দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস বনাম অনুকূল চন্দ্র

*দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র* 
•••
 *ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী* 
•••
১৯২৪। অসহযোগ আন্দোলনের প্রবল ঢেউ। গান্ধিজি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে স্বাবলম্বিতার ডাক দিয়েছেন। বঙ্গদেশে আন্দোলনের প্রধান মুখ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। 
    দেশবন্ধু তখন ভবানীপুরের বাড়িতে। একদিন পাবনার এক ধর্মীয় আশ্রমের কিছু ব্যক্তি এলেন এলেন তাঁর কাছে। সেখানে তাঁরা Wind Power Dynamo নামে একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন, যার সাহায্যে বায়ুমণ্ডল থেকে অনায়াসে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। আশ্রমকর্মীরা নিবেদন করলেন~দেশবন্ধু যদি সাহায্য করেন তাহলে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুরাহা হয়।
    দেশবন্ধু কোন্ আশ্রম কী বৃত্তান্ত সবই শুনলেন, শুনে চমকে উঠে বললেন~"তিনিই সেই অনুকূল ঠাকুর, যাঁর কথা আমি বারীনের মুখে শুনেছি? তাঁর সাথে দেখা করার আমার খুব ইচ্ছে।" বারীন মানে~বিপ্লবী বারীন ঘোষ, শ্রীঅরবিন্দের ভাই। আলিপুর মামলায় বারীন ঘোষের দ্বীপান্তর হয়েছিল। আন্দামান থেকে ফিরে বারীন ঘোষ মানসিক শান্তির জন্য পাবনার সৎসঙ্গ আশ্রমে কিছুদিন ছিলেন। সেখান থেকে ফিরে দেশবন্ধুর "নারায়ণ" পত্রিকায় "পাবনার মধুচক্র" নামে একটি নিবন্ধ লেখেন(জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৭)। 
    দেশবন্ধু বারীনের সূত্রেই জানতেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের নানা কথা। আসলে, দেশবন্ধু তখন শারীরিক- মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। জীবনের বহু প্রশ্নের উত্তর অধরা। ঘটনাচক্রে ঠাকুর তখন কলকাতায়। ঠাকুর কলকাতায় আছেন জেনে তিনি তো রীতিমতো উত্তেজিত। বললেন~"আজই যাব আমি তাঁর কাছে।" কিন্তু রাজনৈতিক চাপে দেশবন্ধু পরদিন ভোরে সিরাজগঞ্জের অধিবেশনে গেলেন। সেটা সেরেই মানিকতলার একটি বাড়িতে এলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে। (তথ্যসূত্র : 
"দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন", হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, সম্পাদনা : বারিদবরণ ঘোষ, পারুল প্রকাশনী, পৃ.৩৪৩)।
    সারা বাড়িতে তখন তুমুল কীর্তন। দেশবন্ধু ছিলেন বৈষ্ণব। তাঁর বাড়িতে প্রতি সন্ধ্যায় কীর্তন হতো। কথাবার্তার সুবিধার্থে দোতলার ছাদে নিয়ে যাওয়া হলো। ঠাকুর তখন মাদুরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। দেশবন্ধু দিয়ে দেখেন~যাঁর কথা এতবার শুনেছেন~সেই "ঠাকুর" কোনো জটাধারী, গেরুয়াবসন-পরা বৃদ্ধ তপস্বী নন। দিব্য গৌরতনু, আজানুলম্বিত বাহু এক যুবাপুরুষ। দুধসাদা কালোপাড় ধুতি আর শ্বেতশুভ্র ফতোয়ার মতন হাতাকাটা পাঞ্জাবি। ঠাকুরের বয়স তখন ৩৬ (আবির্ভাব : ১৮৮৮-এর ১৪ সেপ্টেম্বর)। আর দেশবন্ধুর জন্ম ১৮৭০। 
    ঠাকুর তাঁকে মাদুরে বসালেন যত্ন করে। বহু কথা হলো। নানা প্রসঙ্গে। ধর্মের স্বরূপ, দেশের পল্লিউন্নয়ন, স্বরাজ, রাজনীতি-সমাজনীতি-অর্থনীতি-মানবসম্পদ ইত্যাদি। এই দীর্ঘ কথোপকথন মুদ্রিত রূপেই পাওয়া গেছে। কিন্তু সেটা স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধের দাবি রাখে। শুধু এটুকু বলি~জীবনের সমস্ত প্রশ্ন, সংশয়, জীবনজিজ্ঞাসার নানা সমাধান এত সহজে পেয়ে দেশবন্ধু অভিভূত হলেন। কেননা রাজনীতির পঙ্কিল ঘূর্ণিতে পড়ে তিনি তলিয়ে যাচ্ছিলেন। দুঃখ করে ঠাকুরকে বলেছিলেন~"যার উপর ভার দিতে যাই, সে-ই ঠিকমতো পারে না। আবার যার ভালো করি, সে-ই হয়ে উঠে নিন্দুক, বিশ্বাসঘাতক।" শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন~"দেখুন তবে, আপনিই বলছেন, সারা বাংলায় মানুষের মতো মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন না। অথচ একা আপনি তো স্বরাজ আনতে পারবেন না। সাহায্যকারী না-পেলে কাজ করবেন কাদের দিয়ে?"
   একটু থেমে ঠাকুর বললেন~"আরো দেখুন, দেশে মানুষের মতো মানুষের অভাব আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, অথচ এত তাড়াহুড়ো করে আপনারা স্বরাজ আনতে চাইছেন, তাতেই তো বোঝা যায় আপনারা স্বরাজ চান না। যদি চাইতেন তবে আমার মনে হয়~আগে মানুষ তৈরি করতেন; তা না-করে আপনারা শুধু ইংরেজের দোষই দেখছেন।"
   ঠাকুর ভাবগদগদ কণ্ঠে বলতে থাকলেন~"দেশে মানুষ কী করে হবে দাশদা, দেশের সমাজটা একদম পচে গেছে। ঘরে-ঘরে অশান্তি, দাম্পত্য সুখ নেই, শিশু-মৃত্যু। আজকাল বিবাহই ঠিকমতো হচ্ছে না, তাই ভালো সন্তান হবে কী করে? সমাজকে যদি সংস্কার করতে পারেন তবে অসম্ভব নয় যে কুড়ি-পঁচিশ বৎসরের মধ্যে এমন সব যুবক পাবেন যারা দেশে কর্মীর অভাব দূর করবে।" 
    দেশবন্ধু যতই শোনেন, ততই মন্ত্রমুগ্ধ হন। বললেন~"আমি এসব কাজে মনপ্রাণ লাগাতে পারছি না। পল্লিসেবাই যেন আমার মন চায়। আর এমন গোলমাল বাড়িয়ে স্বরাজ হবে না, তাও বুঝি। আর তবুও এই মরা দেশকে একটা হুজুগে মাতিয়ে রাখতে চাইছি, আর কেমন করে নিজেই যেন সেই হুজুকের ঘূর্ণিপাকটাতে পড়ে গেছি।"
    ঠাকুর বললেন~"দেখুন দাশদা, যিনি সবটা দেখেন, এমন একজন ঋষি বা Seer পিছনে না-থাকলে কোনো কাজ হয় না। অর্জুনের যেমন শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন। রামদাস ছিলেন বলেই শিবাজি মহারাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন। আর চাণক্য ছিলেন বলেই চন্দ্রগুপ্ত চন্দ্রগুপ্ত হতে পেরেছিলেন। অথচ রানা প্রতাপ এত শক্তিশালী হয়েও, অত করেও তেমন কিছু গড়ে তুলতে পারেননি; শুধু তাঁর পেছনে অমন কেউ ছিল না বলেই।"
    দেশবন্ধু বালকের মতন উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন~"আমাকে কী করতে হবে?" যেন, ভেসে-যাওয়া জীবনে একটি আশ্রয়রজ্জু পেয়ে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন। রাজনৈতিক চাপ, নোংরামি আর কুটিলতায় বিধ্বস্ত এক জননেতা জীবনের পরম নির্ভরতা খুঁজছেন।     ঠাকুর তাঁকে মেডিটেশন করতে বলেন। দেশবন্ধু দীক্ষা নিতে চাইলেন। ঠাকুর নিজে দীক্ষা দিতেন না। সাধনজীবনের একেবারে শুরুতে দিয়েছেন। পরে কখনই নয়। তিনি তাঁর মাতৃদেবী মনোমোহিনী দেবীর কাছে দীক্ষা ও করণীয় জেনে নিতে বললেন। সেই রাতে উন্মুক্ত আকাশের তলায় জগৎসংসারকে সাক্ষী রেখে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে গুরু রূপে বরণ করে দীক্ষা গ্রহণ করলেন। দিনটি ছিল ১৯২৪ সালের ১৪ মে। 
(তথ্যসূত্র : "মানসতীর্থ পরিক্রমা", সুশীলচন্দ্র বসু, প্রথম সং ১৯৭২, পৃ. ১৪৮-১৭৬)।
    দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের এই দীক্ষা ও সৎসঙ্গের সঙ্গে তাঁর সংযোগ নিয়ে তাঁর জীবনীকারেরা বা গবেষকেরাও আশ্চর্যরকম তথা রহস্যজনকভাবে নীরব। তবে~ দেশবন্ধুর নিত্যসঙ্গী-পার্ষদ, "বঙ্গশ্রী" পত্রিকার সম্পাদক, বিশিষ্ট লেখক হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত তাঁর "দেশবন্ধু জীবনচরিত", প্রথম সংস্করণে এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছিলেন। এই তথ্য পাই সুশীল বসুর লেখায়। তিনি লিখছেন~"শ্রদ্ধেয় হেমেন্দ্রবাবু, নিজেই একদিন আমাকে এ কথা বলেছেন। অনেকের ধারণা~দেশবন্ধু মোটেই শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেননি। এ কথা খণ্ডন করার জন্য তাঁদের শ্রীহেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের লিখিত 'দেশবন্ধু' জীবন-চরিত', প্রথম সংস্করণ পাঠ করতে বলি। তাতে তিনি এ বিষয়ে বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। তা পাঠ করলেই তাঁদের ভ্রম নিরসন হবে।"(সূত্র : সুশীল বসুর পূর্বোক্ত গ্রন্থ,পৃ. ১৫৪ )
   হেমেন্দ্রনাথের দেশবন্ধু-জীবনীর এই সংস্করণটি অতি দুর্লভ। সম্প্রতি বিশিষ্ট গবেষক বারিদবরণ ঘোষ পারুল প্রকাশনা থেকে বইটির নয়া সংস্করণ সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছেন(২০১৫)। কিন্তু সেখানেও বিস্তারিত বিবরণটি নেই। সেখানে মাত্র দুই পাতার আধা আধা অংশ।(৩৪৩-৪৪)। মানে সাকুল্যে এক পাতা। তাহলে সুশীল বসু-কথিত বিস্তারিত বিবরণ কোথায় গেল?!
    কৌতূহল নিরসনে আমি সম্পাদক বারিদবরণ ঘোষকে ফোন করি। তিনি জানালেন~কোনো অজ্ঞাত কারণে এই বিস্তারিত অংশটি শুরু থেকেই ছিল না, অন্তত তাঁর হাতে নেই। 
    অথচ, দেশবন্ধুর জীবনে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ভূমিকাটি বাদ দেওয়ার উপায়ও নেই। হেমেন্দ্রবাবুর লেখা বাংলা দেশবন্ধু-জীবনী ভারত সরকারের প্রকাশনা বিভাগ থেকে প্রকাশিত। সেখানে ঠাকুর-প্রসঙ্গ আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়। দেশবন্ধুর মেয়ে অপর্ণা দেবী "মানুষ চিত্তরঞ্জন" নামক পিতৃস্মৃতিমূলক গ্রন্থে পাবনার সৎসঙ্গ আশ্রমে তাঁদের পরিবারের যাতায়াত বিষয়ে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু সেটাও বিস্তারিত নয়।(পৃ১৮১/২২৫)।
   দেশবন্ধুর জীবনের এত বড় একটি সংযোগ কেন চাপা দেওয়া হচ্ছে~সেই রহস্যের আড়ালে প্রকৃত তথ্যের খোঁজে আমরা আরও কিছু বইপত্রের সন্ধান পাই। ১৯৩৯-এ ব্রজগোপাল দত্তরায়ের লেখা ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের একটি প্রামাণ্য জীবনী বেরিয়েছিল। সেই বইটির প্রথম সংস্করণ আমাদের হাতে আছে। ওতে নবম অধ্যায়টির নামই "শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন"। এই অধ্যায় থেকে জানা যায়~মানিকতলার বাড়িতে দীক্ষাগ্রহণের ঠিক এক বছর পর ১৯২৫-এর ১১ মে দেশবন্ধু পাবনার সৎসঙ্গ আশ্রমে যাত্রা করেন~গুরুসঙ্গ করতে। ব্রজগোপালের তথ্যটি যে সঠিক তার প্রমাণ পাই বারিদবরণ ঘোষ সম্পাদিত হেমেন্দ্রনাথের বইটিতে। কিছু অংশ তুলে ধরছি। 
১. "দেশবন্ধু ১১মে (১৯২৫) কলিকাতার শিয়ালদহ স্টেশন থেকে দার্জিলিং যাত্রা করেন।...রাজ্যেশ্বর দীনবেশে একা চলিয়াছেন। সঙ্গে কেবল সীতারূপী বাসন্তী দেবী। ঈশ্বরদি-এ নামিয়া হিমায়েতপুরে শ্রীযুক্ত অনুকূল ঠাকুর মহাশয়ের সৎসঙ্গ আশ্রমে মোটর করিয়া যান এবং ৩/৪ দিন অবস্থান করেন। প্রায় ৮/১০ মাস হইতে ঠাকুরের শিষ্যদের তাঁহার কাছে যাতায়াত ছিল। তিনিও একদিন মানিকতলা স্ট্রিটে ঠাকুরের কাছে গিয়াছিলেন।" (পৃ.৩৪৩)
২. "তখনও বৈকালে একটু একটু জ্বর হইত। ...আশ্রমে পদ্মার তীরে অনেক রাত্রি পর্যন্ত থাকিতেন এবং 'মহারাজ" নামে আশ্রমের যিনি অধ্যক্ষ ছিলেন তাঁহার সঙ্গে অনেক কথাবার্তা হইত। মহারাজ বলিয়াছিলেন, 'ঠাকুর সম্বন্ধে তাঁহার খুব উচ্চ ধারণা ছিল। বলিতেন, 'একজন লোকের এত গুণ একসঙ্গে কীরূপে থাকে তাহা বিস্ময়ের বিষয়।'(পৃ. ৩৪৪)।
৩. "১৫ মে দেশবন্ধু হিমায়েতপুর পরিত্যাগ করিলেন। স্টিমারঘাটে গিয়া মোটর পর্যন্ত ঠাকুর নিজে আসিয়া উঠাইয়া দিলেন। সুশীল বসু ঈশ্বরদি পর্যন্ত গিয়া গাড়িতে উঠাইয়া দেন।"(পৃ. ৩৪৪)।
    ব্রজগোপালের বইয়ে আছে~
"পদ্মাতীরে একখানা বাড়ীতে তাঁহার বাসস্থান নির্দিষ্ট হইল। সেখানে তাঁহার শয়নকক্ষের সম্মুখেই একটি প্রশস্ত বাঁধান বেদী ছিল, এই বেদীর ওপর বসিয়া শ্রীশ্রীঠাকুরের সঙ্গে তিনি নানা বিষয়ে গল্প করিতেন। জাতীয় সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ ও শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে কথাবার্তায় এক-এক দিন গভীর রাত্রি পর্যন্ত দুইজনে জাগিয়া থাকিতেন। ...যে বাড়ীটিতে চিত্তরঞ্জন বাস করিতেছিলেন, তাহা খরিদ করিয়া লইয়া সেখানে পছন্দমতো গৃহাদি প্রস্তুত করাইবেন, এবং দার্জিলিং হইতে ফিরিয়া তথায় নিয়ত বাস করিবেন, সৎসঙ্গ হইতে একখানা সাপ্তাহিক ইংরাজী সংবাদপত্র পরিচালনা করিয়া শ্রীশ্রীঠাকুরের সমাজ-সংস্কার ও গঠনমূলক উদার ভাবরাজি দেশের সর্বত্র প্রচার করিবেন এবং জীবনের অবশিষ্ট কাল শ্রীশ্রীঠাকুরের নির্দেশমতো তাঁহারই আরদ্ধ পল্লীসংগঠনকার্যে নিরত থাকিবেন~ইত্যাদি কত ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন।(পৃ.১২৮-২৯)। চিত্তরঞ্জন যে গুরু অনুকূলচন্দ্রের কাছে আত্মসমর্পণ করে শান্তিলাভ করেছিলেন~সেটা বোঝা যায়~নিজের পুত্র চিররঞ্জন(ভোম্বল)-কে সপরিবার আশ্রমে বারবার পাঠানো ও থাকার ব্যবস্থার মধ্যে। দেশবন্ধুর মেয়ে অপর্ণা দেবী লিখছেন~আগের বছর ১৯২৪-এর ১৮ সেপ্টেম্বর দেশবন্ধু কাশ্মীর যান সপরিবার। কিন্তু তাঁর পুত্র তখন সৎসঙ্গ আশ্রমে। "ভোম্বল সেসময়ে সুজাতা ও কন্যাকে নিয়ে পাবনা হেমায়েতপুর-আশ্রমে শ্রীঅনুকূল ঠাকুরের কাছে গিয়েছিল।"("মানুষ চিত্তরঞ্জন",পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০০৭, পৃ.১৮১)। 
   দেশবন্ধু যে ঠাকুরের পল্লিউন্নয়নেই শেষজীবন কাটাতে চান~তারও সমর্থন আছে অপর্ণা দেবীর লেখায়। লিখছেন~
"তিনি স্থির করলেন দার্জিলিং থেকে শরীর সুস্থ করে ফিরে এসেই পল্লি সংগঠনকার্যে আত্মনিয়োগ করবেন।"(পৃ, ২২৪)।
   দেশবন্ধু যখন দার্জিলিং যাবার পথে গুরুর আশ্রমে গেলেন, "ভোম্বল ও সুজাতা তখন পাবনার হিমায়েতপুর শ্রীঅনুকূলঠাকুরের সৎসঙ্গ আশ্রম ছিল"~জানাচ্ছেন দেশবন্ধু-তনয়া(পৃ.২২৫)।
   দেশবন্ধুর শরীর বিধ্বস্ত। তিনি দার্জিলিং রওনা দিলেন স্বাস্থ্য উদ্ধারের আশায়। পুত্র পুত্রবধূকে আশ্রমেই রেখে গেলেন। ঠাকুরের ইচ্ছে ছিল না দেশবন্ধু দার্জিলিং যান। দেশবন্ধুও যেতে ইচ্ছে করছিল না। কারণ গুরুর সান্নিধ্যে পদ্মার আবহাওয়ায় আর কোলাহলহীন শান্ত পরিবেশে তাঁর শরীর ক্রমশ সুস্থ হচ্ছিল। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের প্রবল চাপে অবশেষে দার্জিলিং যান। ঈশ্বরদি স্টেশন অব্দি সুশীল বসু তাঁর সঙ্গে। তিনি তাঁকে বলেছিলেন~"কী আশ্চর্য! এতদিন আমার জীবনের যত চিন্তা, আশা, আকাঙ্ক্ষা অস্পষ্ট ছিল, তাহা যেন শ্রীশ্রীঠাকুরের সঙ্গ পেয়ে অধিকতর সুষ্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। আমার জীবনের সকল আদর্শ সম্বন্ধে এমনতর মিল আর কারও সঙ্গে এ পর্যন্ত হয় নাই।"(ব্রজগোপালের পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ১৩০-৩১)। 
    গুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর জীবনদৃষ্টি যে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছিলেন সেই তথ্যগুলো পাই ভারত সরকারের প্রকাশন বিভাগের দ্বারা প্রকাশিত হেমেন্দ্রনাথের অন্য বইটিতে। হেমেন্দ্রনাথ "শেষের ক-দিন" নামক অধ্যায়ে লিখছেন~
 "তাঁর সংস্পর্শে যাঁরা এসেছিলেন, সকলেই তাঁর মনোভাবে এক বিরাট পরিবর্তন দেখতে পেয়েছিলেন। বর্তমান লেখক এই সময় প্রতিদিনই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।...তাঁর কথায় এমন একটা দার্শনিক স্পর্শ লেগেছিল যাতে আত্ম-উপলব্ধি ও ভগবানের চরণে বিলীন হওয়ার কাছে সম্মান ও জনপ্রিয়তা অত্যন্ত তুচ্ছ হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া বিলাসিতা ও পার্থিব আরামের প্রতি তিনি ক্রমেই অধিকতর উদাসীন হয়ে পড়েন। বঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সাধারণ কর্মসচিব সাতকড়িপতি রায়কে বলেন, তিনি তাঁর সমস্ত পার্থব সম্পদ দিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব।...তিনি শুধু চান, কংগ্রেস তাঁর জন্য গঙ্গাতীরে একটা ছোট্ট কুটীর তৈরি করে দিক যেখানে সরল জীবন যাপন করতে পারবেন তিনি।"(পৃ. ১৬৫-৬৬)।
    হেমেন্দ্রনাথ লিখেছেন~ওই সময় "চিত্তরঞ্জনকে সন্ন্যাসীর মতো দেখাতো।" দীক্ষা-পরবর্তীকালে দুটি দিক এসেছিল জীবনে। "প্রথমটি হলো তাঁর সর্বত্যাগীর পোষাক এবং দ্বিতীয়টি হলো তাঁর মিষ্টি হাসি ও পবিত্র চাহনি"।(পৃ. ১৬৮)। হেমেন্দ্রনাথ আরও লিখছেন~প্রফুল্ল চক্রবর্তী নামে একজন তাঁর সাথে দেখা করতে যায়~দেশবন্ধু দার্জিলিঙের "স্টেপ অ্যাসাইড" নামক বাড়িতে তখন বিছানায় শায়িত। বলেন~"প্রফুল্ল, তুমি এখন বরং যাও। একটু 'নাম' করব।"(পৃ. ১৬৮)। 
   মনে পড়ে~মানিকতলার বাড়িতে তিনি যখন প্রথম ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে যান~তখন বালকের মতো আবেগে ঠাকুরের কাছে জানতে চেয়েছিলেন~"তবে কী করতে হবে আমায় বলে দিন।" ঠাকুর বলেছিলেন~"নাম, খুব নাম করতে হয় দাদা।" দেশবন্ধু বলেছিলেন~"নাম তো কত করেছি। কই, কিছুই তো হলো না!" ঠাকুর~"শুনে নিতে হয়, কী করে করতে হবে। আর তাই অনবরত করতে হয়।" দেশবন্ধু~"কেমন করে করব বলে দিন।" ঠাকুর~"মার কাছে শুনে নিন~মা জানেন।" (সুশীল বসুর পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ, ১৫৩)।
   "নাম" নামে~ঈশ্বরের অনুভূতিসূচক বীজমন্ত্র~গুরু অনুকূলচন্দ্র তাঁকে সেই মন্ত্র জপ করতে বলেছিলেন। আমৃত্যু সেটা ছাড়েননি দেশবন্ধু। জীবনীকার হেমেন্দ্রনাথ লিখেছেন~১৬ জুন "পৌনে পাঁচটার সময় তিনি ঠাকুরের নাম উচ্চারণ করতে করতে দেহত্যাগ করেন।"(পৃ. ১৮১)। 
   ১৬ মে, ১৯২৫~দেশবন্ধুর দার্জিলিংবাস। ১৬ জুন মহাপ্রয়াণ। এই একমাসের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী পর্ব আছে। গান্ধিজি তখন বঙ্গভ্রমণে। দেশবন্ধু দার্জিলিং আছেন শুনে ৪ জুন গান্ধিজি দার্জিলিং পৌঁছালেন। মণিকাঞ্চন যোগ। দেশবন্ধুও খুব খুশি। গান্ধিজি দেশবন্ধুর মধ্যে একটি আমূল পরিবর্তন লক্ষ করেন। জীবনীকার হেমেন্দ্রনাথ লিখেছেন~"একদিন দেশবন্ধু মহাত্মা গান্ধীকে জানান, গ্রামে একটা ছোট কুটিরে কৃষকের জীবন যাপন করতে যদি পেতেন তাহলে খুশী হতেন। মহাত্মা গান্ধী মন্তব্য করেন, দেশবন্ধুর রাজনীতিতে ধর্ম আগের তুলনায় আরও বিশিষ্ট ভূমিকা নিয়েছে। দেশবন্ধু তার জবাবে বলেন, তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এসেছেন কারণ তিনি রাজনীতিকে ধর্মের অঙ্গ বলেই মনে করেন। মহাত্মা গান্ধী বলেন, তা হতে পারে, তবে এই সময় তাঁর চরিত্রে আধ্যাত্মিকতার প্রভাব বেশী।"(পৃ. ১৭৩)। 
   "সবুজপত্র"-সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী ইন্দিরা দেবীও তখন দার্জিলিঙে। গান্ধিজি ও দেশবন্ধুর সদালোচনা তাঁরা শুনতেন। প্রমথ চৌধুরী হেমেন্দ্রনাথকে লিখেছেন~"আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে মতাত্মা গান্ধীর উক্তির সত্যতা পূর্ণ সমর্থন করতে পারি। দার্জিলিঙে তাঁর স্বভাবে একটা মাধুর্য এসেছিল, যা তাঁর সহজাত কর্তৃত্বপ্রবণ চরিত্রে নতুন স্নিগ্ধতা এনেছিল।"(পৃ. ১৭৩-৭৪)।
     দেশবন্ধুর এই যে  পরিবর্তন~সেটা যে গুরু শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দ্বারা প্রভাবিত সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্রজগোপাল দত্তরায় লিখছেন~"মহাত্মাজীর নিকট শুনিয়াছি, দেশবন্ধু তখন সর্বদাই তাঁহার কাছে কেবলই শ্রীশ্রীঠাকুরের সম্বন্ধে নানা গল্প করিতেন আর বলিতেন~ 'পৃথিবীতে অনেক লোকই দেখেছি, কিন্তু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতো সর্ববিষয়ে এমন অসাধারণশক্তি-সম্পন্ন অপূর্ব প্রেমিক কর্মী আর কোথাও দেখি নাই। দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর মহাত্মাজীও বলিয়াছেন~'শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সঙ্গলাভ করিবার পর দেশবন্ধুকে যেমন মিষ্টি লাগিয়াছে, এমন আর পূর্বে দেখি নাই।"(ব্রজগোপাল দত্তরায়ের পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ১৩২)। 
    দেশবন্ধুর প্রয়াণের পর গান্ধিজি তাঁর "Young India" পত্রিকায় "At Darjeeling" নামে একটি নিবন্ধ লেখেন। ওই নিবন্ধটি তখন বঙ্গের সমস্ত প্রধান ইংরেজি পত্রিকা রিপ্রিন্ট করেছিল। ওতে গান্ধিজি দেশবন্ধু তাঁকে দার্জিলিঙে গুরু অনুকূলচন্দ্র সম্পর্কে কী বলেছিলেন~তার বর্ণনা ইংরেজিতে লিখেছেন এভাবে~"I have learnt from my Guru (Spiritual Guide) the value of truth in all our dealings. I want you to live with him for few days atleast. Your need is not the same as mine, but he has given me strength, I didnot posess before. I see things clearly which I saw dimly before."("Young India", 16th July 1925)।
    দেশবন্ধু এর আগে থেকেই গান্ধিজিকে পাবনাতে তাঁর গুরু ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। দেশবন্ধু যখন দার্জিলিঙে তখন তাঁর পুত্র চিররঞ্জন(ভোম্বল) ঠাকুরের আশ্রমে। গান্ধিজি তখন পূর্ববঙ্গে রাজনৈতিক কারণে ঘুরছেন। ভোম্বল আশ্রমে আছেন সেটা জানতে পেরে চিঠি লিখে জানান~তিনি দেশবন্ধুর গুরু শ্রীশ্রীঠাকুরের দর্শনপ্রার্থী। সেই অনুসারে ১৯২৫-এর ২৩ মে তিনি হিমাইতপুরে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করেন কয়েক ঘণ্টার জন্যে। দেশবন্ধু দার্জিলিঙে তাই গান্ধিজিকে গুরুর সান্নিধ্যে কয়েকটি দিন কাটানোর সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছিলেন~সেটা গান্ধির লেখার মধ্যেই পাই। দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর "নবজীবন" পত্রিকায়(২৮ জুন, ১৯২৫) গান্ধিজির লেখার বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়। ওতে গান্ধিজি লিখেছেন~" দার্জিলিঙে যখন যাই, তখন তিনি বাড়ীতে মাছ-মাংস ঢুকতে দিতেন না। তিনি আমাকে বার-কয়েকই বলেছিলেন,'পারলে আর কখনও মাছ-মাংস খাব না। আমার খেতে ভালো লাগে না, আর তাতে আধ্যাত্মিক বিকাশেও বাধা ঘটে। আমার গুরুদেব বিশেষভাবে বলেছেন আমি এখন যে সাধনার পথ ধরেছি তাতে আমার পক্ষে আমিষ বর্জন করাই বিধেয়।"
   দেশবন্ধুর প্রয়াণের পর গান্ধিজি নিজে তাঁর মরদেহ নিয়ে শোকযাত্রা করেন। সেই সময় তাঁর পাশে ছিলেন দেশবন্ধুর দীক্ষা যিনি দিয়েছিলেন, সেই মনোমোহিনী দেবী~ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মাতা। আনুমানিক পাঁচ লক্ষ মানুষ শবানুগমন করে। দেশবন্ধুর শ্রাদ্ধবাসরে দেশবন্ধুর ছবির পাশেই ফুলে-পল্লবে সজ্জিত তাঁর গুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ছবিটি ছিল। "মাসিক বসুমতী " পত্রিকায় ছবিটি প্রকাশিত হয়(১৩৩২ বঙ্গাব্দ)।
•••
(সৌজন্য :  *দৈনিক যুগশঙ্খ* ২০-৯-২০)
•••
লেখক গুয়াহাটির কটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক।
ফোন : 7002791773

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বে আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ নাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত

মহালয়ার পবিত্র তিথিতে" নয়া ঠাহর "শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হল কান্দি থেকে

অসমের বিশিষ্ট সাংবাদিক কুন্তল চক্রবর্তী চলে গেলেন