শিক্ষক আছেন ,সম্মানী নেই বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষক আছেন, সম্মানী নেই বিশ্ববিদ্যালয়ে

(একদিকে মহালয়ার অনুষ্ঠানে ১২৮ কোটি বরাদ্দ, অন্যদিকে অতিথি শিক্ষকের সাম্মানিক আটকে যাওয়ায় বিপাকে বিশ্ববিদ্যালয়।)

দেবদূত ঘোষঠাকুর 

(মহালয়ার একদিনের অনুষ্ঠানে বিপুল বরাদ্দ, অথচ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি শিক্ষকদের সাম্মানিক আটকে। কোথাও স্থায়ী শিক্ষক কম, কোথাও নির্দিষ্ট বিষয়ে অতিথি শিক্ষক ছাড়া পঠনপাঠন চালানো কঠিন। আবার একটি বিষয়ে একজন ছাত্রের জন্য চার জন অতিথি শিক্ষক রাখার প্রশ্নেও উঠছে ব্যয়ের যুক্তি। নন–স্যালারি গ্র্যান্টের টাকা থেকেই মেলে শিক্ষকের সাম্মানিক, পরীক্ষা, বিদ্যুৎ এবং প্রশাসনিক খরচ। সেই টাকা না এলে সঞ্চিত অর্থ ভেঙে চলতে হয়। প্রশ্ন, শিক্ষার এই প্রয়োজনীয় খরচ কি সত্যিই এতটাই গৌণ, নাকি কোথাও অগ্রাধিকারের হিসেব বদলে যাচ্ছে সরকারি অর্থের ব্যবহারে?)।

একদিকে, শুধু একদিনের অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ১২৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে, বিকাশ ভবন নন–স্যালারি গ্র্যান্টের টাকা না ছাড়ায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অতিথি অধ্যাপকদের সাম্মানিক আটকে গিয়েছে। রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের সদর বিকাশ ভবন জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’। এই বিষয়ে একটি প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিকাশ ভবনের হিসেব মতো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বিকভাবে ছাত্রের থেকে শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। সেক্ষেত্রে অতিথি শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? সম্প্রতি রাজ্য বিধানসভায় উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয় বিল নিয়ে আলোচনায় তো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের তুলনায় শিক্ষক অনেক বিষয়ের ক্ষেত্রেই বেশি বলে পরিসংখ্যান দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি একথাও বলেছেন যে, কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য শুধু স্থায়ী। বাকি সব শিক্ষক অতিথি। অফিসার ও অন্য শিক্ষা কর্মীরা চুক্তিভিত্তিক। পেশ করা বিলের সপক্ষে মন্ত্রীর যুক্তি, অতিরিক্ত জায়গা থেকে স্থায়ী শিক্ষকবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বদলি করে দিলে সমতা ফিরবে। অতিথি শিক্ষকের আর দরকার হবে না। অর্থাৎ রাজ্যের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় যে অতিথি শিক্ষক নির্ভর, সেই বাস্তবতাও মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে। ওই অতিথি শিক্ষকেরা তাই ‘অপ্রয়োজনীয়’ নন, সেটাও পরিষ্কার হয়েছে মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে। মন্ত্রী জানেন কিন্তু তাঁর দপ্তর কিংবা অর্থ দপ্তর জানে না, তা তো হতে পারে না।
ওই সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মুহূর্তে শুধু স্নাতকোত্তর পঠনপাঠন হয়। ওই শিক্ষকদের সাম্মানিক না দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে ‘কাজ’ আদায় করার মানে ওই শিক্ষকদের অপমান করা। এখন দেখা যাক, রাজ্যের ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন পুরোপুরি অতিথি শিক্ষকদের উপরে নির্ভরশীল? বিকাশ ভবন বলছে সংখ্যাটি নয়। সাধু রামচাঁদ মুর্মু বিশ্ববিদ্যালয় (ঝাড়গ্রাম), মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় (মহিষাদল, পূর্ব মেদিনীপুর), হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় (হাওড়া), হরিচাঁদ গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় (চাঁদপাড়া, উত্তর ২৪ পরগনা), কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয় (কৃষ্ণনগর, নদিয়া), দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ব বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়,(বোলপুর), দার্জিলিং হিলস ইউনিভার্সিটি ও রানি রাসমণি গ্রিন ইউনিভার্সিটি (তারকেশ্বর, হুগলি)। তালিকাটা ছোট নয়। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা যে এক, তা নয়। কোথাও স্থায়ী শিক্ষক কম, কোথাও আবার নির্দিষ্ট বিষয় চালাতে অতিথি শিক্ষক দরকার। আবার কোথাও নতুন বিষয় খোলার পরে ছাত্রসংখ্যা কম থাকায় শিক্ষক রাখার প্রয়োজন নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তাই সমস্যাটার দুটো দিকই দেখা দরকার। অতিথি শিক্ষক যেখানে দরকার, সেখানে তাঁদের সাম্মানিক দিতে হবে। আবার যেখানে একটি বিষয়ের ছাত্রসংখ্যা নগণ্য, সেখানে সেই বিষয় চালু রাখার যৌক্তিকতাও ভেবে দেখা দরকার। কিন্তু একটি বিষয় চালু রেখে তার শিক্ষককে সাম্মানিক না দেওয়া কোনও সমাধান হতে পারে না।
বিকাশ ভবনের এক কর্তা সেদিন কথায় কথায় বলছিলেন, ‘নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরোয় এমন অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এমন সব বিষয় খুলেছে যেখানে এক জন ছাত্র। তাঁর জন্য চার জন অতিথি শিক্ষক। এই ভাবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি এমন এমন করতে থাকে তাহলে সামাল দেওয়া কষ্টের। সমস্যা কেবল বাড়তেই থাকবে।’ উত্তরবঙ্গের এমনই এক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আধিকারিক বলেন, ‘আমরা তো নিজের ইচ্ছেমতো কোনও বিষয় নির্বাচন করি না। উচ্চশিক্ষা দপ্তরের সবুজ সঙ্কেত পেলে তবেই কোনও নতুন বিষয় খোলা যায়। ওই বিষয়ে একজন ছাত্র ভর্তি হলেও তাঁকে পড়ার সব রকম পরিকাঠামো দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ের শিক্ষক দিতে হবে। এ নিয়ে কেউ ইউজিসি কাছে অভিযোগ জানালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পর্যন্ত বাতিল হয়ে যেতে পারে।’ কথাটা খুব অযৌক্তিকও নয়। একটি বিষয় চালু করার পর ছাত্রসংখ্যা কম হলেই শিক্ষক বাদ দেওয়া যায় না। পঠনপাঠনের মান বজায় রাখার দায়ও থাকে। আবার বছরের পর বছর কোনও বিষয়ে ছাত্র না বাড়লে সেই বিষয় চালু রাখার সিদ্ধান্তও নতুন করে খতিয়ে দেখা দরকার। নতুন বিষয় খোলা, ছাত্র ভর্তি নেওয়া এবং শিক্ষক দেওয়ার সিদ্ধান্ত যদি উচ্চশিক্ষা দপ্তরের অনুমোদনের সঙ্গে হয়, তা হলে তার আর্থিক দায়ের হিসেবও শুরুতেই থাকা দরকার। পরে টাকা না দিয়ে সমস্যা তৈরি করলে তার খেসারত শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়কেই দিতে হয়।
অতিথি শিক্ষকদের নিয়োগের যোগ্যতা কিন্তু স্থায়ীভাবে নিযুক্ত শিক্ষক বা চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের মতোই। বিকাশ ভবন জানাচ্ছে, তাঁদের নেট উত্তীর্ণ হতে হবে কিংবা পিএইচডি ডিগ্রি থাকতে হবে। কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অথবা পেশাগত যোগ্যতা থাকা ব্যক্তি, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতাও যথাযথ থাকতে হবে, নিযুক্ত হতে পারেন, প্রফেসর অন প্র্যাকটিস হিসাবেও। এঁরা রিসোর্স পার্সন, অর্থাৎ জ্ঞানের ভান্ডার। রাজ্যের বড় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ অধ্যাপকের কথায়, ‘এই সব রিসোর্স পার্সনরা যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অলঙ্কার। প্রশাসনের ব্যক্তিগত আন্তরিক আবেদনের ভিত্তিতেই পঠনপাঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁরা যুক্ত হন। তাঁদের কাছে অর্থমূল্য গৌণ। তাঁদের ট্রেনে, বাসে চেপে আসতে বলা যায় কি? বাহনের ব্যবস্থা করতে হয়। এটুকু সম্মান পাওয়ার যোগ্য কি তাঁরা নন?’ স্থায়ী শিক্ষকবিহীন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের একটি বিষয়ে অশীতিপর এমন এক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক পড়াতে যান, বর্তমান উপাচার্যদের অনেকেই তাঁর ছাত্র। জুলাই মাস থেকে এই ধরনের শিক্ষকদের পারিশ্রমিক পর্যন্ত ছাড়পত্র পায়নি। শুধু অতিথি শিক্ষক, রিসোর্স পার্সনরাই ঠিক সময়ে সাম্মানিক পাচ্ছেন না। উপাচার্যরাও অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী। বিকাশ ভবনের একটি সূত্রের মন্তব্য, ‘এই ধরনের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বেতন পর্যন্ত সময়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি তাঁদের জানাতে হচ্ছে বিকাশ ভবনের উচ্চশিক্ষা দফতরে। এটাও লজ্জার।’ 
বিকাশ ভবন ঠিক সময়ে নন–স্যালারি গ্র্যান্টের টাকা না পাঠালে কি হয়? বেশ কিছুদিন অস্থায়ী ভাবে এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকা এক অধ্যাপক বলেন, ‘অতিথি অধ্যাপকদের সাম্মানিক, পরীক্ষা সংক্রান্ত ব্যয়, বিদ্যুতের বিল, অফিস পরিচালনার খরচ, উপাচার্যের সরকারি গাড়ির জ্বালানি সহ নানা প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো হয় ওই গ্র্যান্টের টাকা থেকে।’ ওই টাকা বন্ধ হলে কি হবে? ওই অধ্যাপক বললেন, ‘যদি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও সঞ্চিত টাকা থাকে সেটা ভেঙে সামাল দিতে হবে। যতক্ষণ টাকা থাকবে সাম্মানিক পাবেন শিক্ষকেরা। তারপর বিকাশ ভবনের কৃপার উপরে হা পিত্যেশ করে বসে থাকতে হবে।’
দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি আর্থিক বছরে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দপ্তর থেকে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা নন–স্যালারি গ্র্যান্ট হিসেবে পেয়ে থাকে। কোনও স্থায়ী শিক্ষক না পাওয়া মোট নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ধরলে বছরে এই খাতে রাজ্য সরকারের বছরে খরচ ৫ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ মহালয়ার দিন রাজ্য সরকার যে টাকাটা বরাদ্দ করেছে তা দিয়ে ওই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বছরের খরচ মিটে যেত। এবার মহালয়ায় কলকাতার ইডেন গার্ডেন্স সহ বিভিন্ন জেলায় মা দুর্গার আবাহন উৎসব হবে। অথচ শিক্ষকদের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পড়িয়েও পারিশ্রমিক পাবেন না। একটা বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে টাকা লাগে, এটা নতুন কথা নয়। প্রশ্ন হল, সেই টাকাটা কোন খাতে কতটা সময়ে পৌঁছচ্ছে। একদিকে উৎসবের জন্য বিপুল বরাদ্দ করা যাচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর টাকা আটকে থাকছে। অতিথি অধ্যাপক ক্লাস নেবেন, পরীক্ষা হবে, বিদ্যুতের বিল দিতে হবে, অফিস চালাতে হবে। অথচ সেই কাজের জন্য বরাদ্দ টাকা না এলে সঞ্চিত অর্থ ভেঙে কত দিন চলবে? শিক্ষার প্রয়োজনীয় খরচকে যদি অপ্রয়োজনীয় বলে ধরা না হয়, তবে তার সাম্মানিক সময়মতো দেওয়াই স্বাভাবিক। গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার এই অবস্থা দেখলে আর এক বার হয়তো বলে বসতেন, ‘কী আশ্চর্য এই দেশ’।
(লেখক সাংবাদিক):

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

কান্দি রেডক্রস সোসাইটি অরণ্য সপ্তাহ

কান্দিতে বাঙালি সংস্কৃতি ইতুর খন্ড চিত্র