তেভাগা আন্দোলন
*তেভাগা আন্দোলন*
সলিল চৌধুরীর 'হেই সামালো' গানে কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হারাণের নাতজামাই' গল্পে রয়েছে এর উল্লেখ।
১৯৪৬ সালে শুরু হয়ে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চলে বর্গা বা ভাগ-চাষীদের এই লড়াই মূলত হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে।
*মোট উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দুইভাগ পাবে চাষী, এক ভাগ জমির মালিক*
.......এই দাবি থেকেই তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত যা দুই বাংলার ১৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। নেতৃত্বে ছিল *কমিউনিস্ট পার্টি।*
স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে আন্দোলনের আঁচ পূর্ব বাংলায়, আর রয়ে যায় পশ্চিমবঙ্গে শুধু তাদের লেকচারে ।
তবে পূর্ববঙ্গের একটি হিন্দু প্রবণ এলাকা, নাচোলে সেই উত্তাপ থেকে যায় পরিণতিতে সেখানে শাসকদলের(মুসলিম) মদতে সংগঠিত হয় এক নৃশংস গণহত্যা !
পূর্বপাকিস্তানের রাজশাহী জেলার চাঁপাই-নবাবগঞ্জ সাবডিভিশনের একটি থানা হলো নাচোল। দেশভাগের আগে এই মহকুমাটি ছিলো মালদহ জেলার অন্তর্গত। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পরে সেটা পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার অন্তর্গত হয়। (বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাজশাহী ডিভিশনে একটি স্বতন্ত্র জেলা)। নাচোল থানার অধীনস্থ এলাকাগুলি ছিল অমুসলিম প্রধান। সেখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দা হয় সাঁওতাল নয়তো হিন্দু, যাদের মধ্যে প্রধান ছিল নমঃশূদ্র, ভুঁইদাস এবং কৈবর্ত সম্প্রদায়। আর এখানেই দ্বিতীয় দফায় জ্বলে উঠলো তেভাগা আন্দোলনের আগুন। নেতৃত্বে ছিলেন নাচোলের জমিদার গিন্নি, "ইলা মিত্র" , ভালবেসে সেখানকার চাষাভুষো মানুষগুলো বলতো, "নাচোলের রাণীমা"!
*মুসলিম লীগ প্রথম থেকেই এই আন্দোলনের বিরোধিতা করে আসছিল। পাকিস্তানে ক্ষমতায় এসে তারা কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে তেভাগা আন্দোলনকে বেআইনি ঘোষণা করে।*
ভূমিহীন চাষীদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পৈশাচিক বর্বরতা এবং বর্ণনাতীত নৃশংসতার ঘৃণ্য পথ বেছে নেয় তারা মুসলিম লীগ। ....চলে আন্দোলনের মাথাদের ধরপাকড়, হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক অত্যাচার।
৫ই জানুয়ারি, ১৯৫০।
পুলিশি অত্যাচার ও আটকের বিরুদ্ধে চণ্ডীপুর গ্রামের সাঁওতাল অধিবাসীরা নাচোল পুলিস স্টেশনের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। বিক্ষোভ হঠাতে তাদের ওপর হামলা চালায় *আনসার বাহিনী* , আর তাতেই বেধে যায় সংঘর্ষ। ঘটনাস্থলে নিহত হয় তিন পুলিশ কর্মী সহ দুই আনসার।
....লীগ সরকার ঠিক যেন এটারই অপেক্ষায় ছিলো। ঘটনার ঠিক দুদিন পর ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর প্রায় ২০০০ আধাসেনা নাচোল থানার দায়িত্ব নেয়। তাদের সাহায্য করতে আসরে নামে রাজাকার ও আনসার বাহিনী।
লীগ অনুগত আনসাররা আধাসামরিক বাহিনীর সহায়তায় ঐ থানার অধীনে থাকা ১২টি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম পুরোপুরি জ্বালিয়ে দেয়। সবচেয়ে বড়ো আঘাত আসে চন্ডীপুর গ্রামের ওপর । বসতবাড়ি ভস্মীভূত করার পাশাপাশি প্রশাসনের মদতে সেখানে চলে গ্রামের পুরুষদের নির্বিচারে খুন আর মহিলাদের যথেচ্ছ ধর্ষণ। নিহতের সংখ্যা তিনশোর কাছাকাছি, যারা সবাই ছিলো সাঁওতাল বা হিন্দু সম্প্রদায়ের।
*ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো আনসার বাহিনী খুঁজতে থাকে নেত্রী ইলা মিত্র ও তাঁর বিশ্বস্ত অনুগামীদের।*
ইলা মিত্রর ১৯২৫ সালের ১৮ই অক্টোবর কলকাতায় জন্ম। ইলার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন বৃটিশ সরকারের ডেপুটি অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। আদি নিবাস যশোরের বাগুটিয়া গ্রামে। বড় হয়ে ভর্তি হলেন বেথুন স্কুলে তারপর বেথুন কলেজে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলায় ছিলেন অসাধারণ। সাঁতার, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টন- সবেতেই ছিলেন সেরা।
প্রথম বাঙালি মেয়ে হিসেবে ১৯৪০ সালের জাপান অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেবার আর অলিম্পিকের আসরই বসলো না।
হয়তো বিধাতা পুরুষের ইচ্ছা ছিল অন্যরকম, তাই হিন্দু কোড বিলের বিরুদ্ধে কলকাতা মহিলা সমিতির সক্রিয় সদস্য হিসেবে আন্দোলন শুরু করে চলে এলেন রাজনীতিতে। আঠারো বছর বয়সেই হয়ে গেলেন কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যা।
১৯৪৫ সালে বিয়ে হয় রামেন্দ্র মিত্র,পূর্ব বাংলার নাচোলের জমিদার বংশের ছেলের সাথে। রমেন্দ্র জমিদার বংশের ছেলে হয়েও কম্যুনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
চিরুনী তল্লাশি এড়িয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে সমানে ডেরা বদলাতে থাকেন ইলা কিন্তু সামান্য ভুলে রোহণপুর রেলস্টেশনে দলবল সহ ধরা পড়ে যান। একে সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তার ওপরে হিন্দু, ফলে নারকীয় অত্যাচারের সম্মুখীন হলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের এই কন্যা ও বধূ। নাচোল থানায় তাঁকে গণধর্ষণের পাশাপাশি যৌনাঙ্গে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল গরম ডিম সেদ্ধ! হাত ও পায়ের পাতা ফুটো করে দেয়া হলো পেরেক দিয়ে। রাজশাহী আদালতে এবিষয়ে তাঁর জবানবন্দী শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় দুপারের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ।
রাজশাহী ও ঢাকা জেলে চারবছর বন্দী থাকার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। *অবশেষে দেশ ছাড়তে হবে এই শর্তে পাকিস্তান সরকার তাঁকে মুক্তি দেয়। ১৯৫৪ সালে সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসেন কলকাতা,* আর কোনদিনও পা রাখেননি তাঁর জন্মভূমি তথাকথিত সেই সোনার বাংলায়! ২০০২ সালে আজকের দিনে পরলোকগমন করেন দুই বাংলার প্রথমসারির এই কমিউনিস্ট নেত্রী!
ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হলেও মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে কমিউনিস্ট আন্দোলন চুড়ান্ত অসহায়, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদের কাছে হার মানলো মার্কসীয় দর্শন ! প্রায় ছয় দশক হলো বাংলাদেশ মুক্তি পেয়েছে পাকিস্তানী অপশাসনের হাত থেকে। চিত্রটা কিন্তু আজো বদলালো না...!
বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা মুসলমানদের কাছে হেরে গেছে। আর তারাই এই পশ্চিমবাংলায় ঢুকে মুসলমানদের মাথায় তুলেছে এবং পশ্চিমবাংলায় আবার সেই ইসলাম তন্ত্র জাগিয়ে তোলে। নিশ্চয়ই মনে আছে "অপারেশন বর্গা"!.... অপারেশন বর্গাতে কোন মুসলিমের জমি কাড়া হয়েছে শুনেছেন!.... অপারেশন বর্গা কাদের জন্য হয়েছিল? মুসলমানদের জমি পাইয়ে দেওয়ার জন্য এবং তা করেছিল সেই বাংলাদেশ থেকে উৎখাত হয়ে পালিয়ে আসা কমিউনিস্টরাই।
Comments
Post a Comment