জাতিঙ্গা পাখিদের আত্মহত্যা ,সংরক্ষণের উদ্যোগ

জাটিঙ্গা: ‘পাখির আত্মহত্যা’ থেকে পাখি সংরক্ষণের এক অনন্য অভিযাত্রা

অনুপ কুমার বিশ্বাস
হাফলঙ 


অসমের ডিমা হাসাও জেলার ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম জাটিঙ্গা একসময় বিশ্বের কাছে পরিচিত ছিল এক রহস্যময় ও বেদনাদায়ক ঘটনার জন্য। প্রতি বছর বর্ষা শেষে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি, কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার রাতে অসংখ্য পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখি গ্রামের আলোয় এসে পড়ত। বহু বছর ধরে এই ঘটনাকে ভুলভাবে "পাখির আত্মহত্যা" বলা হলেও গবেষণা প্রমাণ করেছে, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং নির্দিষ্ট আবহাওয়া, কুয়াশা, প্রবল বাতাস এবং কৃত্রিম আলোর কারণে বিভ্রান্ত হয়ে পড়া পাখিদের একটি স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু মানুষের অজ্ঞতা সেই বিভ্রান্ত পাখিদের জন্য হয়ে উঠেছিল মৃত্যুর ফাঁদ।
১৯৯২ সালের একটি সংবাদ প্রতিবেদন সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতারই দলিল। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল "Killed, Roasted and Gobbled Up"। শিরোনামই যেন জানিয়ে দিচ্ছিল, কী নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হতে হতো সেই নিরীহ পাখিদের। তখন মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চার শতাধিক পাখি মারা গিয়েছিল। গ্রামবাসীরা বাঁশের লাঠি হাতে অন্ধকারে অপেক্ষা করতেন। আলোয় আকৃষ্ট হয়ে নিচে নেমে আসা ক্লান্ত ও দিশেহারা পাখিগুলিকে আঘাত করে হত্যা করা হতো। পরে সেগুলি রান্না করে খাওয়া কিংবা বিক্রি করা হতো।
সেই প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল, এই পাখিরা আত্মহত্যা করে না। তারা প্রকৃতির সন্তান। তারা গান গায়, আকাশে উড়ে বেড়ায়। কিন্তু মানুষের নিষ্ঠুরতার কাছে তাদের জীবন হয়ে উঠেছিল অসহায়। প্রতিবেদনটি শুধু একটি ঘটনার বিবরণ নয়, বরং সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো একটি আবেদন ছিল।
তখন জাটিঙ্গার পাখিদের মধ্যে দেখা যেত বিভিন্ন প্রজাতির বক, কিংফিশার, পিট্টা, গ্রিন পিজিয়ন, ড্রঙ্গো, নাইট হেরন, বিটার্নসহ বহু দুর্লভ পাখি। বিশেষ করে হারবিটার্ন, টাইগার বিটার্ন ও ফরেস্ট কিংফিশারের মতো বিরল প্রজাতির উপস্থিতি জাটিঙ্গাকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। কিন্তু সেই সময় পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না। বন বিভাগ কেবল পারদবাতি লাগিয়ে পাখিদের মূল আলোর উৎস থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। আহত পাখির চিকিৎসা কেন্দ্র, উদ্ধারকারী দল কিংবা গ্রামবাসীদের মধ্যে সচেতনতা তখনও খুব সীমিত ছিল।
তিন দশকেরও বেশি সময় পরে ছবিটা অনেকটাই বদলেছে।
২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জাটিঙ্গার গল্প। সেখানে জানানো হয়, দীর্ঘ নয় বছর পর আবার দেখা মিলেছে বিরল টাইগার বিটার্নের। শুধু তাই নয়, কাছের দইহেং গ্রামে সেই বছর রেকর্ড সংখ্যক পাখির আগমন ঘটেছে। এটি কেবল একটি পাখির ফিরে আসা নয়, বরং প্রকৃতি সংরক্ষণের দীর্ঘ প্রচেষ্টার সফলতার প্রতীক।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাখিগুলি কেবলমাত্র নির্দিষ্ট পরিবেশে জাটিঙ্গায় আসে। ভারী কুয়াশা, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, চাঁদহীন রাত এবং দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বমুখী বাতাস, এই চারটি শর্ত একসঙ্গে উপস্থিত থাকলেই তারা বিভ্রান্ত হয়ে আলোর দিকে চলে আসে। এই শর্তগুলির একটি অনুপস্থিত থাকলেও পাখিদের দেখা যায় না। ফলে "রহস্য" বলে পরিচিত ঘটনাটির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজ অনেকটাই পরিষ্কার।
আরও একটি বড় পরিবর্তন এসেছে মানুষের মনোভাবের মধ্যে। আগে যেখানে গ্রামের মানুষ এই পাখিদের শিকার করতেন, এখন তারাই তাদের রক্ষক। দইহেং গ্রামের গাঁওবুড়া রুথলাল মার নিজেই গ্রামবাসীদের পাখিদের কোনো ক্ষতি না করার আহ্বান জানিয়েছেন। বন বিভাগও নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করছে। টহলদারি বাড়ানো হয়েছে যাতে কেউ পাখিদের আঘাত করতে না পারে।
সংবাদে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, আজ মানুষ বুঝতে শিখেছে যে এই পাখিরা শুধু একটি গ্রামের সম্পদ নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। বিরল টাইগার বিটার্নের পুনরায় দেখা মিলেছে, সেটিও প্রমাণ করে যে সংরক্ষণের উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কয়েক দশকের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। বিজ্ঞানী, বন বিভাগ, প্রকৃতিপ্রেমী সংগঠন, সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় মানুষের যৌথ উদ্যোগে ধীরে ধীরে বদলেছে পরিস্থিতি। "পাখির আত্মহত্যা" শব্দবন্ধটিও এখন আর ব্যবহার করতে চান না বিশেষজ্ঞরা। কারণ এটি বিভ্রান্তিকর এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। এখন এটিকে বলা হয় জাটিঙ্গার মৌসুমি পাখি-বিভ্রান্তি (Bird Disorientation Phenomenon)।
তবে সব সমস্যা যে শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই চোখে পড়ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আগের তুলনায় অনেক কম সংখ্যক পাখি জাটিঙ্গায় আসছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বনভূমি সংকুচিত হওয়া, মানুষের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনও পাখিদের স্বাভাবিক বিচরণে প্রভাব ফেলছে। তাই সংরক্ষণের কাজ আরও জোরদার করা জরুরি।
দইহেং গ্রামে একটি স্থায়ী বার্ড ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের দাবিও উঠেছে। এতে পর্যটকরা নিরাপদে পাখি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং স্থানীয় মানুষের আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি পাখি সংরক্ষণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
জাটিঙ্গার ইতিহাস তাই দুই বিপরীত অধ্যায়ের গল্প। প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে অজ্ঞতা, নিষ্ঠুরতা ও নির্বিচারে পাখি হত্যা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে সচেতনতা, বিজ্ঞান, সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির প্রতি নতুন দায়বদ্ধতা। ১৯৯২ সালের প্রতিবেদনে যে আর্তনাদ শোনা গিয়েছিল, ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে তার জায়গা নিয়েছে আশার আলো।
একসময় যে আলো পাখিদের মৃত্যুর দিকে টেনে আনত, আজ সেই আলোর চারপাশেই দাঁড়িয়ে থাকে বনকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও প্রকৃতিপ্রেমীরা, হাতে লাঠি নয়, উদ্ধার করার মানসিকতা নিয়ে। এই পরিবর্তনই জাটিঙ্গার সবচেয়ে বড় সাফল্য।
জাটিঙ্গা আমাদের শেখায়, প্রকৃতির রহস্যকে কুসংস্কার দিয়ে নয়, বিজ্ঞান দিয়ে বুঝতে হয়। আর মানুষ চাইলে ধ্বংসের ইতিহাসকে সংরক্ষণের ইতিহাসে বদলে দিতে পারে। যে গ্রাম একদিন পাখি হত্যার জন্য বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছিল, সেই গ্রামই আজ ধীরে ধীরে পাখি সংরক্ষণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠছে।
জাটিঙ্গার আকাশে যখন আবার বিরল টাইগার বিটার্ন ডানা মেলে উড়ে যায়, তখন সেটি শুধু একটি পাখির উড়ান নয়। সেটি প্রকৃতি, মানুষ এবং সচেতনতার মিলিত বিজয়ের প্রতীক। আগামী দিনে এই ঐতিহ্য রক্ষা করা শুধু বন বিভাগের নয়, আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। কারণ পাখিরা কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, তারা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানবসভ্যতার ভবিষ্যতেরও নীরব দূত।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন