জয়শ্রী বসু ,সাংবাদিক :"যেখানে ভগবান নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন"

পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই এমন এক অলৌকিক ঐতিহ্য আছে যেখানে বিশ্বাস করা হয়— ভগবান নিজেই অসুস্থ হন, বিশ্রাম নেন, সেবা গ্রহণ করেন এবং তারপর আবার নতুন রূপে ভক্তদের কাছে ফিরে আসেন। ভগবান জগন্নাথদেবের এই লীলাই সেই বিরল অনুভূতির নাম। 

পুরীর পবিত্র জগন্নাথ মন্দির এ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য চলে আসছে। এখানে ভগবানকে শুধু পূজার দেবতা হিসেবে দেখা হয় না— তাঁকে পরিবারের একজন, আপনজন, জীবন্ত উপস্থিতি হিসেবে অনুভব করা হয়। আর সেই কারণেই তাঁর দৈনন্দিন সেবা, বিশ্রাম, আহার, উৎসব— সবকিছু মানুষের মতো করেই পালন করা হয়।
*স্নানযাত্রা*-- ভগবানের মহাস্নান -
এই দিনটি জগন্নাথ সংস্কৃতির অন্যতম পবিত্র দিন। এই দিনে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাকে মন্দির থেকে বিশেষ স্থানে এনে ১০৮ ঘড়া সুগন্ধি ও পবিত্র জলে মহাস্নান করানো হয়। এই ১০৮ সংখ্যাটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ— বহু আধ্যাত্মিক প্রথায় এটি পূর্ণতা, ভক্তি ও ঐশ্বরিকতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
স্নানের সময়—
• শঙ্খধ্বনি শোনা যায়
• মন্ত্রোচ্চারণ হয়
• ভক্তরা জয়ধ্বনি দেন
• চারদিকে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়
সবাই আনন্দে ভরে ওঠেন l
কিন্তু এই আনন্দের পরেই শুরু হয় এক গভীর আবেগের অধ্যায় l
*অনবসর*  -- ভগবানের ‘জ্বর’ ও বিশ্রাম
প্রায় ১৫ দিন
ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এত বড় মহাস্নানের পর ভগবান জগন্নাথদেব জ্বরে আক্রান্ত হন। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ— এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দাবি নয়, এটা ধর্মীয় বিশ্বাস ও লীলার অংশ। ভক্তদের কাছে এই সময়টি ভগবানের মানবিক প্রকাশের প্রতীক। এই সময়— মন্দিরের দরজা সাধারণ দর্শনের জন্য বন্ধ থাকে l
রাজবৈদ্যরা ঐতিহ্যগত নিয়মে ভেষজ সেবা করেন l
 নিয়মিত জাঁকজমক কমে যায়,
ভক্তরা দর্শন ছাড়াই প্রার্থনা করেন l
এই সময়কে অনেক ভক্ত সবচেয়ে আবেগের সময় মনে করেন। কারণ…সারা বছর যাঁকে প্রতিদিন দেখতে পাওয়া যায়— হঠাৎ কয়েকদিন তাঁকে আর দেখা যায় না…
সেই অনুপস্থিতিই ভক্তদের কাছে উপস্থিতির মূল্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
অপেক্ষার 
১৫ দিনে ভক্তদের মনে একটাই অনুভূতি থাকে—
“প্রভু এখন বিশ্রামে আছেন…” অনেকেই বিশ্বাস করেন—
এই লীলা যেন মানুষকে শেখায়—যেমন মানুষ অসুস্থ হলে বিশ্রাম নেয়, তেমনি জীবনের গতি কমিয়ে নিজের যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ভগবানের এই বিশ্রামের সময় ভক্তদের মধ্যেও ধৈর্য, অপেক্ষা আর সংযমের অনুভূতি তৈরি করে।
 নবযৌবন দর্শন---  ফিরে আসার মুহূর্ত l
১৫ দিন অপেক্ষার পর আসে সেই দিন—
যেদিন বিশ্বাস করা হয় ভগবান সুস্থ হয়ে নতুন জ্যোতি ও নতুন রূপে আবার দর্শন দেন। এই দর্শনকে বলা হয়—
নবযৌবন দর্শন l অনেক ভক্তের কাছে এই দিনটা শুধু দর্শন নয়—এটা আবার দেখা হওয়ার আনন্দ।

*রথযাত্রা* -‐-  ভগবান নিজেই ভক্তদের কাছে আসেন l
এই দিন শুরু হয় মহামহিম রথযাত্রা l সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো— এই দিনে ভক্তদের মন্দিরে যেতে হয় না—
ভগবান নিজেই রথে চড়ে মানুষের কাছে চলে আসেন।
এ কারণেই রথযাত্রাকে শুধু উৎসব নয়—ভগবান ও মানুষের দূরত্ব ভেঙে দেওয়ার প্রতীকও বলা হয়।
এই লীলার গভীর অর্থ
• ভগবানকে শুধু দূরের শক্তি নয়, কাছের অনুভূতি হিসেবে দেখা l
• অপেক্ষা মানুষকে সম্পর্কের মূল্য শেখায় l
• ভক্তি শুধু আচার নয়— অনুভবও l
• দর্শনের আনন্দ অপেক্ষার পর আরও গভীর হয় l
  কোটি কোটি মানুষ আজও একটাই কথা বলেন—
“প্রভু, তুমি আমাদের অনুভূতির মধ্যেই আছো…” l
এবছর ২৯ শে জুন সোমবার বাংলা পঞ্জিকায় ১৪ই আষাঢ় স্নানযাত্রা হয়েছে l বাংলা পঞ্জিকা র ৩১ আষাঢ় ইংরাজির ১৬ই জুলাই বৃহস্পতিবার রথযাত্রা সম্পন্ন হবে l
আবার ৭ শ্রাবণ ২৪ শে জুলাই শুক্রবার উল্টোরথ l

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন