দেশের প্রখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার শিক্ষাবিদ দেশের গর্ব

লদাখের প্রখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk) তাঁর পরিবেশবান্ধব এবং বাস্তবমুখী আবিষ্কারের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তিনি মূলত এমন সব প্রযুক্তি তৈরি করেছেন যা পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
নিচে তাঁর কয়েকটি প্রধান আবিষ্কার এবং পেটেন্ট সংক্রান্ত বাস্তব তথ্য তুলে ধরা হলো:
১. আইস স্তূপ (Ice Stupa)
এটি সোনম ওয়াংচুকের সবচেয়ে বিখ্যাত আবিষ্কার। লদাখের তীব্র জলের সংকট মেটানোর জন্য তিনি কৃত্রিম হিমবাহ বা 'আইস স্তূপ' তৈরি করেন। শীতকালে যে জল নদী দিয়ে বয়ে নষ্ট হয়ে যায়, তাকে পাইপের মাধ্যমে এনে উলম্বভাবে (vertically) স্প্রে করা হয়। লদাখের তীব্র ঠান্ডায় সেই জল জমে বরফের পাহাড় বা স্তূপের আকার নেয়। বসন্তকালে যখন চাষবাদের জন্য জলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়, তখন এই বরফ গলে চাষীদের জলের জোগান দেয়। এই অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তিনি ২০১৬ সালে মর্যাদাপূর্ণ Rolex Award for Enterprise লাভ করেন।
২. সৌর-উত্তপ্ত মাটির ঘর (Solar-Powered Eco-Buildings / Mud Houses)
সোনম ওয়াংচুকের প্রতিষ্ঠিত SECMOL (Students' Educational and Cultural Movement of Ladakh) ক্যাম্পাসে তিনি এমন কিছু মাটির বাড়ি তৈরি করেছেন যা সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে চলে। লদাখের শীতকালে যখন বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়, তখনো এই বাড়িগুলোর ভেতরে কোনো কৃত্রিম হিটার বা জ্বালানি ছাড়াই তাপমাত্রা প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি (প্লাস) থাকে। মাটির দেয়াল, সঠিক দিক-নির্দেশনা এবং সৌর তাপ ধরে রাখার বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছে।
৩. সৌর-উত্তপ্ত সামরিক তাঁবু (Solar-Heated Military Tent)
ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য তিনি একটি বিশেষ পরিবেশবান্ধব তাঁবু তৈরি করেন। লদাখের গালওয়ান উপত্যকার মতো অতি-শীতল দুর্গম এলাকায় ডিউটি করার সময় সেনাদের গরম রাখতে প্রচুর কেরোসিন বা জ্বালানি পোড়াতে হতো, যা পরিবেশের ক্ষতি করত এবং ব্যয়বহুল ছিল। সোনম ওয়াংচুকের তৈরি এই তাঁবুটি দিনের বেলার সৌরশক্তিকে ধরে রাখে এবং রাতে তাঁবুর ভেতরের অংশকে গরম রাখে। ৩০ থেকে ৫০ জন সেনা ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই তাঁবুটি সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত।
পেটেন্ট অর্ডার (Patent Order) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
সোনম ওয়াংচুকের আবিষ্কারগুলোর পেটেন্ট নিয়ে একটি অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক এবং ব্যতিক্রমী দিক রয়েছে, যা জানা প্রয়োজন:
> সোনম ওয়াংচুক তাঁর আবিষ্কারগুলোর কোনো বাণিজ্যিক পেটেন্ট (Commercial Patent) নিজের নামে করাননি।
তিনি বিশ্বাস করেন যে, তাঁর উদ্ভাবনগুলো মানবকল্যাণ এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য। যদি তিনি এগুলোর পেটেন্ট নিজের নামে আটকে রাখতেন, তবে সাধারণ মানুষ বা অন্য কোনো সমাজকর্মী ফ্রিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারতেন না।
 * উন্মুক্ত প্রযুক্তি (Open-Source Technology): তিনি তাঁর তৈরি 'আইস স্তূপ' বা সোলার টেন্টের ডিজাইন ও প্রযুক্তিকে Open-source বা সবার জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছেন।
 * উদ্দেশ্য: পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষ (যেমন সিকিম, সুইজারল্যান্ড বা পেরুর পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দারা) যেন কোনো আইনি বা আর্থিক বাধা ছাড়াই এই প্রযুক্তি দেখে নিজেদের এলাকায় জলসংকট মেটাতে 'আইস স্তূপ' তৈরি করে নিতে পারেন।
তাই প্রচলিত বাণিজ্যিক পেটেন্ট অর্ডারের তালিকায় তাঁর নাম না থাকলেও, তাঁর এই "ওপেন-সোর্স" বা উন্মুক্ত উদ্ভাবনী নীতি বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান মহলে অত্যন্ত প্রশংসিত।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন