শান্তি নিকেতন এ প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদিত হবে
প্লাস্টিক বর্জ্যই এবার হবে গবেষণার নতুন সম্পদ, শান্তিনিকেতনে জ্বালানি তৈরির পরিকল্পনা বিশ্বভারতীর
দেবকিশোর চক্রবর্তী
পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল প্রক্রিয়াজাত করে তরল জ্বালানি ও গ্যাস তৈরির উদ্যোগ, এক মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা
শান্তিনিকেতনের পরিবেশ রক্ষায় এবার নতুন ভাবনা বিশ্বভারতীর। হস্টেল, আবাসন, কোয়ার্টার এবং বিভিন্ন ভবন থেকে প্রতিদিন যে পলিথিন ও প্লাস্টিকের জলের বোতল বর্জ্য হিসেবে জমা হয়, সেগুলিকে বাইরে ফেলে দেওয়া বা অন্যত্র সরিয়ে না দিয়ে সেগুলির পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে ওই প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোলিয়ামজাত তরল জ্বালানি এবং গ্যাস তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য প্রবীর কুমার ঘোষ।
এটি কোনও তৈরি হয়ে যাওয়া জ্বালানি প্রকল্প নয়, বরং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ। প্রথমে বিশ্বভারতীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিক কত পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তার হিসাব করা হবে। সেই পরিমাণ এবং বর্জ্যের প্রকৃতি বিবেচনা করেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বসানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ, প্রকল্পের বাস্তব পরিকাঠামো ও উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণের কাজ এখনও পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর্যায়েই রয়েছে।
বিশ্বভারতী সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধু মূল ক্যাম্পাসের বর্জ্য নয়, হস্টেল, আবাসিক এলাকা, কোয়ার্টার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আদর্শ গ্রামের বর্জ্যও ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে সংগৃহীত প্লাস্টিক কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে তার নিষ্পত্তি হচ্ছে এবং তা পরিবেশের উপর কী প্রভাব ফেলছে—এই বিষয়গুলির উপরও নজর রাখা সম্ভব হবে।
প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে সমস্যা নতুন নয়। ব্যবহারের পরে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক সহজে প্রকৃতিতে মিশে যায় না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা এই বর্জ্য পরিবেশের উপর চাপ তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে আবার প্লাস্টিক পোড়ানোর মাধ্যমে তা নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্লাস্টিক পোড়ালে ক্ষতিকর ও বিষাক্ত পদার্থ নির্গত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্লাস্টিককে খোলা জায়গায় পোড়ানো নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়ায় তার ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুনরুদ্ধারের ভাবনাই এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পরিকল্পিত প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রিত উত্তাপের সাহায্যে নির্দিষ্ট ধরনের প্লাস্টিককে ভেঙে গ্যাসীয় ও তরল উপাদানে পরিণত করা যায়। পরবর্তী পর্যায়ে শুদ্ধিকরণ ও শীতলীকরণের মতো ধাপের মাধ্যমে সেই উপাদানগুলি পৃথক করার ব্যবস্থা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের প্রক্রিয়া থেকে পাওয়া গ্যাস নির্দিষ্ট শর্তে রান্নার কাজে এবং তরল অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী হতে পারে। তবে বাস্তবে বিশ্বভারতীর প্রকল্পে কী পরিমাণ জ্বালানি উৎপাদন হবে এবং সেই জ্বালানির ব্যবহার কীভাবে করা হবে, তা প্রকল্প চালু হওয়ার পর প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।
বিশ্বভারতীর উপাচার্য প্রবীর কুমার ঘোষ জানিয়েছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসকে সম্পূর্ণ পলিথিনমুক্ত করার লক্ষ্যও নেওয়া হয়েছে। তবে এই লক্ষ্য শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে অর্জন করতে চাইছে না বিশ্ববিদ্যালয়। বরং প্লাস্টিক ব্যবহারের পর যে বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তার সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং সম্ভাব্য পুনর্ব্যবহারের একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বভারতীর এক আধিকারিকের কথায়, শুধু নিয়ম করে প্লাস্টিক বন্ধ করা কঠিন। বর্জ্য সংগ্রহ করে তাকে কাজে লাগাতে পারলেই স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোনো সম্ভব। এই বক্তব্যের মধ্যেই উদ্যোগটির মূল ভাবনা স্পষ্ট—প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হওয়ার পর সেটিকে শুধু সমস্যা হিসেবে না দেখে, যথাযথ প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তার সম্ভাব্য পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা।
তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কী ধরনের প্লাস্টিক এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যাবে, কীভাবে অন্যান্য বর্জ্য থেকে সেগুলি পৃথক করা হবে, উৎপাদিত গ্যাস ও তরল জ্বালানির মান কেমন হবে, সেই জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের নিরাপত্তা বিধি মানতে হবে—সবকিছুরই যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তিটি যেন পরিবেশের উপর নতুন কোনও ক্ষতিকর প্রভাব না ফেলে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্বভারতীর এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাই শুধু জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা নয়; বরং একটি শিক্ষাঙ্গনের নিজস্ব প্লাস্টিক বর্জ্যকে কীভাবে স্থানীয় স্তরেই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। একটি প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করার পর সেটি যেন অযথা পরিবেশের বোঝা হয়ে না থাকে, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
শান্তিনিকেতন প্রকৃতি ও শিক্ষার এক অনন্য মিলনভূমি। সেই পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখা বিশ্বভারতীর কাছে নিছক প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং তার নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গেও জড়িত। তাই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই উদ্যোগ সফল হলে তার তাৎপর্য কেবল একটি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে নিজের তৈরি বর্জ্যের দায়িত্ব নিতে পারে, তারও একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
এখন অবশ্যই অপেক্ষা বাস্তবায়নের। পরিকল্পনা থেকে যন্ত্র বসানো, বর্জ্য সংগ্রহ থেকে প্রক্রিয়াকরণ এবং শেষ পর্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকরভাবে কোনও ব্যবহারযোগ্য উপাদান পাওয়া—প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটি কতটা কার্যকর হয়, কতটা প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয় এবং উৎপাদিত উপাদান বাস্তবে কতটা ব্যবহারযোগ্য হয়, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনে।
তবে ভাবনাটির গুরুত্ব এখানেই—প্লাস্টিককে শুধু নিষিদ্ধ করার বদলে তার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর পথ খোঁজা। বিশ্বভারতীর পরিকল্পনা সেই পথেরই একটি সম্ভাব্য পরীক্ষা। সফল হলে শান্তিনিকেতনের পরিবেশ রক্ষায় নতুন দিশা মিলতে পারে, আর ব্যর্থ হলেও এই উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও নিরাপদ ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পথ তৈরি করার সুযোগ থাকবে। ছবি দেবে
Comments
Post a Comment