গুয়াহাটিতে তিন শতাধিক নাগরিক উপস্থিতিতে নাগরিক সম্মিলনে

 নয়া  ঠাহর, সংবাদদাতা: গুয়াহাটিতে  তিন  শতাধিক বিশিষ্ট নাগরিকের আহ্বানে অসমের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তিন শতাধিক লোকের উপস্থিতিতে নাগরিক অভিবর্তন সম্পন্ন---

*আসামে এসআইআর নয়!  বিরোধিতায় নাগরিক সমাজ;এসআইআর পরিবেশ ধ্বংস, কর্পোরেট লুণ্ঠন, বিভাজনবাদী সরকারের অতিকেন্দ্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ধ্বনিত হল প্রতিবাদ*

ঝুলিয়ে রাখা এনআরসি উন্নীতকরণ শীঘ্রই সম্পূর্ণ করে প্রকাশ করার দাবি

*২১ সেপ্টেম্বর, গুয়াহাটি:* অসমে বহু বিতর্কিত এসআইআর-এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করার পাশাপাশি ২০১৪ সালের ভোটার তালিকার ভিত্তিতে ইতিমধ্যে প্রস্তুত নাগরিক পঞ্জীর উন্নীতকরণ শীঘ্রই সম্পূর্ণ করার দাবি জানিয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সুপরিচিত দুই শতাধিক বিশিষ্ট নাগরিকের এক অভিবর্তন। ২০ সেপ্টেম্বর বিশিষ্ট নাগরিক, লেখক-কবি, সমাজকর্মী এবং সামাজিক সংগঠনের কর্মকর্তাদের আহ্বানে এবং ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনির উদ্যোগে গুয়াহাটির লক্ষ্মীরাম বরুয়া সদনে একটি নাগরিক অভিবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এই অভিবর্তনে ড০ ঘনশ্যাম নাথ, বরিষ্ঠ সাংবাদিক মুনিন বায়ন, অধ্যাপক তাইজ উদ্দিন এবং কৃষক সংগঠক জয়ন্ত গগৈর সভাপতিত্বে এবং হরকুমার গোস্বামী, দেবজিৎ চৌধুরী ও অরূপ বৈশ্যের সম্পাদকমণ্ডলীর পরিচালনায় প্রথমেই অভিবর্তনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন উদ্যোক্তা সংগঠন ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনির পক্ষে হরকুমার গোস্বামী। 

শুরুতে জুবিন গার্গ ও ভূপেন হাজরিকার প্রতিকৃতিতে প্রদীপ প্রজ্বলন করেন অধ্যাপক আব্দুল মান্নান এবং জুবিনের স্মৃতিতে এবং  রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার হয়ে সাম্প্রতিক অসমে যেসব শ্রমজীবী মানুষ অকালে মারা গেছেন ও আত্মহত্যা করেছেন তাদের স্মৃতিতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এবছর ১৯শে সেপ্টেম্বর সরকারি বিশেষ দিবস ও বন্ধ ঘোষণা না করায় ধিক্কার জানানো হয় এবং প্রতিবছর ১৯ শে সেপ্টেম্বর জুবিন দিবস হিসাবে ঘোষণার দাবি জানানো হয়। কনভেনশনে জুবিন সংকল্প পাঠ করান বিশিষ্ট শিল্পী  বিশিষ্ট যুব শিল্পী শঙ্কু নিরঞ্জন নাথ।উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন লয়নু কলিতা দাস।

কনভেনশনের আলোচনার বিষয়কে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে প্রথমে নির্দ্দিষ্ট বক্তারা বক্তব্য রাখেন। উজনি অসমের সাম্প্রতিক বন্যা, কাজিরাঙ্গার পরিবেশ সুরক্ষা উঠিয়ে দেওয়া, কর্পোরেট লুণ্ঠনের উপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে উজনির প্রতিনিধি ড০ পদ্মলোচন নাথ, সমাজকর্মী মনোরম গগৈ, যোরহাটের প্রাক্তণ মেয়র প্রশান্ত বরা বলেন যে, উজনির সাম্প্রতিক বন্যা যথেচ্ছভাবে সরকারি মদতে প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন থেকে সৃষ্ট এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পুনর্বাসনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য তাঁরা সরকারকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। মনোরম গগৈ তাঁর বক্তব্যে উল্লখ করেন, অসমের নিজস্ব উৎপাদের উপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাজারগুলিও সর্বভারতীয় বৃহৎ ব্যবসায়ীদের ও বাইরের পণ্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, ফলে অসমের কৃষি অর্থনীতি বিপর্যস্ত এবং এভাবে অসমের কোন নিজস্ব আঞ্চলিক অস্তিত্ব টিঁকে থাকতে পারে না। 

বিশিষ্ট লেখক ও অধিবক্তা অরূপ বরাবরা তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে নাগরিক অধিকারসমূহ কীভাবে একে একে খর্ব করা হচ্ছে এবং স্বৈরশাসনের বিপদ ঘনীভূত হচ্ছে তা বিস্তৃত তোলে ধরেন। 

বিভিন্ন বক্তা তার নিজ নিজ বিষয় ছাড়াও নাগরিকত্বের বিষয়কে গুরুত্ত্ব দিয়ে উত্থাপন করেন। বক্তারা আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন যে, এনআরসিকে ঝুলিয়ে রেখে তাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে ভারত সরকার অসমে এসআইআর চাপিয়ে দিতে চাইছে। নির্দ্দিষ্ট বক্তা হিসাবে বিশিষ্ট   মানব অধিকার কর্মী তথা যুব লেখক পারিজাত নন্দ ঘোষ এনআরসি প্রক্রিয়ায় যে অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তার উদাহরণগুলি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এনআরসি আসলে অসমে বিদেশি ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও দাবার ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহারের অস্ত্রকে শেষ করার জন্য করা হয়নি, করা হয়েছে নাগরিকরা রাষ্ট্রের হুকুমের গোলাম ও শুধুমাত্র শাসকদের কাছে প্রজা সেই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে। তাই এনআরসি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে ১৯ লাখ বাদ যাওয়া ভোটারদের অনতিবিলম্বে রিজেকশন স্লিপ প্রদান ও নির্দ্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ট্রাইবুন্যাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ট্রাইব্যনাল প্রক্রিয়া কোন নির্দ্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় সেটা যুগের পর যুগ চলতে পারে, তাই সংশোধিত ২০১৪ - এর ভোটার লিস্ট যা ১৯৭১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে সংশোধিত হয়েছে তার ভিত্তিতে দ্রুত ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়ার মীমাংসা করতে হবে। অসমে এসআইআর চাপিয়ে দেওয়া সরকারের জনবিরোধী অভিপ্রায়কে অভিবর্তন দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ঘোষ তার বক্তব্যে আরও যোগ দিয়ে বলেন যে এসআইআর একটি সর্বভারতীয় ইস্যু,প্রশ্ন গণতন্ত্রের ও প্রান্তীক মানুষের হেনস্তার তাই এই ইস্যুকে রাষ্ট্রীয় স্তরে মোকাবেলা করার জন্য 'ভোট ফর ডেমোক্রেসি' মতো সংগঠনের সঙ্গে ফরাম যুক্ত হয়ে আগামী দিনে এসআইআরের বিরোধিতা করে দেশ ব্যাপী গণ আন্দোলন গঢ়ে তোলা যায় নাকি তা বিবেচনা করার আহ্বান জানান অভিবর্তনের থাকা সকলকে।


উচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অধিবক্তা শান্তনু বড়ঠাকুর সরকারের ভূমিকার উপর আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন যে সরকার কর্পোরেটের হাতে অসমের সস্তায় জল, জমি, জঙ্গল ও শ্রম তুলে দিতে যথেচ্ছভাবে কোন আইন ও সংবিধান না মেনে বলপ্রয়োগ করে উচ্ছেদ চালাচ্ছে। ভূমির অধিকার তথা পাট্টা প্রদানের সরকারি প্রতিশ্রুতি আসলে জনগণকে প্রতারণা করার দলিল। 

অধিবক্তা কিশোর কলিতা ভূমি অধিকার, উচ্ছেদ ও নাগরিকত্বের বিষয়ের উপর সুচিন্তিত ও বিস্তৃত মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, উচ্ছেদ ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত এবং রাষ্ট্রীয় আগ্রাসী ভূমিকায় জনগণের সব অধিকার আজ সংকটের মুখে।

চা-শ্রমিক ও আদিবাসী সংগ্রামের অন্যতম নেতা সংগঠক প্রভাত দাস পানিকা এবং গিগ ওয়ার্কার্সদের নেতা ও সংগঠক ধ্রুবজ্যোতি অসম শ্রমিক ও নাগরিকদের সম্পর্কের বিষয়ে বলতে গিয়ে চা-শ্রমিকদের ও গিগ তথা প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক বা অ্যাপভিত্তিক শ্রমিকদের দুর্দশার কথা উল্লেখ করেন। এই শ্রমিকদের আয় ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে উদাসীন কারণ সরকার কর্পোরেট মালিকদের সেবা করতে বেশি আগ্রহী। 

সাধারণভাবে একদিকে নাগরিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের এমনভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে যে, নাগরিকের অধিকার, শ্রমিকর অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মানসিক শ্রমিক ও কায়িক শ্রমিকের বৃহত্তর ঐক্য জরুরি, যাতে কার্যকরী ও সফল প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলা যায়। সার্ভিস সেক্টরে লক্ষ লক্ষ নব্য শ্রমিক যেমন পরিবহণ, গিগ, নির্মাণ, প্রকল্প ও অন্যান্য সেবায় মহিলা শ্রমিকদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। বহু পরিযায়ী শ্রমিকদের অকাল মৃত্যু তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। 

প্রায় সব বক্তাই যে বিষয়ের উপর গুরুত্ত্ব দেন, রাজনীতি ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থের যোগসূত্রে দিল্লিতে যে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঘটছে, তাতে সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে পড়ে অসমের আঞ্চলিক ফেডারেল সত্তাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। নাগরিক ও গণ-অধিকার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সব সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলাই একমাত্র পথ। 

এদিকে ৫ মিনিটের একটি অনবদ্য প্রতিবাদী নৃত্যনাটক পরিবেশন করেন পাপিয়া দাস পরিচালিত বিজনির ঐকতান সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী। এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা এনে দেয় এবং সকলকে মুগ্ধ করে।

কনভেনশনের বিরতিতে কবিতা কবি পাঠ করেন বিশিষ্ট শিল্পী  লয়নু দাস কলিতা ও কবি নীলাভ সৌরব। বক্তব্য সহ গান গান জনগোষ্ঠীয় সাংস্কৃতিক মঞ্চের প্রহ্লাদ মিলির।

সবশেষে সব প্রতিনিধিকে কনভেনার মেম্বার করে ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি, নাগরিক উদ্যোগের এক বিস্তৃত রাজ্য কমিটি গঠন করা হয়। কনভেনশনের সব আহ্বায়ক ও নতুন আহ্বায়ক সদস্যরা নিজেদের মধ্যে এক আলোচনা প্রক্রিয়ায় সব দিক বিবেচনায় কিছুসংখ্যক কোর্ডিনেটর নিযুক্ত করবেন এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যে অসমের বিভিন্ন প্রান্তে অনুরূপ সাধারণ সভা বা সম্মেলন করে জোনাল, জেলা ও এলাকা কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিতে গ্রহণ করে কনভেনশন। 

সভাপতিমণ্ডলীর পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষণের মাধ্যমে কনভেনশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

কান্দি রেডক্রস সোসাইটি অরণ্য সপ্তাহ

কান্দিতে বাঙালি সংস্কৃতি ইতুর খন্ড চিত্র