বিজেপির দখলদার কমিটির অনভিজ্ঞতার ফলেই চোরবাগানে মৃত্যুমিছিল
দেবদূত ঘোষঠাকুর
পঞ্চমীর রাতে কয়েকজন পুজো পর্যটককে নিয়ে বেরিয়ে ছিলাম কলকাতার পুজো দেখাতে। সামনের গাড়িতে নীল বাতি লাগানো ছিল। তাই বড় পুজোমন্ডপগুলোতে ঢুকতে এতটুকুও বেগ পেতে হয়নি।
বাধা এল চোর বাগানে।
এক পুলিশ বন্ধু বলে দিয়েছিলেন, 'এবার সামাজিক মাধ্যমে যেমন 'হাইপ' উঠেছে তাতে চোরবাগানে তৃতীয়বার রাত থেকেই 'অনিয়ন্ত্রিত' ভিড় হচ্ছে। উত্তর কলকাতার পুজো দেখার তালিকায় একেবারে শেষে ওই পুজোটিকে রাখবেন।' তাই একেবারে শেষ পাতে ছিল চোরবাগান।
নাগের বাজার, বাগুইআটি, দমদম পার্কের ঘিঞ্জি এলাকা, কিংবা নলিন সরকার স্ট্রিট, চালতাবাগান, জোড়া বাগানে সমস্যা হল না। আটকে পড়লাম চোর বাগানে এসে। পেট্রোল পাম্পের পাশের যে গলিতে পুজো, তার মুখ এসে ঠেকেছে চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউয়ে। মূল কলকাতার বুকে, বিশেষ করে উত্তর কলকাতায় এত প্রশস্ত রাস্তা আর একটিও নেই।
নীল বাতি লাগানো গাড়ি দেখে এক পুলিশ কর্মী বললেন, 'গাড়ি রাখবেন কোথায়?' দেখলাম রাস্তার দুই দিকে ডাবল লাইনে দাঁড়িয়ে আছে সার সার গাড়ি। 'একটা কিছু হয়ে গেলে রক্ষা থাকবে না', বিড় বিড় করছিলেন ওই পুলিশ কর্মীটি। উনি এবার অনুরোধের সুরে বললেন, 'পুজো কর্তাদের ফোন নম্বর আছে?' আমাদের দলের পথপ্রদর্শক বললেন, আছে তো! ফোনে ধরলেন। বললেন, আসছি। খুব নাকি চাপ।
গাড়ি থেকে নেমে পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত গেলাম। দেখলাম গলির মুখে ভিড়টা আটকে আছে নড়তেই না। বেশ কয়েকটা পুজো প্রতিযোগিতার গাড়ি ঢুকে আর বেরোতে পারছে না। গলি সামনে-পিছনে আটকে গিয়েছে। গাড়ি, মানুষ সবাই বোতলবন্দি। কেউ কেউ ভিড় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। অন্যেরা সেই পথটাও দিচ্ছেন না। হলটা কী?
আধঘন্টার উপরে বারবার ফোন করে করে উদ্যোক্তাদের কাউকে আর না পেয়ে এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। আমাদের পিছনে পিছনে পুজো প্রতিযোগিতার নয়টি গাড়ির কনভয়। তখন ভোর হয়ে আসছে।
ষষ্ঠীর সকালে লালবাজারের ট্রাফিক কন্ট্রোলের এক চেনা অফিসারকে ফোন করলাম, 'তোমরা করছ কী বলো তো? মনে হচ্ছে একমাত্র চোরবাগানেই পুজো হচ্ছে।' সংবাদপত্রে কাজ করার সময় আমরা সারাবছর ট্রাফিক পুলিশকে গালাগাল দিতাম। কিন্তু পুজোর ভিড় সামলানোর কেরামতির জন্য পুজোর ম্যান অব দ্য ম্যাচ ঘোষণা করতাম পুলিশকে।
ওই 'বন্ধু' পুলিশ অফিসার বললেন, 'প্রথমত আমি আর পুরোনো ডিভিশনে আর নেই। কাজেই আপনার প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই। তবে আমার মতো ওই পুজোর 'আসল মালিক' ও আর সেই পুজোর সঙ্গে নেই। তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে,'। তিনি আমাকে কিছু বলেননি, এটা জানিয়ে ফোন রেখে দিলেন।
আর এখানেই পরিষ্কার হবে, বাংলায় জমানা বদলে যাওয়ার পরে কলকাতায় পুজো দখলের সঙ্গে কেন ওই ঘটনার সম্পর্ক উঠল। চোরবাগানে বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত পঞ্চমীর রাতে ছিল। আমরা যেমন ভুক্তভোগী, ভুক্তভোগী তেমন কলকাতা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত অফিসার আর কর্মীরা। পুজোর দিনগুলোতে ভিড় নিয়ন্ত্রণে ওই পুজো কমিটি কতটা দক্ষতা দেখাতে পারবে, সেটা পুলিশের সেদিনই বোঝা উচিত ছিল। সেইমতো পুজো কমিটিকে সতর্ক করে দিয়ে পারত তারা। পুজো কমিটি অপরাগ হলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারত পুলিশ।
এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে ভেবে একবার কিন্তু দেশপ্রিয় পার্কের পুজোয় দর্শনার্থী যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল এই কলকাতা পুলিশই।
১৯৯০ সালের মাঝামাঝি যখন পুজো নিয়ে খবরের কাগজে লেখালেখি শুরু করি, তখন দেখতাম দক্ষিণ কলকাতার বাবুবাগানের পুজো নিয়ে বিস্তর মাথাব্যথা ছিল পুলিশের। পুজোটা দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অধীনে। বড় রাস্তা কলকাতা পুলিশের। একটা সরু রাস্তা পিল পিল করে দর্শনার্থীরা ঢুকতেন। অন্য একটা সরু রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে আসতেন। বড় রাস্তা থেকে পুজোর দূরত্ব অন্তত ৫০০ মিটার। পুলিশ এই ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য পুরোপুরি পুজো কমিটির উপরে নির্ভর করত। পুজো কমিটির সম্পাদক অসিত মন্ডলের নেতৃত্বে থাকত এক বিশাল বাহিনী।
কী ভাবে ওই ভিড় সামলাতেন অসিত বাবুরা? অসিতদার কাছে গিয়ে তা শুনেছিলাম। পরে পুজোর সময়ে মিলিয়েও দেখেছিলাম।
কী সেই ব্যবস্থা?
ওই গলির ধারের বাড়ির দেওয়ালে, দোতলার বারান্দায়, পুজো কমিটির স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন থাকত। তাঁদের আবার সময় ভাগ করা থাকত। যাওয়ার পথে এবং ফেরার পথে বিপদ দেখলে ভিড়ের অভিমুখ কোনও বাড়ির দরজা খুলে অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হত। প্রয়োজনে দেওয়াল ভেঙে অস্থায়ী নির্গমন ব্যবস্থা থাকত। মন্ডপ থেকে বের হওয়ার অনেকগুলি রাস্তা রাখা হত। পুলিশকে এই ব্যবস্থার ডেমো (ডেমনস্ট্রেশন) দেখানো হত পুজোর সাতদিন আগে।
পরবর্তী সময়ে দেখেছি সরু গলির মধ্যে যে সব পুজো থাকে তাদের সবারই একটা করে নিজস্ব 'ক্রাউড কন্ট্রোল' এবং 'ইমার্জেন্সি' বাহিনী আছে। দ্বিতীয় স্তরে আছে ভাড়া করা নিরাপত্তা বাহিনী। তৃতীয় স্তরে পুলিশ। চোরবাগান সর্বজনীনেরও ছিল। অন্তত গত বছর পর্যন্ত। এবার যে সব ঠিকঠাক নেই তার আঁচ পঞ্চমীর শেষ রাতেই বোঝা গিয়েছিল।
কেন বলছি গত বছর পর্যন্ত ছিল, সেই প্রসঙ্গে এবার আসা যাক।
বছর ১৫-১৬ আগে থেকে শহরের বড় পুজোগুলো আসরে নামতে পয়লা বৈশাখ থেকে। খুঁটি পুজো সেরে। এ ভাবে বিশ্বকর্মাপুজো পর্যন্ত খুঁটিপুজো হতো। যে যেমন সময়ে করতে পারত। এ বার চোরবাগানে বিভ্রাটের শুরু ওই খুঁটি পুজো থেকেই। তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি যখন খুঁটি পুজো করে, তখনই তারা সংবাদের শিরোনামে এসেছিল। পিছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিশাল ছবি। হাতে আঁকা। তিনি পদ্মের কুঁড়ি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সামনে খুঁটি পোঁতা হল ধূমধাম করে। রাজ্যে তখন সবে পট পরিবর্তন হয়েছে। সবাই ভাবলেন তৃণমূলের অতি ঘনিষ্ঠ জয়ন্তবাবু কি শিবির বদল করলেন?
কিন্তু দেখা গেল, যেমনটা ভাবা হয়েছিল, তেমনটি নয়। জয়ন্তবাবুর এই রাতারাতি ভোল বদল ভালো চোখে দেখেনি স্থানীয় বিজেপি। ফলে একদিন পদত্যাগ করলেন জয়ন্তবাবু। পদত্যাগ করলেন কমিটির সব সদস্য । নতুন কমিটি হল। আগেকার খুঁটি তুলে তার গঙ্গাজলে শুদ্ধ করে ফের খুঁটি পুজো হল। ততদিনে জুলাই পেরিয়ে আগস্ট মাস। এই সময়ে বড় মন্ডপের অন্তত ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এ বছরের মন্ডপ তৈরির কাজ শুরুও হয়ে গিয়েছিল। সব বন্ধ হয়ে গেল। বিখ্যাত এক শিল্পীর সঙ্গে চুক্তি করল নতুন কমিটি। সেখানে স্থানীয় বিধায়ক রয়েছেন মাথায়। অধিকারী পদবীর এক জন আছেন। পাড়ার লোকেদের মুখে শুনেছি , তিনি নাকি মুখ্যমন্ত্রীর আত্মীয়। ভাইপো। জেলা সভাপতি রয়েছেন। আর রয়েছেন ছোটবড় বিজেপি নেতারা।
শিল্পী কাজ শুরু করলেন। লোহার খাঁচা। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা। রয়েছে পাকদন্ডি। বছর দশেক আগে হল কলকাতা শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় এমন মন্ডপ করতেই দিত না। ‘সনাতনী’ সরকারের প্রথম পুজো। পুলিশ তাই হয়তো দেখেও দেখেনি।
দমকলের এক পূর্বতন কর্তা বলেছেন, মন্ডপের মধ্যে যদি শর্ট সার্কিট অথবা অন্য ধরনের বিভ্রাটে দুর্ঘটনা হয়, তাহলে বহু মানুষের মৃত্যু হতে পারত। তিনি বলেন, পুলিশের উচিত ভিতরে অন্ধকার, পাকদন্ডি দিয়ে উপরে ওঠা এই সব নকশায় থাকলেই তার অনুমোদন খারিজ করা হোক। ওই মন্ডপের ঢোকা বেরোনোর একাধিক রাস্তা ছিল কিনা, মানুষকে শান্ত না থাকতে বলে, অনভিজ্ঞ কেউ বিপদ ঘন্টা বাজিয়েছিলেন কি না সেসব তদন্তে উঠে আসবে আশাকরি। তবে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী, জরুরি পরিষেবা বাহিনী যে ছিল না, তা ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে।
তবে পাড়ার লোকে বলছেন, 'জয়ন্তবাবু আর ওঁর মেয়ে পুজোটাকে বুক দিয়ে সামলাতেন। ওঁরা থাকলে এমনটা কখনই ঘটত না। অনভিজ্ঞ কমিটির এবারটা ছোটো পুজো পুজো করা উচিত ছিল। সব বুঝে নেওয়া দরকার ছিল।'
কিন্তু প্রশ্ন হল, মানুষের জীবন নিয়ে যারা খেলল, তাদের কি শনাক্ত করা হবে? নেহাত দুর্ঘটনার তত্ব খারিজ করে সাজা দিতে পারবে রাজ্য প্রশাসন? পারলে সেটাই হবে এই শহরের মানুষের পুজোর সেরা উপহার।
সত্য ও নির্ভরযোগ্য সংবাদের উৎস। আমরা প্রতিদিন আপনাদের কাছে পৌঁছে দিই দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব খবর।
Comments
Post a Comment