ভারতের আকাশ থেকে জলভরা মেঘ হারিয়ে গেছে ,ভয়ঙ্কর দিন আসছে

জুনের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের বর্ষা যেন হঠাৎ থমকে গিয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেশের বড় অংশ থেকে মৌসুমি মেঘ প্রায় অদৃশ্য, বৃষ্টির ঘাটতি পৌঁছেছে ৬৪ শতাংশে। এর মধ্যেই দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো। অন্যদিকে মুম্বইয়ের সাতটি প্রধান জলাধারে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ১০.৩৫ শতাংশ জল। আবহাওয়া, জলসংকট এবং কৃষি—তিন দিক থেকেই বাড়ছে উদ্বেগ।

-----

জুন মাসের মাঝামাঝি এসে ভারতের আকাশ যেন হঠাৎ বদলে গেল। সাধারণত এই সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর ঘন মেঘে ঢেকে থাকে দেশের বড় অংশ। কিন্তু ১৪ এবং ১৫ জুনের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য দৃশ্য। ভারতের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহ আইএনস্যাট-৩ডিএস-এর ছবিতে দেখা যায়, মধ্য ভারত, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, তেলঙ্গানা এবং উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অংশ থেকে বর্ষার ঘন মেঘ কার্যত উধাও। জুনের শুরু থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত দেশে মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ১৯.২ মিলিমিটার, যেখানে স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল ৫৩.৭ মিলিমিটার। অর্থাৎ মাত্র এগারো দিনের মধ্যে বৃষ্টির ঘাটতি পৌঁছে গিয়েছে ৬৪ শতাংশে।

এই পরিস্থিতিকে অনেক সংবাদমাধ্যম "মৌসুমি বায়ু উধাও" বলে উল্লেখ করলেও আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এটি আসলে মৌসুমি বায়ুর একটি দীর্ঘ বিরতি বা "মনসুন ব্রেক"। মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি সরে যায়নি, কিন্তু বৃষ্টির মেঘ তৈরির প্রক্রিয়া হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর পিছনে রয়েছে বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে তৈরি হওয়া এক জটিল অবস্থা। পশ্চিমী জেট স্ট্রিম স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক দক্ষিণে নেমে এসেছে এবং সেটি পূর্বী জেট স্ট্রিমের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ফলে আর্দ্র বায়ু উপরের দিকে উঠতে পারছে না, মেঘ তৈরি হচ্ছে কম, আর বৃষ্টিও দ্রুত কমে গিয়েছে।

এর মধ্যেই নতুন উদ্বেগের নাম এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের নিনো ৩.৪ অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ০.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। ইউরোপের একাধিক আবহাওয়া মডেল জানাচ্ছে, বছরের শেষে এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যদি সেই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে এটি গত কয়েক দশকের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হয়ে উঠতে পারে। এল নিনো সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের উপর বৃষ্টিপাতের অঞ্চলকে পূর্ব দিকে সরিয়ে দেয়, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে ভারতের বর্ষার উপর। সেই কারণেই ভারতের আবহাওয়া দফতর ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

বর্ষার এই দুর্বলতার প্রথম বড় ধাক্কা অনুভব করছে মুম্বই। শহরের সাতটি প্রধান জলাধারে এখন মোট জল মজুত রয়েছে মাত্র ১০.৩৫ শতাংশ। এই জলাধারগুলির মধ্যে রয়েছে আপার বৈতারণা, মোদক সাগর, তানসা, মিডল বৈতারণা, ভাতসা, বিহার এবং তুলসি। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক যে বৃহন্মুম্বই পুরসভা নতুন নির্মাণ প্রকল্পে পানীয় জলের সরবরাহ বন্ধ করেছে। সুইমিং পুলে পুরসভার জল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে জলের সরবরাহে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কাটছাঁট করা হয়েছে এবং আবাসিক এলাকায় ১০ শতাংশ জলকাটার নিয়ম বহাল রয়েছে।

মুম্বইয়ের বৃষ্টির ছবিটাও একই রকম উদ্বেগজনক। শহরের সান্তাক্রুজ আবহাওয়া কেন্দ্রে জুন মাসে এখনও পর্যন্ত মাত্র ১৩.১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। কোলাবায় সেই পরিমাণ আরও কম, মাত্র ৫ মিলিমিটার। অথচ জুন মাসে মুম্বইয়ের গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৫২৬ মিলিমিটার। অর্থাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টির ঘাটতি কয়েকশো মিলিমিটারে পৌঁছে গিয়েছে। মহারাষ্ট্রের জলাধারগুলিতে গড়ে মাত্র ২৪.৫৩ শতাংশ জল অবশিষ্ট রয়েছে এবং বহু এলাকায় ইতিমধ্যেই জলবাহী ট্যাঙ্কারের উপর নির্ভরতা বাড়তে শুরু করেছে।

একদিকে স্যাটেলাইট ছবিতে মেঘহীন আকাশ, অন্যদিকে দ্রুত শক্তিশালী হতে থাকা এল নিনো, তার সঙ্গে জলাধারে বিপজ্জনক হারে কমতে থাকা জলস্তর—এই তিনটি ঘটনাই এখন একই সময়ে ভারতের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। জুনের মাঝামাঝি সময়ে দেশের বর্ষার যে ছবি সামনে এসেছে, তা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি অস্বস্তিকর এবং আবহাওয়াবিদদের নজর এখন পুরোপুরি জুলাই ও অগস্ট মাসের উপর।

#Monsoon #ElNino #ClimateChange #IndiaWeather #Mumbai #Rainfall

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন