ঢাকা শহরে এবার বিশাল রথ যাত্রা উৎসব পালিত হয়েছে

বাংলাদেশের ৬০ ফুট উঁচু বৃহত্তম রথটি মুক্তিযুদ্ধে  পাক সেনাদের হাতে বিধ্বস্ত হলেও ঢাকায় বিশাল রথযাত্রা উৎসব চলেছে এবার 

মানস বন্দ্যোপাধ্যায়
(ভাইস প্রেসিডেন্ট 
প্রেস ক্লাব অফ
সাউথ এশিয়া)

বাংলাদেশে বহুদিন পর আবার মহা সমারোহে হিন্দুরা রথযাত্রা উৎসব উদযাপন করলেন। ঢাকায় বিশাল মিছিল " জয় জগন্নাথ" স্লোগানে মুখরিত হলো। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় রথের দড়ি টানাটানি করে উৎফুল্ল হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের পূর্বপুরুষের অধিকারকে তুলে ধরেছে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। জামাতে ইসলামীর নেতাদের হুমকি উপেক্ষা করে হিন্দুরা তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকারকে তুলে ধরেছেন।
একটা সময় ছিল যখন অবিভক্ত বাংলায় এখানকার রথযাত্রা ছিল হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসবের অন্যতম।
পরবর্তীকালে দেশ ভাগের পর পূর্ববঙ্গে এই উৎসব অব্যাহত ছিল।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনারা সবচেয়ে বড় মন্দিরটি ধ্বংস করে দিয়েছে। 

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হতো ধামরাইয়ের যশোমাধব মন্দিরকে কেন্দ্র করে। উনিশ শতকের মধ্যভাগে বর্তমান মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বালিয়াটির জমিদাররা প্রায় ৬০ ফুট উঁচু, তিনতলা বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক রথটি নির্মাণ করেন। রথটি টানতে ব্যবহৃত হতো ২৭ মণ ওজনের শনের দড়ি। রথযাত্রা উপলক্ষে সেখানে মাসব্যাপী মেলা বসত, যেখানে শুধু বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই নয়, ভারত ও নেপাল থেকেও অসংখ্য ভক্তের সমাগম ঘটত।

কিন্তু ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল বেলা ১১টার পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধামরাইয়ে প্রবেশ করে ঐতিহাসিক যশোমাধবের রথে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তেই পুড়ে যায় শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্যের নিদর্শন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সেখানে নতুন একটি রথ নির্মাণ করা হয় এবং বর্তমানে সেই রথ দিয়েই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

একই দিন ধামরাইয়ের কায়েতপাড়া গ্রামের লোকনাথ মন্দিরেও হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনারা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরের সামনে জড়ো করে মন্দিরের ভেতরে থাকা স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে তারা। এরপর গানপাউডার ছিটিয়ে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে মন্দিরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে পুরো মন্দিরটি ভস্মীভূত হয়ে যায়। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর পুনর্নির্মাণ করা হয় এই মন্দির, যা বর্তমানে ‘শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবার আশ্রম’ নামে পরিচিত।

৯ এপ্রিলের পরদিন ধামরাইয়ের কায়েতপাড়া ও কালামপুর এলাকায় সংঘটিত হয় এক ভয়াবহ গণহত্যা। প্রত্যক্ষদর্শী ও গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যাওয়া নেপাল পালের বর্ণনা অনুযায়ী, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ জনকে আটক করে। তাঁদের মধ্যে ২০ জনকে ট্রাকে করে কালামপুর বাজারসংলগ্ন বংশী নদীর একটি শাখা খালের পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করা হলে ঘটনাস্থলেই ১৪ জন শহীদ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান পাঁচজন।

সেদিন রাতেই পাকিস্তানি বাহিনী এলাকা ত্যাগ করলে প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে স্থানীয় কয়েকজন সাহসী মানুষ শহীদদের মরদেহ সংগ্রহ করে খালের পাড়ে গণকবর দেন। ধামরাইয়ের এই নৃশংসতা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার এক নির্মম সাক্ষ্য হয়ে আজও স্মরণীয়।

সূত্র: ঢাকা ১৯৭১: ধামরাই গণহত্যা — বাশার খান ও জাহিদ হাসান।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন