রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্র নাথ
*রাখিবন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ :*
*নেপথ্যচিত্র...*
••••
*ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী*
••••
"রাখিবন্ধন" উৎসব এলে মনে পড়ে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ রাখি নিয়ে পথে নেমেছিলেন। অখণ্ড বঙ্গ ও বাঙালিসত্তার বন্ধন অটুট করতে। ১৯০৫-এ লর্ড কার্জন বঙ্গদেশকে দুটুকরো করার সিদ্ধান্ত নেন। আসলে এই ভাগবাটোয়ারাটির অন্তরালে মূল মতলবটি ছিল বাঙালি হিন্দু-মুসলমানে আলাদা জাতিসত্তা উসকে দেয়া আর সেটার দৌলতে "ডিভাইড অ্যান্ড রুল" চালানো। পরবর্তীকালে ধর্মের নামে দেশভাগের বীজটি তখনই বপন করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ অখণ্ড বাঙালি জাতিসত্তার কল্পনা করতেন। কিন্তু বাস্তবটি ছিল নিষ্ঠুর,নির্মম, নিদারুণ।
১৯০৫-এর ২৭ সেপ্টেম্বর কবি সাবিত্রী লাইব্রেরির সভায় রাখিবন্ধনের আহ্বান জানালেন। ১১ অক্টোবর "বেঙ্গলি" পত্রিকায় বাংলা হরফে "রাখি সংক্রান্তির ব্যবস্থা" ঘোষিত হয় এভাবে~
"দিন : এই বৎসর ৩০শে আশ্বিন। ১৬ই অক্টোবর। আগামী বৎসর হইতে আশ্বিনের সংক্রান্তি।
ক্ষণ : সূর্য্যোদয় হইতে রাত্রি প্রথম প্রহর পর্য্যন্ত।
নিয়ম : উক্ত সময় সংযম পালন।
উপকরণ : হরিদ্রাবর্ণের তিন সূতার রাখী।
মন্ত্র : ভাই ভাই এক ঠাঁই, ভেদ নাই ভেদ নাই।
অনুষ্ঠান : উচ্চ নীচ হিন্দু মুসলমান, খৃষ্টান বিচার না করিয়া ইচ্ছামত বাঙ্গালী মাত্রেই রাখী বাঁধা। অনুপস্থিত ব্যক্তিকে সঙ্গে মন্ত্রটি লিখিয়া ডাকে বা লোকের হাতে রাখী পাঠাইলেও চলিবে।"
•••
"বেঙ্গলি" পত্রিকায় এরপর ১৩ অক্টোবর খবরটি ছাপা হয়~
"We are requested to announce that Babu Rabindra Nath Tagore has composed a beautiful song in connection with the "Rakhi Bandhan Ceremony" which is to be held on 16th October."
রবীন্দ্রনাথের রাখির গান সহ সুদৃশ্য কার্ড ছাপা হয়। কবি নিজে সেখানে সই করে সঙ্গে রাখি দিয়ে অনেকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসু দার্জিলিঙে কার্ড পেয়ে বন্ধুকে লিখলেন~"তোমার রাখী সংগীত পড়িলাম। তোমার লেখনী স্বর্ণময়ী হোক।" রবীন্দ্রনাথ পাটনায় ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারকেও রাখি পাঠালেন। এমনকি বরিশালে জননেতা অশ্বিনীকুমার দত্তকেও।
•••••
১৬ অক্টোবর কলকাতায় অঘোষিত হরতাল। ভোরবেলা জনতার ঢল নামল। একবারে পুরোভাগে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি। বিশাল শোভাযাত্রা করে সোজা গঙ্গাতীরে। স্নান করে পরস্পরের হাতে রাখি বন্ধন শুরু হলো। সে এক অভূতপূর্ব অপূর্ব দৃশ্য।
••••
রাখি বন্ধনের "ভাই ভাই এক ঠাঁই, ভেদ নাই ভেদ নাই" মন্ত্রটি যে হুচোট খেয়ে পড়েছিল, সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় সজনীকান্ত দাসের লেখায়। তিনি লিখেছেন~
"সামনে যাকে পেতাম, তারই হাতে বাঁধতাম রাখি। সরকারী পুলিশ এবং কনস্টেবলদেরও বাদ দিতাম না। মনে পড়ে, একবার একজন কনস্টেবল হাত জোড় করে বলেছিল~*মাফ করবেন হুজুর, আমি মুসলমান।"*
••••
তাহলেই বুঝুন, "ভাই ভাই এক ঠাঁই"-র মূল আপত্তিটি কিন্তু সেই ধর্মের নামেই। কেননা রাখিবন্ধনটির সঙ্গে কৃষ্ণ-কালচারের যোগ। আর ধর্মগোঁড়াদের নজরে ঝুলন-টুলন তো পুতুলখেলা। রাখিবাঁধাও হেঁদুয়ানা।
ধর্মভেদের মূল মাথা কার্জন বঙ্গভঙ্গের কয়েকদিন আগে ঢাকার নবাবের বাড়িতে মুসলিম গণ্যমান্যদের আশ্বাস দিয়েছিলেন~"আমি আপনাদের একটি মুসলিম প্রদেশ দিচ্ছি।"
সুতরাং ১৯৪৭-এ যে ধর্মের নামে দেশভাগ হয়, তার ব্লু-প্রিন্ট কিন্তু তখনই শুরু হয়েছিল। এবং সেই মতলবেই ইংরেজদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯০৬-এ ঢাকা শহরে নবাব উলমুলুকের সভাপতিত্বে মুসলিমদের জন্য আলাদা রাজ্য, আলাদা নির্বাচন ইত্যাদির দাবিতে "মুসলিম লিগ"-এর জন্ম হয়।
•••••
রবীন্দ্রনাথের এত চেষ্টা এত সক্রিয়তা, এমনকি রাখিবন্ধন উৎসবও ধর্মের নামে দ্বিজাতি-তত্ত্বকে আটকাতে পারেনি। শরিয়তের এমনই মহিমা!!!
তবে সুখের কথা, কাল্পনিক "পাক" বা পবিত্র ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে দেশটি যে ফালাফালা হয়ে গেল~সেই হৃদয়বিদারক দিনটি রবীন্দ্রনাথ দেখেননি। তার আগেই তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটেছে। যদি দেখতেন, হয়তো রাখিবন্ধন উৎসবটির জন্য তাঁর খুব আক্ষেপ আর কষ্ট হতো।
(রচনা : ২৬-৮-১৮)
কথা : 7002791773
•••
তথ্যসূত্র :
১. "রবিজীবনী"পঞ্চম খণ্ড~প্রশান্তকুমার পাল
২. "দেশবিভাগ : পশ্চাৎ ও নেপথ্যকাহিনী"~ভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
Comments
Post a Comment