নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন শেষ বেলায় জ্বলে উঠে

নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন, 
শেষ বেলায় উঠলেন জ্বলে

দেবদূত ঘোষঠাকুর 

এই তো সেদিন, মাস তিন মাস আগে।  একটি অনুষ্ঠানে দিব্যি গাইলেন তিনখানি রবীন্দ্রসঙ্গীত। মনে হল যেন ৪৬ বছর আগেকার সেই বিভা সেনগুপ্তই গাইছেন। কে বলবে বয়স ৯৪!
মঞ্চ থেকে নেমে আসার পরে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলাম, এই বয়সে এমন দম, গলায় এমন কাজ কি করে পারলেন? হেসে বললেন, 'একটু বোসো। একটু গল্প করি।'
দিনটা ছিল ২৬ জুন , ২০২৬। সকাল থেকে প্রবল ব‌ষ্টি। মাঠে মঞ্চ বেঁধে অনুষ্ঠান হবে। মাঠে জলে ভরে থাকবে কী না সন্দেহ ছিল। গিয়ে দেখলাম কথার উপরে কাঠ ফেল। তাঁর উপরে প্লাস্টিকের পা বসে যাচ্ছে। অনেকে দেখলাম টলমল করতে করতে স্টেজের দিকে যাচ্ছেন। ভারসাম্য রাখা যাচ্ছে না। আমি বিভা সেনগুপ্তর গান শুনতে গিয়েছিলাম। অন্য একটা তাগিদ ছিল। সেটা তখন গৌন‌। চিন্তা হচ্ছিল বিভা দি ঠিকমতো মঞ্চে উঠতে পারবেন তো? যা বৃষ্টি হয়ে গেল, আসবেন তো উনি? রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার সুযোগ পেলে উনি যাবেন ই। সেই কবে শুনেছিলাম। আজ ও সেটা হলো। একজন হাত ধরলেন। তার পরে পায়ের নীচের কাদার বাঁধাকে হেলায় হারিয়ে উঠলেন গিয়ে মঞ্চে। 
 সংবর্ধনা দেওয়ার পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, 'একটা গান হবে তো?' জবাব এল,' হারমোনিয়াম কোথায়?' আহা!  
মঞ্চে ওঠার আগেও বসেছিলেন আমার পাশে। বলা ভালো আমিই উঠে গিয়ে বসে ছিলাম ওঁর পাশটি তে। আমি ওঁর গান শুনেছি যতীন বাগচী রোডের বাড়ি গিয়ে। সেটা সত্তর দশকের শেষাশেষি। বাড়ি গিয়ে। আমার এক বান্ধবীর সূত্রে। 
ওঁর বড়দার ছোটো মেয়ে সুপ্রিয়া ওঁদের টুনু আমার রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের সহপাঠিনী। আদতে ত্রিপুরার মেয়ে সুপ্রিয়া কলকাতায় শারীরবিদ্যা নিয়ে এমএসসি পড়তে এসেছিল। থাকত বিবেকানন্দ রোডের হস্টেলে। মাঝে মাঝে গিয়ে থেকে আসত যতীন বাগচী রোডের কাকার বাড়িতে। বিভা সেনগুপ্ত তখন বোধহয় থাকতেন সেখানেই। 
আমাদের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল। গান, নাটক, বিতর্ক সভা-এসব লেগেই থাকত। তারপর ছিল বার্ষিক পুনর্মিলন উৎসব। কোনও একটা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। হিস্টোলজি ল্যাবোরেটরি থেকে পরিষ্কার উচ্চারণ আর সঠিক সুরের একটা গান ভেসে এল, আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে। ফিদা হয়ে গেলাম। 
কে গাইছে রে? এ তো আগরতলা থেকে কলকাতায় পড়তে আসা এসএফআই করা মেয়েটা। 'তুই এতো ভালো গাইতে পারিস! গান শিখিস?' আগরতলা থেকে আসা নুপুর (সদ্য প্রয়াত নুপুর বণিক) বলল, 'শেখে তো'। ভিড় থেকে মুখ তুললো নন্দিতা (নন্দিতা পোদ্দার)। গানের প্রতিযোগিতায় 'ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি, কে আমারে' গেয়ে ও প্রথম হয়েছিল। আমার সঙ্গে খোল বাজিয়েছিলাম। নন্দিতাই বলল, 'সুপ্রিয়ার পিসিল কলকাতায় থাকেন। দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্রী। বিভা সেনগুপ্ত।' তখনই ঠিক করেছিলাম একবার সুপ্রিয়ার ওই পিসির কাছে যেতেই হবে।
এক বিকেলে সুপ্রিয়া র সঙ্গে ওই বাড়িতে গিয়ে শুনে এসেছিলাম তাঁর গান। জর্জ (দেবব্রত) বিশ্বাস তখনও বেঁচে। যতীন বাগচী রোডের কাছেই থাকতেন তিনি।  বিভা দি অর্থাৎ সুপ্রিয়া র পিসি সেখানে যেতেন নিয়মিত। অসুস্থ জর্জ দা কে গান শোনাতে। একদিন ওঁর সঙ্গে যাবো বললেও আর যাওয়া হয়নি। অসুস্থ জর্জ বিশ্বাস পরের বছরেই চলে গেলেন। 
আমরা সবাই কে কোথায় ছিটকে গেলাম। এই সেদিন পর্যন্ত সুপ্রিয়ার সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। গত দুই বছর হল ও ফোন ধরেনা। ওয়াটস্যাপ নিষ্ক্রিয়। 
এ বছরের জুন মাসের ওই অনুষ্ঠানে ফের বিভা সেনগুপ্তর সঙ্গে দেখা হল। পরিচয় দিতেই মুখটা শুকনো হয়ে গেল ওঁর। বললেন, 'জানো তো হাজবেন্ড মারা যাওয়ার পর থেকে টুনু খুব কষ্টে আছে। আমি তোমার কথা বলব। রাতেই ফোনে কথা হবে।' সুপ্রিয়া ও খুব ভালো গাইত। গান যাঁর সঙ্গী, সে কেন এমন দুঃখে থাকবে! কেন সবার থেকে নিজেকে এমন গুটিয়ে নেবে।! ওঁর পিসিও কোনও দিন প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। মায়া সেন, দেবব্রত বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথের গান আর ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বেশ ছিলেন।
হারমোনিয়াম নিয়ে পর পর দুটি গান গাইলেন বিভা দি। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ। বললেন, 'আর একটি গান গাইবো।' এর পরে ধরলেন কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি'। সেই জর্জ বিশ্বাস ঘরানা। গায়ে যেন কাঁটা দিল। 
এত দিনের পরিচয় না থাকলে বিশ্বাসই করতাম না যে ওঁর বয়স এখন ৯৪! 
ওঁকে বললাম, 'আপনি এ ভাবেই গাইতে থাকুন।' উনি হাসলেন, 'রোজ রেওয়াজ করার চেষ্টা করি। শরীরটা মাঝে মাঝে গোলমাল করে।'' গাড়িতে ওঠার আগে বলে গেলেন, 'টুনু এলে ওকে বলব তোমায় ফোন করতে। আমদের বাড়িতে এসো কিন্তু! অনেক গান হবে। টুনু গাইবে। আমিও পারলে গাইবো।' 
টুনুর ফোন আসার আগে উনিই চলে গেলেন ঘুমের দেশে।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

কান্দি রেডক্রস সোসাইটি অরণ্য সপ্তাহ

কান্দিতে বাঙালি সংস্কৃতি ইতুর খন্ড চিত্র