস্ত সৃষ্টির আদি উৎসকে নমন করো, কৃতজ্ঞ থাকো তার কাছে, যে তোমাকে পৃথিবীকে এনেছিল, জন্ম দিয়েছিল। তাই ধর্ষণ মানে তো আসলে মায়ের অপমান। নিজের জন্মের অপমান। 
  রামায়ণে প্রথম ধর্ষণের বর্ণনা পাওয়া যায়। সম্ভবত ভারতীয় সভ্যতায় এটিই প্রথম ধর্ষণ বর্ণনা। অসুররাজ রাবণ এক জোছনারাতে পর্বতশিখরে রম্ভাকে দেখে কামার্ত হয়। রম্ভা দেবতাদের উৎসবে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। রাবণ  তাঁকে দেখে তাঁর হাত ধরে আটকে বলে :"তোমার এই কঠিন স্তনযুগল স্বর্ণকুম্ভাকার ও সুশোভন, আজ কে বক্ষঃস্থলে ইহার স্পর্শসুখ অনুভব করিবে? তোমার জঘনদ্বয় স্বর্ণচক্রতুল্য কাঞ্চীগুণমণ্ডিত ও সুখপ্রদ। আজ কে ইহার উপর আরোহণ করিবে?(বাল্মীকি রামায়ণ : হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য অনূদিত, পৃ. ৯৯৪)। সুশীল পাঠক, নিজগুণে মার্জনা করবেন। এই বর্ণনা উগ্র। কিন্তু মূল রামায়ণের। আধুনিক যুগে আমরা যাকে "ইভ টিজিং" বলি সেই বেআইনি ও অনৈতিক কার্যটির আদি রূপ রামায়ণকার লিখে গেছেন। যা হোক, রম্ভা বুঝেছেন, আজ আর পাষণ্ডের হাত থেকে রক্ষা নেই। তাই কম্পিতকলেবরে কৃতাঞ্জলিপটে বলেছেন :"আপনি আমার গুরু, আমায় এই রূপ কথা বলা আপনার উচিত হয় না, এক্ষণে প্রসন্ন হউন। প্রকৃতই কহিতেছি, আমি ধর্মত আপনার পুত্রবধূ।" 
   রাবণ তখন কামে উন্মত্ত। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য। বাল্মিকী রামায়ণের বঙ্গানুবাদ এরকম :  "রাবণ রম্ভাকে ধরিয়া শিলাতলে আনিল এবং কামমোহে আক্রান্ত হইয়া উহার সহযোগে প্রবৃত্ত হইল। পরে রম্ভা ক্রীড়াশীল হস্তীর করদলিত নদীর ন্যায় আকুল হইয়া উঠিল। তাহার মাল্য ও অলংকার স্খলিত, কেশপাশ আলুলিত।"(পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ.৯৯৫)।
    রাবণ চিরদিন ভারতীয় সভ্যতায় অসুর বা রাক্ষস। অর্থাৎ মানবিকগুণহীন অত্যাচারী। ধর্ষণ তো এরকম প্রজাতির পক্ষেই সম্ভব। 
   আমাদের সভ্যতায় তাই নারীর হাতে অস্ত্র দিয়ে তাঁকে দেবী রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অবলা করে রাখা হয়নি। অস্ত্র মানে আক্রমণ নয়। প্রতিরক্ষা। আত্মরক্ষায় যা যা দরকার তার প্রয়োগ। দুর্গার দশ হাত তাই প্রতীকী। মূর্খ বিধর্মী ও অজ্ঞানীরা ভাবে হিন্দুরা অমন অদ্ভুত দশ-হাতি নারী কল্পনা করে কী করে। তৌবা তৌবা।ফেসবুকে ঠাট্টা করে লেখে : অমন দশ হাতের ব্লাউজ কোন দর্জি বানায়? বামগুলো আরও এক কাঠি ওপরে। এরা পূজা এলেই "তোমার দুর্গা আমার দুর্গা" জাতীয় কবিতা-শ্লোগানে মত্ত হয়। ভাবে, উরিব্বাস, দিয়েছি হিন্দুদের একখানা বাঁশ। বিকারগ্রস্ত বামগুলো অসুর বা রাবণের মধ্যেও "শ্রেণিসংগ্রাম" দেখে। এরা বোঝে না, ভারতীয় সভ্যতায় জীবনদর্শনকে প্রতীকী কাহিনি রূপে প্রক্ষেপ করা হয়েছে। বাঁদরের মতন নারকেলের বাকলে কামড়ে কী হবে? ভেতরের সুস্বাদু জল ও ফল পেতে গেলে নারকেলের ভেতরটা খোলার বিদ্যা চাই। বাঁদরের পক্ষে কি তা সম্ভব?
   দুর্গার হাতে তাই ত্রিশূল, পাশ, পরশু, ধনুর্বাণ প্রভৃতি অস্ত্র। তাই তাঁকে বলা হয়  :"দশপ্রহরণধারিণী"। এগুলো দিয়ে তিনি অসুরদের বধ করেন বা নিয়ন্ত্রণ করেন। মহিষের মতো ষন্ডা পুরুষগুলো যে সমাজে ঘুরে বেড়ায় তারাই মহিষাসুর নয় কি?
  দুর্গার ধ্যানমন্ত্রেও আছে : উগ্রচণ্ডা, প্রচণ্ডা, চণ্ডোগ্রা, চণ্ডনায়িকা, চণ্ডা, চণ্ডবতী, অতিচণ্ডিকা ইত্যাদি। সবই এই অশুভ শক্তির নাশের বার্তাবহ। দুর্গার এক নাম শারদা।অনেকের ধারণা : শরৎকালে পূজা বলেই এই নাম। সেখান থেকেই আমরা বলি শারদীয় পূজা বা শারদোৎসব। কিন্তু শরৎ শব্দটি এসেছে 'শৃ' ধাতু থেকে। এর অর্থ : হিংসা ও বধ। অর্থাৎ দুর্গা মানেই অসৎ অশুভনাশকারী শক্তি। ভারত সেবাশ্রম সংঘের আরতিতে তরবারিনৃত্যটি একটি প্রতীকী আরাধনা। আত্মরক্ষায় অস্ত্র ধরতে হবে—সেই বাণীর বহিঃপ্রকাশ।
    মধ্যযুগে হিন্দু রাজা জমিদারদের বাড়িতে দুর্গাপূজার নিদান দিয়েছিলেন যাঁরা, সেই সব ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা এই মূল তত্ত্বকথা জেনেই পূজার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণকে তাঁর কুলপুরোহিত তান্ত্রিক রমেশ শাস্ত্রী এই পূজার প্রথম নির্দেশ দেন বলে কথিত। পরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র অষ্টাদশ শতকে দুর্গাপূজাকে সর্বজনভোগ্য এক উৎসবে পরিণত করেন। দেখাদেখি একাদশী। মুসলমান অত্যাচার থেকে রক্ষা ও ব্রিটিশ শাসন শুরুএই আনন্দে আটখানা হয়ে শোভাবাজার রাজবাড়িতে মহা ধুমধামে পূজা করা হয় পলাশির যুদ্ধের পরে। হাতির পিঠে চড়ে এসেছিলেন স্বয়ং রবার্ট ক্লাইভ। মূল দুর্গার শক্তিতত্ত্বকে ভুলে বাঙালিজীবন মত্ত হয়েছিল খানাপিনা, নাচাগানা, বাইজি নাচ, কবিগান, যাত্রাগান, তর্জাগান এইসবে। ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল। এস. ওয়াজেদ আলির ভাষায়—সেই ট্র্যাডিশন সমানেই চলছে। এখনও পূজা মানে বিনোদন। মৌজ। মজা। মস্তি। উৎসবের আনন্দ, অর্থনৈতিক সামাজিক দিক ও সংস্কৃতির বহতা স্রোতটি মনে রেখেও বলা যায়, আত্মশক্তি জাগ্রত করার মূল দিকটি বাঙালি হিন্দুরা সমূলে ভুলে গেছে। বরং ধর্মের নামে বিসর্জনের দিন একাংশ সামাজিক অসুরের উৎপাত আর কহতব্য নয়। পূজা যেন নির্জীব, শক্তিহীন, আত্মঘাতী, পরস্পর যুযুধান, কাঁকড়াপ্রজাতি, পলায়নবাদী, ভিরু, হিন্দু বাঙালির এক মেগা এনটারটেইনমেন্ট। দেখুন-না, বাংলাদেশটি নিজের ছিল। অসুরের ভয়ে কাঁটাতারের তলা দিয়ে পালিয়ে ভারতে এসে দলে দলে পালে পালে অনেকে হয় বামপন্থী হয়ে গেছে, অথবা নাচেগানে মত্ত এক রঙ্গরসপ্রিয় আমোদপ্রমোদপ্রবণ দুর্বল জাতিতে পরিণত হয়েছে। আত্মমর্যাদাবোধ কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। সংঘবদ্ধতা নেই। নিজেদের কামড়াকামড়িতে নিজেরাই শেষ। জাতিগত ধর্মগত সংস্কৃতিগত কোনো যূথবদ্ধতা নেই। অন্যায়-অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে এদের একাংশ নিরাপদ দূরে ও বলয়ে জীবন কাটায়। যেজন্য আত্মঘাতী হিন্দু বাঙালি আজও ভুগছে। ঘরের মা-বোনদের রক্ষাই যদি না-হল, অসুরেরা সমাজে যা ইচ্ছে তা করার পরও যদি সবাই চুপ করে "জগতে আনন্দযজ্ঞে" গায়, তাহলে আর দুর্গা পূজা করে কী হবে? শক্তিহীনের ভক্তিপূজার কোনো অধিকার নেই। কেননা দুর্গা ও কালী তো শক্তির প্রতীক। নৃত্যগীত নাটক সাহিত্য শিল্পকলা তো সুন্দরের আরাধনা, আমাদের সংস্কৃতির ধারা। এগুলো ছিল, থাকবে। পূজা উপলক্ষে সেসব হোক-না, উৎসবের বহির্অঙ্গ রূপে। কিন্তু কেবল সেগুলোই শেষ কথা হতে পারে না। শিরদাঁড়া সোজা করে প্রতিবাদও শিল্পী-সাহিত্যিকদের কর্তব্য। শিল্পী হতে গেলে অরিজিৎ সিঙের মতো হতে হবে। অদিতি মু্ন্সির মতো পুতুল হয়ে কী লাভ? রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, চারণকবি মুকুন্দদাস বা ভূপেন হাজরিকা কি তাঁদের অনন্য সব গানের ভেতর দিয়ে জনজাগরণ ঘটাননি?প্রতিবাদ করেননি? নিজেদের অসুরপ্রবৃত্তি বহন করে কী হবে অমন শিল্পী হয়ে? লাইটিং, প্যান্ডাল, থিম, কব্জি ডুবিয়ে খানাপিনা আর নিছক আনন্দই যখন দুর্গাপূজা, তখন আর জি করের ধর্ষণকাণ্ড চোখে আঙুল দিয়ে বলছে—জাগো বাঙালি, জাগো।
•••
সৌজন্য : দৈনিক যুগশঙ্খ
২১-৮-২৪
•••
(ছাপা লেখায় নদীয়ার গুপ্তিপাড়ায় আছে। ওটা হুগলির হবে~লেখক)

Comments

Popular posts from this blog

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পাবে বাংলা শারদ সংখ্যা নয়া ঠাহর