মেঘালয়ের পরিচ্ছন্ন গ্রাম ভারতে নেই

মেঘালয়ের নাম শুনলেই সবুজ পাহাড় আর নির্মল প্রকৃতির ছবি চোখে ভেসে ওঠে। কিন্তু এই রাজ্যেই রয়েছে এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য। একদিকে মাওলিনং, যাকে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম বলা হয়। অন্যদিকে বর্ণিহাট, যা বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহরের তালিকায় উঠে এসেছে। মাত্র অল্প দূরত্বের ব্যবধানে পরিবেশ রক্ষার অসাধারণ উদাহরণ আর দূষণের কঠিন বাস্তবতা কীভাবে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেই গল্পই এই প্রতিবেদনে।

----

মেঘালয়ের নাম শুনলেই হয়তো তোমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজ পাহাড়, মেঘে ঢাকা উপত্যকা আর ঝরনার ছবি। কিন্তু এই রাজ্যকে ঘিরে এমন একটি বাস্তবতা রয়েছে, যা প্রথম শুনলে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক। একই রাজ্যের একদিকে রয়েছে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলিনং, অন্যদিকে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহরের তালিকায় উঠে আসা বর্ণিহাট। মাত্র কয়েক দশ কিলোমিটারের ব্যবধানে প্রকৃতি সংরক্ষণ আর পরিবেশ দূষণের এমন দুই বিপরীত ছবি একসঙ্গে খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয়, বর্ণিহাটের দূষণ, শিল্পাঞ্চল এবং পরিবেশগত সমস্যার বিভিন্ন দিক আমরা ইতিমধ্যেই একটি আলাদা প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। তাই এই প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য সেই একই রাজ্যের আরেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশগত বাস্তবতাকে তুলে ধরা।

মাওলিনং পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার একটি ছোট গ্রাম। শিলং থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশ সীমান্তও খুব দূরে নয়। গ্রামটির জনসংখ্যা আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ জনের মধ্যে। উনিশশো তিন সালে একটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ পত্রিকা মাওলিনংকে "এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম" হিসেবে পরিচিতি দেওয়ার পর থেকেই এটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। এরপর থেকে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক প্রতিবছর এই গ্রামে আসেন শুধুমাত্র পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার জন্য।

মাওলিনংয়ের পরিচ্ছন্নতার পেছনে রয়েছে গোটা গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। গ্রামের প্রায় প্রতিটি রাস্তার ধারে বাঁশ দিয়ে তৈরি আবর্জনার পাত্র রাখা আছে। প্লাস্টিক বর্জ্য যেখানে সম্ভব আলাদা করা হয় এবং জৈব বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে পচিয়ে সার তৈরি করা হয়। রাস্তা, বাড়ির উঠোন কিংবা জনসমাগমের জায়গায় আবর্জনা ফেলা কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। শুধু বড়রা নন, ছোটরাও ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার শিক্ষা পায়। ফলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এখানে কোনো সরকারি কর্মসূচি নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনযাপনেরই একটি অংশ।

গ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পরিবেশ রক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবনধারা। অনেক বাড়িতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। চারপাশের গাছপালা ও সবুজ পরিবেশ অযথা নষ্ট না করার বিষয়ে সবাই সচেতন। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও গ্রামের বাসিন্দারা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার নিয়মে কোনো ছাড় দেন না। এই কারণেই বহু বছর ধরে মাওলিনং তার পরিচিতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এখানকার পরিচ্ছন্ন রাস্তা, ফুলে সাজানো বাড়ির সামনের অংশ এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ আজও বহু মানুষের কাছে একটি আদর্শ উদাহরণ।

অন্যদিকে একই মেঘালয়ের বর্ণিহাটের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আসাম-মেঘালয় সীমান্তবর্তী এই শিল্পাঞ্চল সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহরের তালিকায় উঠে এসেছে। বায়ুতে ক্ষুদ্র কণার মাত্রা, বিশেষ করে পিএম টু পয়েন্ট ফাইভের ঘনত্ব, বহু সময় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রেকর্ড হয়েছে। শিল্পকারখানা, ভারী যানবাহনের চলাচল, নির্মাণকাজ থেকে উড়ে আসা ধুলো এবং অন্যান্য দূষণের উৎস মিলিয়ে এখানকার বাতাসের মান দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। এই বিষয়গুলির বিস্তারিত বিশ্লেষণ আমরা বর্ণিহাট নিয়ে প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে ইতিমধ্যেই তুলে ধরেছি।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, একটি রাজ্যের মধ্যেই পরিবেশ রক্ষার সফল উদাহরণ এবং পরিবেশ দূষণের কঠিন বাস্তবতা পাশাপাশি অবস্থান করছে। একদিকে কয়েকশো মানুষের একটি গ্রাম বহু বছর ধরে পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। অন্যদিকে শিল্পায়নের চাপে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা বায়ুদূষণের জন্য বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। এই দুই জায়গার মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জীবনধারা এবং উন্নয়নের ধরণে পার্থক্য এতটাই স্পষ্ট যে একই রাজ্যের দুই প্রান্ত যেন দুটি ভিন্ন পৃথিবীর প্রতিনিধিত্ব করে।

#Meghalaya #Mawlynnong #Byrnihat #Environment #AirPollution #CleanVillageমেমেঘা

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন