ভয়ঙ্কর এক সময়ের মধ্যে চলছে

ভয়ঙ্কর এক সময়ের মধ্যদিয়ে চলেছি। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিণতি কি হতে পারে কল্পনা করার মতো বোধ শক্তিও হয়তো হারিয়ে ফেলেছি। তৃণমূলরা মার খাচ্ছে, ওদের ডিম ছুঁড়ে মারছে, চোর চোর রব উঠছে দেখে হয়ত মজা পাচ্ছি, উৎফুল্ল হচ্ছি, কিন্তু এর পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। নিজের ঘরে আগুন না লাগলে সুবিধাবাদী আমরা কোনোদিনই নড়ি চড়িনা।
নিচের লেখাটিতে অত্যন্ত বাস্তব মানসিকতা তুলে ধরা হয়েছে, তাই রাখলাম আমার টাইমলাইনে।

'আমি জনরোষ'
সঞ্চিতা চক্রবর্তী 

আজ আমি তৃণমূলকে ডিম ছুঁড়ছি—কারণ রাজপথের গরম হাওয়া আর আমার ভেতরের সস্তা উত্তেজনা, দুটোকেই একটু ঠান্ডা করা দরকার।
কাল আমার নিশানা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়ে ঠিক সেই ‘বুম্বাদা’ ম্যাজিকটা পেলাম না মশাই! টিকিট কেটেছি বলে কি পর্দায় ওঁর ওপর এই একাধিপত্যটুকুও জাহির করতে পারব না? থিয়েটার হল থেকে বেরিয়েই তাই অমলেট বানানোর প্রস্তুতি।
পরশু ডিম উড়ে যাবে এক তরুণীর দিকে। ভরদুপুরে ওর শাড়ির ফাঁক দিয়ে পেট দেখা যাচ্ছে কেন? সমাজ সংস্কারের ঠিকাদারি তো আমারই কাঁধে। নিজের চোখের লালসা ঢাকতে ওর পিঠেই না হয় গোটা কয়েক ডিম ভাঙা যাক।
তরশু আমার শিকার মহামান্য বিচারক। আমি চেয়েছিলাম অপরাধীটার অন-স্পট ‘এনকাউন্টার’ হোক, ধোঁয়া ওড়া বন্দুকের নলে হাততালি দিক জনতা। আর উনি কি না আইন-কানুন, তথ্য-প্রমাণ ঘেঁটে তাকে স্রেফ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে দিলেন? আইনের হাত লম্বা হতে পারে, কিন্তু আমার ডিম ছোঁড়ার হাত তার চেয়েও লম্বা। ওদিকে যে দেশের সংবিধান আজ বিপন্ন, সে খেয়াল আমার নেই। আইনের শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমি নিজেই যখন মস্ত বড়ো আদালত!
তার পরের দিন রাস্তায় পড়বেন এক বৃদ্ধ। রাস্তা পার হতে ওঁর বড্ড সময় লাগে মশাই! লাঠি ঠুকে ঠুকে যেন কচ্ছপের গতিতে হাঁটছেন। ওঁর ওই থরথরে বার্ধক্যের জন্য আমার দামি গাড়ির এসি-র হাওয়া নষ্ট করে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে? ওঁর পিঠেই আজ একটা ডিমের ‘স্পিড ব্রেকার’ তৈরি হোক।
একদিন তো ডাক্তারবাবুর চেম্বারেও হানা দিতে হবে। এত টাকা ভিজিট নেন, অথচ প্রেসক্রিপশন লেখার সঙ্গে সঙ্গেই রোগ হাওয়া হয়ে যায় না কেন? ওঁর স্টেথোস্কোপ লক্ষ্য করেই উড়ে যাবে একটা পচা ডিম।
তার পরের দিন নদীর ধারের সেই প্রেমিক দম্পতি। শান্ত বিকেলে দিব্যি হাত ধরাধরি করে গান গাইছিলেন। কিন্তু আমার কানের পর্দায় ওটা বড্ড ‘বেসুরো’ ঠেকল। রোম্যান্স করার এতই শখ, তো সুরে গেয়ে দেখাও! চলল ডিম।
এরপর তালিকাটা আরও লম্বা। আমার বাচ্চার চেয়ে যে সহপাঠী বেশি নম্বর পেয়েছে, তার পিঠে ডিম। আমার স্ত্রী বা বান্ধবীর চেয়ে যে বন্ধুপত্নী বেশি গুণী আর সুন্দরী, তাঁর মুখে ডিম। সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত, নির্বিবাদী, ভদ্র যে বাংলা ভাষার অধ্যাপক বেশি মাইনে পান, ওঁর ওই আভিজাত্যটা নষ্ট করতে ওঁর ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিতে ডিম।
সবশেষে, ডিম উড়ে যাবে সেই নিরীহ ডাকপিয়নের মুখ লক্ষ্য করে। রোদ-জল মাথায় করে ও রোজ এ বাড়ি ও বাড়ি ঘোরে, অথচ আমার নামে একটাও চিঠি আনে না! এই একাকীত্বের দায় তো ওকেই নিতে হবে।
আমি বুঝতে চাই না যে আমার এই অন্ধ তাণ্ডবে আপনিও আজ শান্তিতে কিংবা নিরাপত্তায় নেই। আপনার ঘরের দরজাতেও কাল আমার ছোঁড়া ডিম বা পাথর এসে পড়তে পারে, এই বোধটুকু আমার লোপ পেয়েছে। আমি কোনো নিয়ম মানি না, আমি কোনো যুক্তি বুঝি না। অন্যের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত পছন্দ, বয়স কিংবা পেশার প্রতি আমার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। নিজের ব্যর্থতা, ঈর্ষা আর অকারণ ক্ষোভকে অন্যের গায়ে মাখিয়ে দেওয়াই আমার পরম তৃপ্তি।
নমস্কার, আমি জনরোষ। অশিক্ষার চাদরে মোড়া, একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড়ো ভাইরাস।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন