তিরোধান দিবসে শ্রদ্ধা :শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী সাম্প্রদায়িক নন ছিলেন জন নায়ক

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি – সাম্প্রদায়িক না জননায়ক..?🩷🌻

.... নেহেরু শ্যামাপ্রসাদ সংঘাত ৮ই এপ্রিল, ১৯৫০’এর নেহেরু–লিয়াকত চুক্তির পর, বিস্ফোরণের আকার নিলো। শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। বিদায়ী ভাষণে বললেন — ❝ দেশভাগ অবশ্যম্ভাবী দেখে আমি বাংলা ভাগ করার পক্ষে জনসমর্থন সংগ্রহ করেছিলাম। নইলে জানতাম, সমগ্র বাংলা এমনকি অসমও পাকিস্তানে চলে যেত। আমি পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের আশ্বাস দিয়েছিলাম ভবিষ্যতে পাকিস্তান সরকার দ্বারা অত্যাচারিত হলে , নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে , জীবন ও সম্মানের ওপর অসম্মান নেমে এলে , ভারতবর্ষ দর্শক হয়ে থাকবে না। কিন্তু গত আড়াই বছর ধরে তাদের ওপর অকথ্য নিপীড়ণের ঝড় বয়ে গেছে। আমি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারিনি। তাই এই সরকারে থাকার নৈতিক দায়িত্ব আমার নেই।❞💥🔴

সন ১৯৪০, তিনি হিন্দু মহাসভার সভাপতি নির্বাচিত হলেন। স্বয়ং গান্ধীজি তাঁর গলায় মালা পড়িয়ে বলেছিলেন, এদেশে হিন্দুদের নেতা হিসেবে আপনিই হলেন মালব্যজীর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী। আপনার জয় হোক। পরবর্তীকালে এই গান্ধীজীই তাঁকে স্বাধীন ভারতের প্রথম জাতীয় সরকারে অন্তর্ভুক্তির ডাক দিয়েছিলেন। প্যাটেলের সঙ্গে তুলনামূলক বিচার করে বলেছিলেন – ❝ Patel is a Congressman with a Hindu mind. you are a Hindu Sevaite with a Congress mind.❞

আবার ১৯৪২ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম মধুপুর থেকে তাঁকে চিঠিতে লেখেন, ❝ এই কোয়ালিশন মিনিস্ট্রির একমাত্র আপনাকে আমি অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি আর কাউকে নয়। আমরাই দেশকে পূর্ণ স্বাধীন করবো। সেদিন বাঙালির আপনাকে ও সুভাষ বোসকে সকলের আগে মনে পড়বে। আপনারাই হবেন এদেশের সত্যিকারের নায়ক...।❞🩷🌿

তিনি হুগলির জেলার জিরাট গ্রামের গঙ্গাপ্রসাদ মুখার্জীর পৌত্র, বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র তথা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ব কনিষ্ঠ উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। ১৯৩৪ সালে যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত কবি রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে প্রথা ভেঙে বাংলা ভাষায় ভাষণদান করান। উদ্দেশ্য – বঙ্গজাতির আত্মসম্মান পুনরুদ্ধার। 

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর পর একমাত্র বাঙালি যার রয়েছে সর্বভারতীয় পরিচিতি!🌸🇮🇳

স্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন শিল্প মন্ত্রী। স্থাপন করেছিলেন চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানা, হিন্দুস্থান এরোনোটিক্স, সিন্ধ্রি ফার্টিলাইজার ইত্যাদি ভারী শিল্প। স্বীকৃতি দিয়েছিলেন সমবায়ের মাধ্যমে শিল্প পরিচালনার। আবার কোনো এক ক্যাবিনেট বৈঠকে নেহেরুর কাছে শুনেও ছিলেন – ডিপার্টমেন্টটা তো পশ্চিমবঙ্গ বানিয়ে ফেললেন। চটজলদি উত্তর ছিল, ❝ এই ব্যাপারে আমি রাজাজীকে অনুসরণ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করি।❞🌻

দুই নেতায় ঠুকঠাক লেগেই থাকতো পার্লামেন্টে | নেহেরুর সমঝে চলার পাত্র বলতে ছিলেন প্যাটেল আর শ্যামাপ্রসাদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর শিল্পমন্ত্রীর মধ্যে অমিলের মতো মিলও ছিল লক্ষণীয়।। দুজনই গান্ধীর বশংবদ ছিলেন না। শিখ শরণার্থীরা যখন দিল্লির মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিল গান্ধীর নির্দেশ ছিল ধর্মস্থল খালি করার। প্যাটেল মানেননি। পদত্যাগের হুমকি দিয়েছিলেন। দুজনই নেহেরুপন্থীদের কাছে ছিলেন ব্রাত্য, কম্যুনিস্টের কাছে প্রতিক্রিয়াশিল। আর তাই বুঝি প্যাটেল মারা যাবার পরে লেখা হয়েছিল – ❝ Mantle of Sardar Patel had fallen on Dr.Shyamaprosad Mookherjee..❞ 

যাইহোক নেহেরু শ্যামাপ্রসাদ  সংঘাত ৮ই এপ্রিল , ১৯৫০’এর নেহেরু–লিয়াকত চুক্তির পর, বিস্ফোরণের আকার নিলো। শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। বিদায়ী ভাষণে বললেন — ❝ দেশভাগ অবশ্যম্ভাবী দেখে আমি বাংলা ভাগ করার পক্ষে জনসমর্থন সংগ্রহ করেছিলাম। নইলে জানতাম, সমগ্র বাংলা এমনকি অসমও পাকিস্তানে চলে যেত। আমি পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের আশ্বাস দিয়েছিলাম ভবিষ্যতে পাকিস্তান সরকার দ্বারা অত্যাচারিত হলে , নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে , জীবন ও সম্মানের ওপর অসম্মান নেমে এলে , ভারতবর্ষ দর্শক হয়ে থাকবে না। কিন্তু গত আড়াই বছর ধরে তাদের ওপর অকথ্য নিপীড়ণের ঝড় বয়ে গেছে। আমি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারিনি। তাই এই সরকারে থাকার নৈতিক দায়িত্ব আমার নেই।❞ আর এরপরেই তাঁর কাশ্মীর অভিযান....।🔴

২৬’শে অক্টবর , ১৯৪৭ জম্মু-কাশ্মীর নিঃশর্তে ভারতবর্ষে যোগদান করে। পরে পরেই নেহরুর প্রস্তাব অনুযায়ী ভূস্বর্গে বলবৎ করা হলো আলাদা আইন , আলাদা পতাকা এমনকি আলাদা প্রধানমন্ত্রীও। সংযুক্ত থাকা সত্ত্বেও সেখানে প্রবেশ অনুমতিপত্রের বিধি কায়েম করা হলো যার আওতায় পড়লেন ভারতের রাষ্ট্রপতিও। ভীষণ এক ভবিষ্যতের রক্তক্ষয়ী চিত্র দেখে শিউরে উঠলেন শ্যামাপ্রসাদ। শেখ আব্দুল্লাহকে লিখলেন, ❝ You are now developing a three-nation theory, the third being the ‘Kashmir nation’. These are dangerous symptoms and not good for your state or the whole of India.❞

পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে নেহেরুকে প্রশ্ন করলেন — ❝ Are Kashmiris Indians first and Kashmiris next, or are they Kashmiris first and Indians next, or are they Kashmiris first, second and third and not Indian at all?❞ তারপর নেহেরুর নিরুত্তর অবস্থান দেখে বলেছিলেন : ❝ Nehru claims to have discovered India. But he has yet to discover his mind ❞

সেই সময় আব্দুল্লাহর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে , কেন্দ্রের ৩৭০ ধারার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী জম্মু প্রজা পরিষদের আন্দোলনে উপত্যকা উত্তাল। পুরোভাগে প্রেমনাথ ডোগরা। ধরপাকড় , নৃশংস অত্যাচার চলছে চতুর্দিকে। শামিল হতে শ্যামাপ্রসাদ বেরিয়ে পড়লেন ৮’ই মে , ১৯৫৩। সঙ্গে অটলবিহারী বাজপেয়ী, বলরাজ মাধক, টেক চাঁদ, গুরু দত্ত বৈদ্য। উদ্দেশ্য : সমস্ত কিছু সরেজমিনে দেখে শেখ আব্দুল্লাহর সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে দুই যুযুধান দলের মধ্যে সমঝোতা সূত্র বের করা। প্রথমে অমৃতসর, তারপর পাঠানকোট হয়ে পৌঁছলেন উধমপুর।

সেখান থেকে জম্মু সীমান্তে ঢুকতেই তাওয়াই ব্রিজের ওপর গ্রেপ্তার। অপেক্ষমান সমর্থকদের চোখের সামনে দিয়ে জীপে করে শ্রীনগর সেন্ট্রাল জেল। সেখান থেকে ডাল লেকের পাশে ছোট্ট একটা কটেজ , ১০’ বাই ১১’ বর্গফুটের ঘর। হাঁটা চলার জায়গা বলতে এক চিলতে উঠোন। নেহেরু যদিও পুত্রহারা যোগমায়া দেবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন –❝ আপনার ছেলে ছিল রাজ সমাদরে। শুনেছি বিলাস ব্যাসনের আয়োজন ছিল ত্রূটিহীন...!❞🌿

আব্দুল্লাহর রাজ্যে বন্দি হলেন সংসদের বিরোধী নেতা তথা প্রধান মুখপাত্র। অতঃপর শরীর খারাপের শুরু। পায়ে ভেরিকোজ ভেনের অসহ্য ব্যাথা। কাতর বন্দির বারবার ব্যক্তিগত চিকিৎসক বিধান রায়’এর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবার , আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবার একান্ত প্রার্থনা। এবং বারবারই নাকচ। এলার্জির কারণে রোগীর অসম্মতি ছিল স্ট্রেপ্টোমাইসিন ওষুধে। জেলের ডাক্তার আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘ভ্রান্ত ধারণা’। 

অবস্থার অবনতি হতে থাকলো ক্রমশ। দুটো হার্ট এটাক আগেই হয়েছিল। এবার হলো তৃতীয়টি। সেই মুমূর্ষু অবস্থায় , ‘উন্নত’ চিকিৎসার জন্য তাঁকে খাড়াই লম্বা সিঁড়ি হাঁটিয়ে তোলা হলো সরকারি হাসপাতালের মেটারনিটি ওয়ার্ডে। এবং সেখান থেকেই সহকর্মী ব্যারিস্টার ত্রিবেদী, সহবন্দী টেক চাঁদ, গুরু দত্ত খবর পেলেন ২৩’শে জুন ভোরে , শ্যামা প্রদীপ নেভার মুখে। পরের দিনই ছিল আদালতে তাঁর কৃত হেবিয়াস কর্পাস মামলার চূড়ান্ত শুনানি তথা বিচারপতির অবিলম্বে ‘বন্দিমুক্তি’র রায়ে দেবার কথা।

মরদেহ দমদম বন্দরে পৌঁছুতে দেরি করেছিল ছয় ঘন্টা। রাত গভীর হলেও অপেক্ষায় ছিল রাজ্যবাসী, কাতারে কাতারে, দোকান অফিস সিনেমা থিয়েটার বন্ধ করে। সবাইকার মুখে একটাই কথা – আমরা সুভাষকে হারিয়েছি, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ ছিল মাথার ওপর। এই মহামরণ, একি স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি আরো এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক অপসারণ। বাঙালির পিঠে আবার ছুরি...?💥🔴

ডুকরে উঠেছিলেন ৮২ বছরের মা-যোগমায়া দেবী। বিধান রায়ের হাত ধরে বলেছিলেন – বিধান তুমি আমার শ্যামার মতো। তুমি তো ছিলে তবু আমার ছেলে কি করে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলো? অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হলো — ❝ আজ শোকে মুহ্যমান হইয়া বাংলার দুর্ভাগ্য ও বাঙালি সমাজের দুর্ভাগ্য সমস্ত মন দিয়া অনুভব করিয়াছি। হায় অভিশপ্ত ভূমি..! তোমার নেত্রী স্থানীয় সন্তানদের জীবন কোনোক্রমে পঞ্চাশের সীমানা অতিক্রম করিতে চাহে না...।❞🌷

তাঁর জীবনাবসানের কিছু দিনের মধ্যে ভারত সরকার , কাশ্মীরে প্রবেশ করার পারমিট সিস্টেম বাতিল করে। অ্যাংলো-মার্কিন ব্লকের পৃষ্ঠপোষকতায় শেখ আব্দুল্লাহ’র ‘ আজাদ কাশ্মীর’এর ডাক নেহেরুকে প্রকৃত শত্রুর মুখ দেখালো..🔴

আজ প্রয়াণ দিবসে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি..🙏

         🌲সংকলনে ✒️ স্বপন সেন🌲 

♦️তথ্য সৌজন্যেঃ দেবাশীষ দত্ত (কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল ও কলেজের ছাত্র। পরবর্তীকালে স্টেটসম্যান ও হিন্দু পত্রিকায় কলাম রাইটার।), অমৃতবাজার, যুগান্তর, সংবাদপত্রের বিবরন ইত্যাদি।

© এক যে ছিলো নেতা 

| #এক_যে_ছিলো_নেতা |

📌 Facebook এর পাশাপাশি আমরা পথচলা শুরু করেছি YouTube এও.. আমাদের কাজ ভালো লাগলে আমাদের channel টি Subscribe করে পাশে থাকবেন..

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন