বিশ্ব হিরো ক্যাপ্টেন স্মিত
গ্লোবাল হিরো
ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছার
~সমুজ্জ্বল
মুম্বইয়ের ঘাটকোপার। এক চিলতে ব্যালকনি।
আকাশে তখন মেঘেদের লুকোচুরি। বাবার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বারো বছরের ছেলেটা জিজ্ঞেস করেছিল, "মেঘের দেশে বাতাস কতটা ঠাণ্ডা হয় বাবা?"
বাবা ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, "স্বপ্ন যদি খাঁটি হয় রে স্মিত, আকাশের কোনো ঝড় তোকে থামাতে পারবে না।"
ছেলের জেদ সত্যি হয়েছিল। ম্যানেজমেন্টের নিশ্চিত, নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছেড়ে স্মিত বেছে নিয়েছিলেন বোয়িং-এর ককপিট। দীর্ঘ এগারোটি বছর ভারতীয় আকাশে ঝড়ের মুখে ডানা মেলেছেন তিনি। দিল্লির বুক কাঁপানো কুয়াশা, শ্রীনগরের বরফঢাকা রানওয়ে—প্রতিটি মুহূর্ত তাঁকে চিনিয়েছিল জীবনের দাম। জুনিয়রদের তিনি প্রায়ই বলতেন—"ককপিটে বসলে নিজের প্রাণ বলে কিছু থাকে না। তোর পেছনের দরজার ওপারে বসা প্রতিটা মানুষের নিঃশ্বাস তোর নিজের নিঃশ্বাসের চেয়ে দামি। এই চারটে সোনালি স্ট্রাইপ চাকরির অহংকার নয়, ওটা ১৭৪টি পরিবারের পবিত্র আমানত।"
সাড়ে ছয় হাজার ঘণ্টার অভিজ্ঞতার সেই খাঁটি মানুষটি যখন ফ্লাইদুবাইয়ের সম্মানিত ক্যাপ্টেন হলেন, মরুশহরে বসেও তিনি ছিলেন সেই ঘাটকোপারের চেনা ছেলেটি। ককপিট ছিল তাঁর পরম উপাসনালয়।
কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য এমন এক পরীক্ষা সাজিয়ে রেখেছিল, যার কোনো পাঠ্যবই হয় না।
২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। ফ্লাইট FZ1073।
মাটি থেকে চৌত্রিশ হাজার ফুট ওপরে সৌদি আরবের আকাশ চিরে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স এগোচ্ছে তেল আভিভের দিকে। পেছনের কেবিনে ১৭৪টি নিশ্চিন্ত প্রাণ। মা ঘুমন্ত সন্তানের গায়ে চাদর টেনে দিচ্ছেন। জানলার পাশে বৃদ্ধ দম্পতি হাত ধরে বসে। ককপিটে তখন অটো-পাইলটের মৃদু গুঞ্জন আর নীলচে স্ক্রিনের শান্ত আলো।
হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা চিরে উঠল এক হিংস্র শ্বাপদ গর্জন!
স্মিত মুখ ঘুরিয়ে তাকানোর সময়টুকুও পেলেন না। পাশের আসনে বসা কো-পাইলটের চোখজোড়ায় এক অন্ধ উন্মাদনা। কোনো কথা নয়, কোনো দাবি নয়—মুঠোয় লুকিয়ে রাখা ধারালো ইস্পাতের ছুরি সোজা নেমে এল স্মিতের ঘাড় আর কলারবোনের সন্ধিস্থলে!
তীক্ষ্ণ ধাতু চামড়া আর মাংস কেটে গভীরে ঢুকল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এসে এক লহমায় লাল করে দিল স্মিতের দুধসাদা শার্ট, কাঁধের সোনালি স্ট্রাইপ।
চরম যন্ত্রণায় শরীর দুমড়ে যেতে চাইল। যে কোনো সাধারণ মানুষ হলে এই মারণাঘাতে নিজের ক্ষত চেপে ধরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ত। কিন্তু স্মিতের স্নায়ু নিজের কথা ভাবেনি। চোখের সামনে এক লহমায় ভেসে উঠল পেছনের কেবিনের সেই ঘুমন্ত শিশুটি, জানলার পাশে বসে থাকা পরিবারগুলো—১৭৪টি প্রাণ!
ঘাতক তখন উন্মাদ। অটো-পাইলট ডিসকানেক্ট করে নিজের সমস্ত শরীরের ওজন দিয়ে সামনের দিকে চেপে ধরল কন্ট্রোল কলাম। উদ্দেশ্য একটাই—বিমানের নাক খাড়া মাটির দিকে নামিয়ে এক আত্মঘাতী নরক তৈরি করা!
বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উল্কার গতিতে আছড়ে পড়তে লাগল।
মাত্র দুই মিনিটে চৌত্রিশ হাজার ফুট থেকে বিমানটি খসে পড়ল সতেরো হাজার ফুটে। বিশ হাজার ফুটের এক অন্ধ, সর্বনাশা ফ্রি-ফল!
চরম অভিকর্ষজ টানে বিমানের ধাতব কাঠামো মড়মড় করে কেঁপে উঠল। কেবিনের আলো নিভে জ্বলে উঠল নিয়ন লাল বাতি। ওভারহেড বিনের লক ছিটকে খুলে ভারী স্যুটকেস আছড়ে পড়তে লাগল যাত্রীদের গায়ে। শূন্য অভিকর্ষে সিটবেল্টহীন মানুষ ছিটকে ধাক্কা খেলেন সিলিংয়ে। ছাদ থেকে খটাখট শব্দে নেমে এল হলুদ অক্সিজেন মাস্ক। ককপিটের ড্যাশবোর্ডে কান ফাটানো অ্যালার্ম—“Terrain! Pull Up! Whoop Whoop!” কেবিন জুড়ে তখন শিশুদের আর্তনাদ আর মানুষের শেষ মোনাজাত—মৃত্যু যেন জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে হাসছে!
আর ককপিটের ভেতরে তখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক একা মানুষ।
বাতাসের ঘর্ষণে কাঁপছে বিমান। ক্ষতবিক্ষত ঘাড় বেয়ে রক্ত স্প্রে-র মতো ছড়িয়ে পড়ছে থ্রটল লিভার আর ড্যাশবোর্ডের স্ক্রিনের ওপর। তীব্র জি-ফোর্সের চাপে বুকের পাঁজর যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা নিঃশ্বাসে ফুসফুসে বাতাস নয়, ফুটন্ত লাভা ঢুকছে। আততায়ী তখন স্মিতের রক্তাক্ত মুখের ওপর নির্বিচারে আঘাত হানছে, বুকে দ্বিতীয়বার ছুরি চালাতে চাইছে।
কিন্তু স্মিত নিজের ক্ষতে হাত দিলেন না। নিজের রক্ত থামানোর এক মুহূর্ত চেষ্টাও করলেন না।
কারণ অবশ হয়ে আসা স্নায়ু জানত—নিজের ক্ষতে হাত দেওয়া মানে কন্ট্রোল ছেড়ে দেওয়া, আর কন্ট্রোল ছেড়ে দেওয়া মানে ১৭৪টি তাজা প্রাণ মাটিতে পিষে ছাই হয়ে যাওয়া!
তিনি নিজের জীবনের জন্য লড়ছিলেন না; তিনি লড়ছিলেন ওই ঘুমন্ত শিশুটির জন্য, ওই পরিবারগুলোর জন্য।
রক্তে পিচ্ছিল থ্রটল লিভার বাঁ হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে গায়ের শেষ শক্তিতে ইঞ্জিন বাঁচিয়ে রাখলেন। ডান হাত বাড়িয়ে লড়তে লাগলেন উন্মত্ত ঘাতকের সেই পৈশাচিক শক্তির বিরুদ্ধে। রক্তক্ষরণে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, শরীর বলছে—স্মিত, ছেড়ে দাও... রক্ত শেষ হয়ে গেছে... কিন্তু স্মিতের মন গর্জে উঠল—না! আমি মরার আগে এদের মরতে দেব না!
স্মিত বুঝলেন, একা এই শক্তিতে আর বেশিক্ষণ টেকা যাবে না। সাহায্য পেছনের কেবিন থেকে আনতেই হবে। কিন্তু ৯/১১-এর পর তৈরি আর্মার্ড ককপিটের দরজা বাইরে থেকে গ্রেনেড দিয়েও ওড়ানো যায় না!
নিজের শরীরের শেষ বিন্দু শক্তি আর চেতনাকে টেনে আনলেন স্মিত। নিজেকে বাঁচানোর কোনো তাগিদ নেই, শুধু মাথায় একটাই সংকল্প—দরজাটা খুলতেই হবে! অবশ হয়ে আসা ডান হাতটা রক্তমাখা ড্যাশবোর্ডের ওপর দিয়ে টেনে টেনে নিয়ে গেলেন। সেই অসাড় হতে থাকা আঙুল দিয়ে তিনি আঘাতের মতো করে চেপে দিলেন ককপিট ডোরের জরুরি রিলিজ সুইচ—সবুজ বাতি জ্বলে উঠে এক ভারী ধাতব শব্দে আনলক হলো সেই দুর্ভেদ্য দরজা!
এখানেই থামলেন না। মৃত্যুর হিমেল কুয়াশা যখন তাঁর মস্তিষ্ককে গ্রাস করে ফেলছে, সেই অন্তিম সেকেন্ডে কাঁপতে থাকা রক্তমাখা আঙুল ছুঁইয়ে ট্রান্সপন্ডারে সেট করে দিলেন আন্তর্জাতিক হাইজ্যাক কোড—৭৫০০!
মাটিতে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের রাডার স্ক্রিনে জ্বলে উঠল রক্তের মতো লাল সতর্কতা।
এদিকে দরজার লক খোলার শব্দ পেতেই বিমানে থাকা এক সাধারণ যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুন—পেশায় প্লাম্বার—এক মুহূর্তও ভাবেননি। হাতল ধরে হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে এলেন ককপিটের দিকে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তাঁর পায়ের তলার মাটি সরে গেল—মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত, কন্ট্রোল কলাম ধরে এক উন্মাদ ঘাতক, আর অচৈতন্য হতে চলা এক ভারতীয় ক্যাপ্টেনের একাকী মরণপণ লড়াই!
বিদ্যুৎগতিতে ইয়ানিভ ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেই নরপশুর ওপর। রক্তে পিচ্ছিল ককপিটের মেঝেতে চলল এক চরম ধস্তাধস্তি। উন্মত্ত কো-পাইলটকে জাপটে ধরে ককপিটের বাইরে আছড়ে ফেললেন তিনি। বাকি যাত্রীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলাকারীকে শক্ত করে বেঁধে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে ফেললেন। বোর্ডে থাকা অন্য ক্রু দ্রুত কন্ট্রোল কলাম টেনে ধরে বিমানটিকে খাড়া পতন থেকে তুলে এনে সমতলে ফিরিয়ে আনলেন।
বিমান বাঁচল, কিন্তু স্মিত তখন সিটের ওপর ঢলে পড়েছেন। কন্ট্রোল কলাম আঁকড়ে থাকা আঙুলগুলো রক্তশূন্য হয়ে সাদা। শরীর থেকে অর্ধেকের বেশি রক্ত ঝরে তার আর সুইচে জমাট বেঁধেছে। মৃত্যুর হিমেল স্পর্শ অনুভব করতে করতেও স্মিত নিজের ক্ষতের দিকে তাকালেন না। ডান হাত তুলে রেডিও ট্রান্সমিশনের পিটিটি বাটনটা চাপলেন।
ভাঙা, কাঁপতে থাকা কিন্তু এক অবিশ্বাস্য শান্ত গলায় ভেসে এল তাঁর বার্তা:
"মে-ডে, মে-ডে... দিস ইজ ক্যাপ্টেন স্মিত... থ্রেট নিউট্রিলাইজড... ইনটেন্ডিং টু ল্যান্ড অ্যাট তাবুক... গেট অ্যাম্বুলেন্স রেডি..."
বিমানে থাকা এক চিকিৎসক যাত্রী ছুটে এসে স্মিতের গভীর ক্ষতে রুমাল আর ফার্স্ট-এইড চেপে ধরে রক্তপাত থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালালেন। মরুভূমির তপ্ত রোদ মেখে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরের রানওয়ে কাঁপিয়ে যখন বোয়িং-এর ভারী চাকা মাটি ছুঁল, টায়ারের ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারপাশ। কেবিনের ভেতরে তখন কান্নার আওয়াজ ছাপিয়ে হাততালির এক উন্মাদ ঝড়—১৭৪ জন মানুষ ফিরে পেলেন তাঁদের নতুন জীবন!
নিরাপত্তা বাহিনী যখন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল, তাঁরা দেখলেন এক ভারতীয় ক্যাপ্টেন রক্তাক্ত হয়ে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছেন, অথচ তাঁর অসাড় হাত এখনও আলতো করে ধরে আছে ককপিটের ড্যাশবোর্ড—যেন নিশ্চিত করছেন, তাঁর দায়িত্বে থাকা সব মানুষ অক্ষত আছে তো!
তাবুকের হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওটিতে যখন স্মিতের ক্ষতবিক্ষত দেহে একের পর এক সেলাই পড়ছে, তখন নয়াদিল্লি থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফোন করলেন মুম্বইয়ে স্মিতের বাবা-মায়ের কাছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ওয়াশিংটন থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং জেরুজালেম থেকে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী একবাক্যে স্মিত মচ্ছারকে বিশ্বমঞ্চের ‘হিরো’ হিসেবে কুর্নিশ জানালেন।
পরের দিন ভোরে যখন তাবুকের হাসপাতালের এক চিলতে কাচের জানালায় মরুভূমির সোনালি রোদ এসে পড়ল, স্মিতের ভারী চোখের পাতা ধীরে ধীরে খুলল।
চারপাশে ডাক্তার, নার্স আর কড়া নিরাপত্তা প্রহরী। নিজের শরীরের অসহ্য ব্যথার কথা ভাবেননি স্মিত, নিজের ক্ষতের খোঁজ নেননি। ব্যান্ডেজ বাঁধা শুকিয়ে আসা গলা দিয়ে কেবল ক্ষীণ দুটো শব্দ বেরোল—"যাত্রীরা... সবাই ঠিক আছে?"
ডাক্তাররা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তাঁদের চোখের কোণ ভিজে উঠল।
আসলে দেবদূতদের কোনো রূপকথার ডানা থাকে না; তারা আমাদের মাঝেই রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ হয়ে বেঁচে থাকে। ঘাটকোপারের শান্ত ছেলেটার পিঠেও রূপকথার কোনো ডানা ছিল না, গায়ে জড়ানো ছিল হাসপাতালের সাদা চাদর—কিন্তু সেই চাদরের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিল এমন এক অপরাজেয় আত্মা, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে ১৭৪টি জীবনের সুরক্ষাকে জয়ী করে তুলেছেন। মৃত্যু যখন তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, তিনি নিজের ক্ষত ঢাকেননি, তিনি অন্যের নিঃশ্বাস আগলে দাঁড়িয়েছিলেন। এই নিঃস্বার্থ কর্তব্যের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল আস্ত একটি পৃথিবী।
Comments
Post a Comment