দুর্গা পুজো বাংলার অর্থনীতি শক্তিশালী ইঞ্জিন
দুর্গাপুজো বাংলার অর্থনীতর শক্তিশালী ইঞ্জিন
দেবদূত ঘোষঠাকুর
মা দুর্গা সমৃদ্ধির দেবী।
একসময় রাজা কিংবা জমিদারদের মধ্যে সমৃদ্ধির লড়াই চলত। কোন রাজা বা জমিদার কত প্রকারের ভোগ দিতে পারেন, কত লোককে খাওয়াতে পারেন, কত দান করতে পারেন তা নিয়ে ছিল বিস্তর প্রতিযোগিতা। রাজার সমৃদ্ধির লড়াইয়ে পকেট ভরত প্রজাদের। তাঁরা দু'হাত তুল রাজাকে আশীর্বাদ করতেন। তাঁর স্তুতিতে আকাশ বিদির্ন হত। রাজার লাভ বলতে এটাই।
অর্থাৎ কী না দুইপক্ষের মধ্যে দেওয়ি নেওয়ার সম্পর্ক ছিল।
ইংরেজ আমলের 'দেশিয় রাজা' দের পুজোয় (কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় ইংরেজদের বসানো রাজারা ) কিন্তু প্রজাদের জন্য কিছুই করতেন না। তাঁদের বৈভবের 'প্রসাদ' পেতেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তারা, ব্রিটিশ রাজকর্মচারী আর শহরের বাবুরা। ব্রিটিশ শাসককে তোষামদ করার হাতিয়ার ছিল দুর্গাপুজো। উপহার হিসেবে দামী দামী রত্ন, সোনার উপহার ব্রিটিশ শাসকেরা ইংলন্ডে নিয়ে যেতেন। এ ভাবে দেশের সম্পদ দেশের বাইরে চলে যেত।
বস্তুত পক্ষে বারোয়ারি পুজোর প্রথম দিকটাতেও পুজো ছিল মূলত একটি সামাজিক অনুষ্ঠান। মানুষ তখন ব্যাপকভাবে রাত জেগে প্রতিমা দর্শন করতেন না। তবে মন্ডপে মন্ডপে পুজো দেখার রেওয়াজ ছিলনা।
আর এখন? দুর্গাপুজো এখন কেবল ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি এক বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষাগার। ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, দুর্গাপুজো পশ্চিমবঙ্গের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রায় ২.৬ শতাংশ জুড়ে রেখেছে। ২০২৫ সালে পুজোয় মোট অর্থনৈতিক লেনদেনের বাজারমূল্য ৫০ হাজার কোটি টাকার গন্ডি ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কয়েক দিনের এক উৎসব গোটা বছরের অর্থনীতিকে এমনভাবে নাড়া দিতে পারে, ভাবা যায়।
দুর্গাপুজো শুধু প্রতিমা বা প্যান্ডেল নির্মাণ নয়। সীমাবদ্ধ নয়। পুজোকে কেন্দ্র করেফ্যাশন, টেক্সটাইল, জুতো, প্রসাধনী, খুচরো বাজার, রেস্তোরাঁ, হোটেল, ট্যুরিজ্ম, সিনেমাও বিনোদন শিল্প– সব কিছুরই চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। ফুচকা ওয়ালা, বেলুন বিক্রেতার, রাস্তার ধারের চা বিক্রত সবার আর্থিক উন্নয়নের একটি সুযোগ কলকাতার এই দুর্গাপুজো।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সুস্থ অর্থাৎ ভারসাম্যের অর্থনীতির একটি আদর্শ মডেল হল দুর্গাপুজো। কারণ এর বিশেষত্ব হল আয়ের বণ্টন। আধুনিক খুচরো বাজারে যেখানে পুঁজির কেন্দ্রীকরণ বাড়ছে, সেখানে দুর্গাপুজোয় বিপরীত স্রোতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উৎসবকেন্দ্রিক আয় সরাসরি পৌঁছয় সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের কাছে। প্রত্যেকেই এই সময় বিশেষ আয়ের সুযোগ পান। প্রতিমাশিল্পী, ঢাকি, প্যান্ডেল মিস্ত্রি, আলো-সাজসজ্জার শ্রমিক, নিরাপত্তাকর্মী– হাজার হাজার মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়। বড় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি হকার, ছোট দোকান, মিষ্টির দোকান, এমনকী চায়ের স্টলও আয় বাড়িয়ে নিতে পারে। এই টাকার স্রোত কেবল শহর নয়, জেলা শহর ও মফস্সলের অর্থনীতিকেও
প্রভাবিত করে।
এক অর্থনীতিবিদের কথায়, উৎসবের সময় সাধারণ খুচরো বাজারের উপচেপড়া ভিড় অর্থনীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। বড় মল ও অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম ক্রমশ বাজার দখল করায়, রাস্তার হকার বা পাড়ার দোকান যে পরিমাণ লাভ একসময় পেত, এখন তা কমে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে এখন ‘অনুদান’ দেয়।অনেকে বলেন, এই অর্থ স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা কৃষিতে ব্যবহার করলে ভালো হয়। । কিন্তু যেটা দেখার ব্যাপার যে এই টাকাটা শেষ পর্যন্ত স্থানীয় অর্থনীতিতেই ফেরে এবং একাধিক স্তরে যেমন আলো, সাজসজ্জা, নিরাপত্তা, প্রতিমা বা সাউন্ড সিস্টেমে খরচ হয়। স্থানীয় শ্রমিক, সরবরাহকারী বা দোকানদারের হাতে পৌঁছায়। মানুষের আয় বাড়ে।
অর্থনীতি গতি পায়।
২০২১ সালে ইউনেস্কো দুর্গাপুজোকে ‘Intangible Cultural Heritage of Humanity’ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে কলকাতার দুর্গাপুজো আন্তর্জাতিক মানচিত্রে এক বিশেষ স্থান দখল করেছে। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে হোটেল, ট্যুর-ট্রাভেলস, রেস্তোরাঁয়।
কোথাও একটা পড়ছিলাম, প্রযুক্তিনির্ভর দুর্গাপুজোয় প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে এআই-ডিজাইন্ড লাইটিং, ড্রোন শো, 3D ম্যাপিং, ইনস্টলেশন আর্ট দেখা যাচ্ছে। দুর্গাপুজো তাই এক ধরনের টেক-ফেস্ট, যেখানে সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটছে। যা
স্টার্টআপদের জন্যও এই উৎসব সুযোগ তৈরি করছে। নতুন প্রোডাক্ট, ফুড ব্র্যান্ড বা ডিজিটাল কনটেন্ট এই সময় বাজারে লঞ্চ হয়। কাজেই বললে অত্যুক্তি হবে না যে, দুর্গাপুজো আসলে এক ধরনের বাজার গবেষণার মঞ্চ।
উৎসবের আনন্দ যেমন আড্ডা, ভিড়, নতুন জামা আর রঙিন আলোয় ধরা দেয়, তেমনই এর পিছনে লুকিয়ে থাকে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ। দুর্গাপুজো তাই কেবল ধর্মীয় আবেগের উৎস নয়, বাংলার অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন।ছবি:অরূপ গুপ্ত
Comments
Post a Comment