সুতায় বোনা বিশ্ব ভূবন

সুতোয় বোনা বিশ্বভুবন 
অনির্বাণ কুণ্ডু 

যে তত্ত্ব বলে, মহাবিশ্বের সব কিছুর মূলে আছে অতিক্ষুদ্র কম্পমান সুতো, তার অন্যতম প্রধান কারিগর কলকাতার ছেলে!

গত বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর। স্টকহোমের আলবানোভা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে এক বাঙালি পদার্থবিদ শোনাচ্ছিলেন মহাকর্ষ আর সুতোর গল্প। বক্তৃতার নাম ‘গ্র্যাভিটি ফ্রম স্ট্রিংস অ্যান্ড স্ট্রিংস ফ্রম গ্র্যাভিটি’। বক্তা অশোক সেন। এ বছর অস্কার ক্লেইন পদক পেলেন তিনি, এবং এই সম্মান পাওয়া প্রথম ভারতীয় পদার্থবিদ।

পদকটি দেয় স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় ও রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের নোবেল পদার্থবিদ্যা কমিটি। ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি বছর একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীকে এটি দেওয়া হয়, তিনি স্মারক বক্তৃতাও দেন। পদকের নাম সুইডিশ পদার্থবিদ অস্কার ক্লেইনের (১৮৯৪–১৯৭৭) নামে। এই নামের সঙ্গে স্ট্রিং থিওরির যোগ গভীর। ক্লেইন একদিন ভেবেছিলেন, আমাদের চেনা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা আর সময়ের বাইরেও হয়তো আরও একটি মাত্রা আছে, এত ছোট যে আমরা তা দেখতে পাই না। সেই ‘লুকোনো মাত্রা’র ভাবনাই পরে স্ট্রিং থিওরির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে ওঠে।

অশোক সেনের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৫ জুলাই, কলকাতায়। বাবা অনিল কুমার সেন স্কটিশ চার্চ কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। অশোক পড়েছেন প্রেসিডেন্সি কলেজে, এমএসসি আইআইটি কানপুরে, পিএইচডি আমেরিকার স্টনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিদেশে গবেষণার সুযোগ ছিল অঢেল, তবু ১৯৮৮ সালে তিনি দেশে ফিরে মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে যোগ দেন, পরে এলাহাবাদের হরিশচন্দ্র গবেষণা কেন্দ্রে। এখন তিনি বেঙ্গালুরুর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিয়োরেটিক্যাল সায়েন্সেসে (আইসিটিএস-টিআইএফআর) অধ্যাপক।
পুরস্কারের তালিকাও দীর্ঘ। পদ্মশ্রী (২০০১), পদ্মভূষণ (২০১৩), ২০১২ সালে প্রথম ‘ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স প্রাইজ’, ২০১৪ সালে ডিরাক পদক। এত সম্মানের পরেও তিনি নাকি আজও সাদামাটা অফিস আর চক-বোর্ডেই স্বচ্ছন্দ।

এবার প্রশ্ন, এত সম্মান কীসের জন্য? উত্তর খুঁজতে যেতে হবে স্ট্রিং থিওরির কাছে।
আধুনিক পদার্থবিদ্যা দাঁড়িয়ে আছে দুটি স্তম্ভের ওপর। একটি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা, যা গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সির মতো বিশাল জিনিসের আচরণ ব্যাখ্যা করে। অন্যটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, যা পরমাণু আর তার ভেতরের কণাদের জগতের নিয়ম বলে দেয়। দুটিই পরীক্ষায় বারবার সফল। আপনার মোবাইলের জিপিএস চলে আপেক্ষিকতার হিসেবে, আর কম্পিউটারের চিপ তৈরি হয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জোরে।

কিন্তু সমস্যা হল, দুই তত্ত্বকে একসঙ্গে মেলাতে গেলেই হিসেব গোলমাল হয়ে যায়, উত্তর আসে ‘অসীম’। ফুটবলের দুটো নিয়মের বই থাকলে যেমন কোনও মুহূর্তে একটি বলছে ‘ফাউল’, অন্যটি ‘গোল’, এও তেমনই। 
বৃহত্তর মহাজাগতিক ক্ষেত্রে অর্থাৎ গ্রহ, তারা, নীহারিকা, নীহারিকা পুঞ্জ ইত্যাদির আচার-আচরণ ব্যাখ্যা করতে আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি ছাড়া গতি নেই।
আবার যখন প্রচণ্ড ভারী জিনিস অতি ক্ষুদ্র জায়গায় ঠাসা থাকে, (যেমন কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে, কিংবা মহাবিস্ফোরণের প্রথম মুহূর্তে) পথ দেখাতে পারে একমাত্র কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা। 
অর্থাৎ সমস্যার সমাধানে দুই তত্ত্বকেই কাজে লাগে, অথচ দুই তত্ত্ব একমত হয় না। 
এই বিরোধ মেটানোই ছিল এতদিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

স্ট্রিং থিওরির প্রস্তাব খুব সরল। এক সময় ভাবা হতো, পদার্থের অনু অবিভাজ্য। তারপরে আবিষ্কৃত হলো অনুর ভেতরে রয়েছে পরমাণু। তারপর দেখা গেল পরমাণুর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রন প্রোটন এবং নিউট্রন। কিছুদিন পর্যন্ত সেগুলোকেই পদার্থের অন্তিম কণা বলে ধারণা ছিল। শেষে দেখা গেল প্রোটন, নিউট্রন কণাগুলোও আর মৌলিক নয়। সেগুলি আবার কোয়ার্ক নামক তিনটি করে কণার সমষ্টি!
এতদিন ধরে ধরা হত, ইলেকট্রন, কোয়ার্কের মতো মৌলিক কণাগুলো ডটের মতো বিন্দু, যাদের কোনও আকার নেই। 
কিন্তু স্ট্রিং থিওরি বলল, আসলে ওরা বিন্দু নয়, অতি ক্ষুদ্র শক্তির সুতো, কখনও খোলা, কখনও আংটির মতো বন্ধ।
গিটারের তার ভাবুন। একই তার কখনও ‘সা’, কখনও ‘পা’ বাজে, কেবল কীভাবে কাঁপছে তার ওপর নির্ভর করে। স্ট্রিং থিওরির সুতোও তেমন। একরকম কাঁপলে আমরা তাকে বলি ইলেকট্রন, অন্যরকম কাঁপলে ফোটন, আরেকরকমে কোয়ার্ক উৎপন্ন করছে। প্রকৃতির অজস্র রকম কণা আসলে একই সুতোর নানা সুর! গোটা মহাবিশ্ব যেন একটি অতিবিশাল অর্কেস্ট্রা, আর কণারা তার সুর।
এই সুতো কতটা ছোট? পরমাণুর কেন্দ্রকের চেয়েও অকল্পনীয় রকম ছোট। কোনও যন্ত্রে তাকে সরাসরি দেখা আজও সম্ভব নয়, সেটাই এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। তা নিয়ে একটু পরে বলছি।

এই তত্ত্বের সবচেয়ে চমকপ্রদ ফল এই যে, হিসেব কষলে দেখা যায় সুতোর একটি কম্পন-ধরন ঠিক সেই কণার মতো আচরণ করে, যাকে বলা হয় ‘গ্র্যাভিটন’, মহাকর্ষ বলের বাহক। অর্থাৎ মহাকর্ষকে আলাদা করে জুড়ে দিতে হয় না, সে সুতোর তত্ত্ব থেকে আপনিই বেরিয়ে আসে। অশোক সেনের স্টকহোম-বক্তৃতার শিরোনামের প্রথম অংশ ‘সুতো থেকে মহাকর্ষ’ ঠিক সেই কথাই বলে। দ্বিতীয় অংশ, ‘মহাকর্ষ থেকে সুতো’, উল্টো দিকের প্রশ্ন, মহাকর্ষের গভীরে ঢুকলে কি সুতোর গঠনই ধরা পড়ে?

তত্ত্বটি ঠিকঠাক চলতে হলে মহাবিশ্বে মাত্রা লাগে দশটি, আমাদের চেনা চারটি (তিনটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতার, একটি সময়ের) নয়। বাকি ছ’টি কোথায়? ধরে নেওয়া হয়, তারা এত ছোট করে কুঁচকে মুড়ে আছে যে আমরা টের পাই না। দূর থেকে একটা বাগান-পাইপকে মনে হয় শুধু একটা রেখা। কাছে গেলে দেখা যায়, তার গায়ে একটা পিঁপড়ে ঘুরে বেড়াতে পারে গোল পথেও। অর্থাৎ দূর থেকে এক মাত্রা, কাছ থেকে দুই। ক্লেইনের সেই পুরনো ভাবনাই এখানে অনেক বড় আকারে ফিরে এসেছে।

আশির দশকের মাঝামাঝি পদার্থবিদরা দেখলেন, স্ট্রিং থিওরি আছে একটি নয়, পাঁচটি আলাদা রূপে। পাঁচটিই গাণিতিকভাবে নিখুঁত, অথচ তারা আলাদা। কোনটি তবে ঠিক? এই ধাঁধার সমাধান এল নব্বইয়ের দশকে, যা ‘দ্বিতীয় সুপারস্ট্রিং বিপ্লব’ নামে পরিচিত। এই বিপ্লবে অশোক সেনের ভূমিকা প্রথম সারিতে।

তাঁর কাজের কেন্দ্রে ছিল ‘এস-ডুয়ালিটি’ নামে এক ধারণা। সহজ করে বললে, কোনও কোনও পরিস্থিতিতে এক ধরনের হিসেব এত জটিল যে সমাধান অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু একই ঘটনাকে ‘উল্টো চশমায়’ দেখলে সেই কঠিন হিসেবই সহজ হয়ে যায়। যেমন একটা ধাঁধা সামনে থেকে দুর্ভেদ্য, পিছন থেকে জলের মতো সরল। পদার্থবিদের ভাষায় একে বলে ‘শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া’ আর ‘দুর্বল মিথস্ক্রিয়া’র মধ্যে সমতা। সেন দেখালেন, এমন সমতা সত্যিই থাকতে পারে। তার ফলে বোঝা গেল, আপাতদৃষ্টিতে আলাদা তত্ত্বগুলো হয়তো একই মূল তত্ত্বের নানা মুখ। পরে এই সূত্রে ‘এম-থিয়োরি’ ধারণা উঠে আসে। পাঁচ তত্ত্বের এই ঐক্যের পথ খুলে দেওয়ায় সেনের অবদান ধরা হয় মৌলিক।

মহাবিশ্বে বর্তমান চারটি বল (force) - ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম, স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স, উইক নিউক্লিয়ার ফোর্স আর মহাকর্ষ বা গ্রাভিটি। এই চারটি বলের প্রথম তিনটির ব্যাখ্যা কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা দিয়ে করা যায়। কিন্তু চতুর্থ এবং সম্ভবত সবথেকে রহস্যময় মহাকর্ষ...তার ব্যাখ্যা করতে পারছিলেন না কোয়ান্টাম পদার্থ বিজ্ঞানীরা। 
এদিকে স্ট্রিং থিওরির সমর্থক বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করছিলেন মহাকর্ষের মূলে রয়েছে গ্র্যাভিটন নামে একটি কণিকা। সেটাও গাণিতিকভাবে প্রমাণ করল সেনের গবেষণা।

সেনের আরেকটি পরিচিত কাজ ‘স্ট্রিং ফিল্ড থিওরি’ নিয়ে। তাঁর নামে একটি অনুমান ‘সেন কনজেকচার’ নামেই পরিচিত। মোটামুটি ভাবে এটি বলে, অস্থির অবস্থায় থাকা কোনও সুতো-কাঠামো ঢালু পাহাড় থেকে গড়িয়ে নামা বলের মতো শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছয়, আর সেই অবস্থাটি কেমন, তাও হিসেব করে বলে দেওয়া যায়। গণিতের দিক থেকে এ এক কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ ফল।

তবু স্ট্রিং থিওরি নিয়ে বিতর্ক কম নয়। সবচেয়ে বড় আপত্তি হল, এই তত্ত্ব এখনও কোনও পরীক্ষায় সরাসরি প্রমাণিত হয়নি। সুতো এত ছোট যে আজকের কোনও যন্ত্র দিয়ে তা ধরা যায় না। সমালোচকেরা মনে করেন, বিজ্ঞান মানে পরীক্ষা, আর পরীক্ষায় যা ধরা পড়ে না, তা নিছক গণিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। নোবেল কমিটিও ঐতিহ্যগতভাবে পরীক্ষায় প্রমাণিত আবিষ্কারকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। 
কিন্তু গণিত যদি বলে - "কোনো পরিস্থিতির সম্ভাবনা আছে, তাহলে সেই জিনিসটি থাকতে বাধ্য!"
আইনস্টাইন তাঁর জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির গবেষণার সময় গণিতের হিসাবে দেখেছিলেন মহাবিশ্বে কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল থাকতে পারে। এছাড়াও দেখেছিলেন মহাবিশ্ব প্রসারণশীল হওয়ার একটি সম্ভাবনা। কিন্তু জিনিস দুটো তাঁর এতটাই অবাস্তব মনে হয়েছিল, তিনি নিজেই তাঁর সমীকরণে একটি অতিরিক্ত ধ্রুবক যোগ করে প্রসারণশীল মহাবিশ্বের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করেছিলেন। 
কিন্তু পরবর্তীকালে পাওয়েল এডউইন হাভেল প্রমাণ করে দিলেন মহাবিশ্ব সত্যিই প্রসারণশীল! আর প্রায় প্রতিটি বড় বড় নিহারিকার কেন্দ্রে রয়েছে একটি করে ব্ল্যাক হোল সেটাও এখন প্রমাণিত!

তাই স্ট্রিং থিওরির সমর্থকেরা বলেন, কোয়ান্টাম মহাকর্ষের প্রমাণ এখনই পরীক্ষাগারে পাওয়া যাবে না। তাঁদের মতে, স্ট্রিং থিওরি ইতোমধ্যেই কৃষ্ণগহ্বর, কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব এবং বিশুদ্ধ গণিতেও যে সব সমাধান দিয়েছে, তাতেই তার সত্যতা প্রমাণিত। আর ইতিহাসে এমন নজিরও আছে, যখন তত্ত্ব আগে এসেছে, প্রমাণ এসেছে বহু দশক পরে। কে ঠিক, সময়ই বলবে।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহার ঐতিহ্যের দেশে অশোক সেনের এই সাফল্য আবার মনে করিয়ে দিল, ভারতের মাটিতে বসেও বিশ্বমানের তাত্ত্বিক গবেষণা সম্ভব। স্টকহোমের মঞ্চে ভারতীয় পদার্থবিদ হিসেবে প্রথম এই পদক নেওয়া শুধু একজন মানুষের নয়, দেশের গবেষণা-সংস্কৃতিরও স্বীকৃতি। বিশেষত তরুণ গবেষকদের কাছে বার্তাটা স্পষ্ট। বড় প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বড় যন্ত্র সবসময় লাগে না, কখনও লাগে চক, ব্ল্যাকবোর্ড আর অদম্য কৌতূহল।
সুতোর তত্ত্ব শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হবে কি না, আজ কেউ জানেন না। তবে যে প্রশ্ন নিয়ে এই লড়াই, অর্থাৎ ‘দেশ আর কাল, বস্তু আর বল, সবই কি এক সুরে বাঁধা?’, তার উত্তরের খোঁজে অশোক সেনের কাজ যে অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়েছে, সে কথা মানছেন বিজ্ঞানী মহলের অনেকেই।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

কান্দি রেডক্রস সোসাইটি অরণ্য সপ্তাহ

বাংলা নিউজ পোর্টাল নয়া ঠাহর পুজো সংখ্যা প্রকাশ